kalerkantho


পঞ্চগড় সুগার মিলসের ১২ বছরে গচ্চা ২১৭ কোটি টাকা

লোকসানি কারখানা

পঞ্চগড় প্রতিনিধি   

১৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



লোকসানি কারখানা

এক যুগ ধরে লোকসান গুনছে পঞ্চগড় সুগার মিলস লিমিটেড। ছবি : কালের কণ্ঠ

এক যুগ ধরে লোকসান গুনছে পঞ্চগড় সুগার মিলস লিমিটেড। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, যান্ত্রিক ত্রুটি, বিপুল পরিমাণ চিনি অবিক্রীত থাকাসহ নানা সমস্যার কারণে প্রতিবছর লোকসান গুনছে দেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের এই শিল্পপ্রতিষ্ঠান। আখের স্বল্পতায় মাত্র দুই মাসেই বন্ধ হয়ে যায় মিলের চিনি উৎপাদন। সব মিলিয়ে গত ১২ বছরে এই প্রতিষ্ঠানের লোকসান ২১৭ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। আর্থিক সংকটে পড়ে মিলের কর্মচারী ও শ্রমিকরা ঠিকমতো বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না।

পঞ্চগড় চিনিকল সূত্রে জানা যায়, ১৯৬৫ থেকে ১৯৬৯ সালের মধ্যে পঞ্চগড়ের ধাক্কামারা এলাকায় ৫৫.৫৫ মিলিয়ন টাকা ব্যয়ে ১৯৮.৪৬ একর জমিতে স্থাপিত হয় পঞ্চগড় সুগার মিলস লিমিটেড। ১৯৬৯ সাল থেকে পরীক্ষামূলক আখমাড়াই ও চিনি উৎপাদন শুরু হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর গড়ে আট হাজার ৫৩৬ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদিত হতো এই চিনিকল থেকে। ১৯৯৪-৯৫ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ১৬ হাজার ৬১২ টন চিনি উৎপাদিত হয়েছিল। সর্বশেষ ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ৯ কোটি ৪১ লাখ ১৮ হাজার টাকা মুনাফা হয়। এর পর থেকেই লোকসান। ২০০৬-০৭ অর্থবছরে ৩৮ লাখ ৫৪ হাজার, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে সাত কোটি ৫৬ লাখ ৪৩ হাজার, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ১২ কোটি ২২ লাখ ১১ হাজার, ২০০৯-১০ অর্থবছরে ১০ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার, ২০১০-১১ অর্থবছরে ১৬ কোটি ৭০ লাখ ১৫ হাজার, ২০১১-১২ অর্থবছরে ১৯ কোটি ৬৮ লাখ ১১ হাজার, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ২২ কোটি ২৮ লাখ ২৯ হাজার, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৩০ কোটি ৫৮ লাখ ছয় হাজার, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৩৬ কোটি ৭৭ লাখ ৫৬ হাজার, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৩০ কোটি ৬৯ লাখ ৭৪ হাজার ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৩০ কোটি ৩৪ লাখ ৬৩ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে।

চলতি অর্থবছরেও লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়ে চলছে মিলটি। লোকসানের পেছনে আখের উৎপাদন কমে যাওয়াকে বেশি দায়ী করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। একই সঙ্গে মিলটিকে বহুমুখী, যান্ত্রিক উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন না করা হলে লোকসান বাড়বে বলে মনে করছেন তাঁরা।

পঞ্চগড় সুগার মিলসের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত প্রায় সাড়ে ৭০০ শ্রমিক-কর্মচারী। তাঁদের কেউ স্থায়ী আবার কেউ সাময়িক চুক্তিতে কাজ করছেন। বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের বিপরীতে যে আখ পাওয়া যায় তাতে চিনি উৎপাদন করতে মিলের মাত্র দেড়-দুই মাস সময় লাগে। আখ না পাওয়ায় ১০ হাজার টন উৎপাদনক্ষমতার মিলটিকে বাকি সময় বন্ধ রাখতে হয়।

