kalerkantho


কালিয়াকৈরে কারখানায় বিস্ফোরণ

এবার মাকেও হারাল মিষ্টি

এর আগের দুই ঘটনায় বাবা ও বোনকে হারায়

কালিয়াকৈর (গাজীপুর) প্রতিনিধি   

১৪ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার জামালপুরে কারখানায় গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে দগ্ধ শ্রমিক শেফালী বেগমের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল বুধবার ভোর ৪টার দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। দুটি ঘটনায় বাবা ও বোনের মৃত্যুর পর এবার মাকে হারিয়ে একা হয়ে পড়ল শেফালীর ছোট মেয়ে স্কুলছাত্রী মিষ্টি আক্তার।

শেফালী বেগম (৪২) কালিয়াকৈরের পলাশতলীর মৃত আব্দুল মান্নানের স্ত্রী ও জামালপুর এলাকার এফএস কসমেটিকস লিমিটেড কারখানার শ্রমিক ছিলেন।

এলাকাবাসী, শেফালীর পরিবার ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ঢাকার দুই ভাই হালিম ও কাইয়ুম জামালপুর এলাকায় পাশাপাশি নাইমা টেক্স লিমিটেড ও এফএস কসমেটিকস লিমিটেড নামে দুটি কারখানা পরিচালনা করে আসছেন। কারখানা দুটির বৈধ কাগজপত্র নেই বলে জানিয়েছে পুলিশ। নাইমা টেক্সের পোশাক কারখানায় ১৮ জন ও এফএস কসমেটিকস কারখানায় ৩০-৩৫ জন শ্রমিক কাজ করে। কসমেটিকস কারখানা কর্তৃপক্ষ অবৈধভাবে এলপি গ্যাস ব্যবহার করে মেহেদি, শেভিং ফোম, শেভিং ক্রিম, কলপসহ বিভিন্ন প্রসাধনসামগ্রী (কসমেটিকস) তৈরি করছিল। গত মঙ্গলবার বিকেল ৫টার দিকে উৎপাদনকাজ চলাকালে হঠাৎ বিকট শব্দে কারখানার একটি গ্যাস সিলিন্ডারের বিস্ফোরণ ঘটে। এতে একতলা ভবনের এ কারখানায় আগুন ধরে যায় এবং কারখানায় থাকা কেমিক্যালে ছড়িয়ে পড়ে। আরো কয়েকটি সিলিন্ডারের বিস্ফোরণ ঘটে আগুন ভয়াবহ আকার ধারণ করে। খবর পেয়ে কালিয়াকৈর ও গাজীপুর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে চার ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। বিস্ফোরণে কারখানার ব্যবস্থাপক, নারী শ্রমিকসহ ১১ জন দগ্ধ এবং কারখানা থেকে তাড়াহুড়া করে বের হতে গিয়ে অন্তত ১০ শ্রমিক আহত হয়। দগ্ধদের গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয় এবং আহতদের স্থানীয় ক্লিনিকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। গুরুতর দগ্ধ কারখানার ব্যবস্থাপক জাকির হোসেন, ইসমত আরা, ইমরান হোসেন, রহিমা বেগম, শেফালী বেগম, রহিম মিয়া ও তাঁর স্ত্রী নাজনিন বেগমকে ঢামেক হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে গতকাল শেফালীর মৃত্যু হয়। গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের পর থেকে ওই কারখানা কর্তৃপক্ষ পলাতক।

সূত্র জানায়, চার বছর আগে শেফালী বেগমের স্বামী আব্দুল মান্নান অভিমান করে বিষপানে আত্মহত্যা করেন। স্বামীর মৃত্যুর পর তিন মেয়েকে নিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন শেফালী। পরে তিনি ওই কসমেটিকস কারখানায় কাজ নেন। এর মধ্যে বড় মেয়ে মৌসুমি আক্তারের বিয়ে হয়ে যায়। মেজো মেয়ে মাবিয়া আক্তারের (১৫) বিয়ে ঠিক হলে সে তার হবু স্বামীর সঙ্গে অভিমান করে আত্মহত্যা করে। এরপর শেফালী ছোট মেয়ে মিষ্টি আক্তারকে নিয়ে চলছিলেন। মিষ্টি স্থানীয় জালুয়াভিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। কারখানায় বিস্ফোরণে গতকাল মা শেফালীকে হারিয়ে একা হয়ে পড়ল মিষ্টি। তার জীবন থমকে গেছে। মিষ্টির দাদা-দাদি থাকলেও তাঁদের অনেক বয়স হয়েছে। তাঁরা ঠিকমতো চলাচলও করতে পারেন না। এ অবস্থায় কিভাবে চলবে মিষ্টি? কে নেবে তার দায়িত্ব? এমন নানা কথা বলছে এলাকাবাসী।

শেফালীর চাচাশ্বশুর ছানোয়ার হোসেন জানান, ‘মিষ্টির একমাত্র অবলম্বন ছিল তার মা। সেও কারখানায় বিস্ফোরণে মারা গেল। মিষ্টির আজ (বুধবার) বার্ষিক পরীক্ষাও ছিল। সেটাও আর দেওয়া হলো না।’

গাজীপুর-২ শিল্প পুলিশের ওসি মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, ‘এই কারখানার কোনো বৈধতা নেই। অবৈধভাবে এলপি গ্যাস ব্যবহার করে যে কসমেটিকস তৈরি করছে সেগুলোও অবৈধ। গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনায় এ পর্যন্ত এক নারী শ্রমিক মারা গেছেন। এ ঘটনায় কারখানার বিরুদ্ধে মামলা প্রক্রিয়াধীন।’

কালিয়াকৈর নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘নিহত শ্রমিক শেফালীর পরিবারকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২০ হাজার টাকা দেওয়া হবে। কারখানাটি অবৈধভাবে চলছিল কি না তা তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর বলা যাবে। তবে পরিবেশ দেখে বোঝা যায়, কারখানাটিকে অনুমোদন দেওয়ার কথা নয়। ঘটনার পর কারখানা কর্তৃপক্ষের কাউকে না পাওয়ায় বিষয়টি সঠিকভাবে বলাও যাচ্ছে না।’



মন্তব্য