kalerkantho


ঈশ্বরগঞ্জের আঠারবাড়ী এমসি উচ্চ বিদ্যালয়

২৯ মাসে ১৭ লাখ টাকার বদনাম

আলম ফরাজী, ময়মনসিংহ   

২২ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



২৯ মাসে ১৭ লাখ টাকার বদনাম

মো. জহিরুল ইসলাম

২৯ মাস ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে ছিলেন। এই সময়ে প্রায় ১৭ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে।

এরপর ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার এমসি (মহিম চন্দ্র রায় চৌধুরী) উচ্চ বিদ্যালয়ের কৃষি শিক্ষক মো. জহিরুল ইসলামকে প্রধানের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না উপজেলা শিক্ষা অফিস। এ নিয়ে দুদক (দুর্নীতি দমন কমিশন) ময়মনসিংহ আঞ্চলিক কার্যালয়ে একটি অভিযোগ করা হয়েছে।

গত ১২ মার্চ দুদক কার্যালয়ে জমা দেওয়া অভিযোগ ও বিদ্যালয়ের নিরীক্ষা প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, এমসি উচ্চ বিদ্যালয়ে ২০০৪ সালে প্রধান শিক্ষকের পদ অবসরজনিত কারণে শূন্য হয়। ওই পদে নিয়োগ ও পরিচালনা পর্ষদ গঠন নিয়ে ২০১৫ সাল পর্যন্ত মামলা চলে। এরপর নির্বাচনের মাধ্যমে পরিচালনা পর্ষদ গঠিত হয়। মামলা চলাকালে ২০১৩ সালে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পান সহকারী প্রধান শিক্ষক জহিরুল ইসলাম। তাঁর ২৯ মাসের দায়িত্ব পালনের সময় বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেসরকারি অংশের বেতন-ভাতা বকেয়া পড়ে।

পরিচালনা পর্ষদের সদস্য মো. নজরুল ইসলাম বাচ্চু জানান, প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থীর এই বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন বকেয়া পড়ার কথা নয়।

তিনি খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, প্রতিষ্ঠানের আয় ব্যাংকে জমা পড়ে না। আয়ের টাকা জহিরুলের হাতে থাকে। গত বছরের ১০ জানুয়ারি পর্ষদের সভায় তিনি বিষয়টি তুলে ধরেন। আলোচনার পর একটি নিরীক্ষা (অডিট) কমিটি গঠনের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। ওই কমিটিতে সদস্য ছিলেন শিক্ষক সফিকুল ইসলাম।

নজরুল ইসলাম বাচ্চু আরো জানান, সব ধরনের নিয়ম-কানুন অনুসরণ করে বিদ্যালয়ের আয় ও ব্যয়ের খাত নিরীক্ষা করা হয়েছে। আয়ের খাতগুলো চিহ্নিত থাকলেও ব্যয়ের খাতগুলোতে স্বচ্ছতা ছিল না। ফলে ২৯ মাসে ১৬ লাখ ৮২ হাজার ১৪৪ টাকার কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি। ওই অর্থের মধ্যে রয়েছে নিরীক্ষা কমিটি কর্তৃক আপত্তি জানানো ভাউচারে ৯ লাখ টাকার বেশি ব্যয়। ভাউচারবিহীন এক লাখ ৮০ হাজার টাকার বেশি ব্যয়। এ ছাড়া বিদ্যালয়ের ব্যাংক হিসাবে জমা না পড়া ছয় লক্ষাধিক টাকা।

পর্ষদের সদস্যের সূত্রে জানা যায়, আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়ার পর জহিরুলকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে ওই দায়িত্ব দেওয়া হয় সহকারী শিক্ষক শফিকুল আলমকে। শফিকুল বলেন, ‘দায়িত্ব পাওয়ার পরের বছর (২০১৬ সাল) বিদ্যালয়ের ব্যাংক হিসাবে প্রায় ১৩ লাখ টাকা জমা করতে পেরেছি। এই অর্থ বিদ্যালয়ের নানা খাত থেকে আয় হয়েছে। ’

এ বিষয়ে অভিযুক্ত জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে অযথা মিথ্যা অপবাদ ছড়ানো হচ্ছে। ’ অন্যদিকে তিনি দাবি করেন, ‘নিরীক্ষা কমিটি যে তদন্ত করেছে, তা সাজানো। ’ বিদ্যালয়ের আয়ের অর্থ ব্যাংক হিসাবে জমা না দিয়ে হাতে রাখা প্রসঙ্গে বলেন, ‘পরিচালনা পর্ষদ গঠন নিয়ে আদালতে মামলা চলছিল। তাই জটিলতা এড়াতে আয়ের অর্থ হাতে রেখেছিলাম। পরে ওই টাকা বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে দেওয়া হয়েছে। ’

এ বিষয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সভাপতি আমিন ইউ এইচ সিদ্দিকী বলেন, ‘অর্থ আত্মসাতের ঘটনা প্রমাণিত হওয়ার পর জহিরুল পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। ’

অন্যদিকে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা অভিযোগ পাওয়ার পরও দীর্ঘদিনেও কোনো প্রতিবেদন দেননি। এ নিয়ে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বেকায়দায় পড়েছে। শিক্ষা কর্মকর্তার প্রশ্নবিদ্ধ কাজে সবার মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ছফিউল্লাহ সরকার জানান, ‘ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে অনেক গ্রুপিং আছে। এ জন্য বিব্রত হয়ে তদন্তকাজ করতে পারছি না। আগামী সপ্তাহে অভিযোগটি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে ফেরত দেব। ’

ময়মনসিংহ জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এ বিষয়টি আমার নলেজে নেই। ’

বিদ্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জহিরুল ইসলামের সময়ে মন্ত্রণালয় থেকে অডিট টিম বিদ্যালয়ে এসেছিল। তিনি কৌশলে তাদের বিদায় করে দেন। এরপর আর কোনো অডিট টিম বিদ্যালয়ে আসেনি। ’

দুদক ময়মনসিংহ অঞ্চলের উপপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম লিখিত অভিযোগ পাওয়ার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ‘অভিযোগের তদন্ত কার্যক্রম চলছে। যদি জহিরুল বিদ্যালয়ের সরকারি অংশ আত্মসাতের ঘটনায় জড়িত থাকেন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করা হবে। ’

 


মন্তব্য