পঞ্চগড় জেলার আখ চাষ উপযোগী ৩০ হাজার একর জমির মধ্যে ৯ হাজার একর জমি আখ চাষের আওতায় আনা হয়েছে। এবার জেলায় আখ চাষ হয়েছে পাঁচ হাজার ১৬ একর জমিতে; কিন্তু পুরনো জাতের আখে চিনি উৎপাদন ব্যাপক হারে কমেছে। সেই সঙ্গে আখ চাষে লোকসান হওয়ায় চাষিরা অন্য ফসল চাষের দিকে ঝুঁকছে। এদিকে ৬০ টাকা দরে চিনি বিক্রির বিপরীতে মিলে এক কেজি চিনির উৎপাদন খরচ পড়ছে ১৫০ টাকা পর্যন্ত। বর্তমানে পঞ্চগড় সুগার মিলসের তিন হাজার ৬০০ টন চিনি অবিক্রীত অবস্থায় গুদামে মজুদ রয়েছে। এর বাজার দাম প্রায় ২১ কোটি ৬০ লাখ টাকা। চলতি মৌসুমে ৮৬ হাজার ৪০৫ টন আখ মাড়াই করে ছয় হাজার ৪৮ টন চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, স্বল্প মেয়াদের আখের নতুন জাত উদ্ভাবন, আখের মূল্যবৃদ্ধি ও মিলকে বহুমুখী করা না হলে লোকসান বাড়তেই থাকবে। সেই সঙ্গে হুমকিতে পড়বেন জেলার সবচেয়ে বড় এই ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত কর্মচারী-শ্রমিকরা।

পঞ্চগড় সদর উপজেলার টুনিরহাট এলাকার আখ চাষি জব্বারুল ইসলাম বলেন, ‘আখের উৎপাদন খরচ আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। অথচ মিল কর্তৃক্ষ আখ কিনছে প্রতি মণ ১২৫ টাকায়। প্রতি বিঘা জমিতে আখ উৎপাদনে খরচ হয় ২৫ হাজার টাকা। আর আখ পাওয়া যায় ২০০ থেকে ২৫০ মণ। উৎপাদন ও পরিবহন খরচ দিয়ে আমাদের আসল টিকানোই কষ্ট হয়ে যায়। আখের দাম না বাড়ালে আমাদের মতো কৃষকদের অন্য ফসল চাষ করতে হবে।’ চিনিকল শ্রমিক নেতা আব্দুর রহিম বলেন, ‘মিলের লোকসানের কারণে কর্মচারী-শ্রমিকরা ঠিকমতো বেতন-ভাতা পাচ্ছে না। মাত্র দেড়-দুই মাস চালু থাকে মিলটি। তারপর সারা বছর বন্ধ থাকে। মিলটিকে বহুমুখী না করলে এই সংকট কাটবে না।’

পঞ্চগড় সুগার মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনুর রেজা বলেন, ‘আখের স্বল্পতাসহ বেশ কিছু সমস্যার কারণে মিলে লোকসান হচ্ছে। এ ছাড়া বাজারে প্রাইভেট কম্পানির বিষাক্ত রিফাইন চিনি ৫৫ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। এতে আমাদের চিনি বিক্রি হচ্ছে না। শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দিতে সমস্যা হচ্ছে। তবে আমরা আখ চাষ বাড়াতে বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছি। চিনিকলের শ্রমিক ও কর্মচারীদের আখ চাষ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ ছাড়া চাষিদের ঋণ সহায়তা, সার ও কীটনাশক বিতরণ এবং কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে উঠান বৈঠক ও কৃষক সমাবেশ করা হচ্ছে।’

ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘আমরা যে আখ পাই তা দিয়ে মিলটিকে ১২ মাস চালু রাখা সম্ভব নয়। তাই মিলটিকে বহুমুখী করতে মিনারেল ওয়াটার, ইলেকট্রিক পোল ও স্লিপার নির্মাণ এবং টমেটোর সস উৎপাদন করার জন্য প্রাথমিক প্রস্তাব পাঠিয়েছি চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনে। মিলটিকে বহুমুখী করা হলে এটি একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।’



মন্তব্য