kalerkantho


মানিকগঞ্জ পুলিশের পর পর তিন ঘটনা

ভাবমূর্তিতে চিড়

সাব্বিরুল ইসলাম সাবু, মানিকগঞ্জ   

২১ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



ভাবমূর্তিতে চিড়

খুন ও ডাকাতির দুটি ঘটনার পর এক পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠায় মানিকগঞ্জ জেলা পুলিশের ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে পড়েছে। কিশেষ করে পুলিশের এক এএসপির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠার পর পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থায় ফাটল ধরেছে। এ অবস্থায় ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করা হয়েছে।

জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, অন্যান্য জেলার তুলনায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বরাবরই মানিকগঞ্জের মানুষ সন্তুষ্ট। জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তাও বিভিন্ন সময় তাঁদের বক্তব্যে মানিকগঞ্জের মানুষকে শান্তিপ্রিয় হিসেবে প্রশংসা করেছেন। বাইরে থেকে আসা অন্য চাকরিজীবীরাও মানিকগঞ্জের মানুষকে সহজ-সরল বলে আপন করে নেন। তাঁরা মনে করেন, মূলত মানিকগঞ্জে রাজনৈতিক সহিংসতা না থাকার কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে। ব্যক্তিগত বা এলাকাগত ছোটখাটো কিছু হলেও তা কখনো বাড়াবাড়ি পর্যায়ে যায়নি, নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই থেকেছে। তবে বড় সমস্যা ছিল মাদক, বিশেষ করে একসময় ইয়াবার বেশ ছড়াছড়ি ছিল। সমস্যাটি পুরোপুরি না কাটলেও সেটাকেও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। আর এর কৃতিত্ব অবশ্য মানিকগঞ্জের পুলিশ সুপার মাহফুজুর রহমানের। তাঁরা বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে কেবল পুলিশি ব্যবস্থা নয়, সাধারণ মানুষকেও সম্পৃক্ত করে জনসচেতনতা গড়ে তুলতে পুলিশ সুপার অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন।

কিন্তু গত এক মাসে তিনটি ঘটনায় সবাই এখন আতঙ্কিত। গত ২২ অক্টোবর মানিকগঞ্জ শহরেই ছিনতাইকারীদের গুলিতে নিহত হন নাজিমুদ্দিন নামের এক বৃদ্ধ। এর মাত্র ২২ দিনের মাথায় গত ১৫ নভেম্বর মানিকগঞ্জ শহরের স্বর্ণকারপট্টিতে নাগ জুয়েলার্সে সশস্ত্র ডাকাতি হয়। লুট হয়ে যায় প্রায় ৭০০ ভরি স্বর্ণালংকার। এ দুটি ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে প্রকাশিত হয়ে পড়ে মানিকগঞ্জের এএসপি আবদুল আওয়ালের বিরুদ্ধে দুই কোটি টাকা চাঁদা দাবির ঘটনা। মানিকগঞ্জ স্বর্ণশিল্পী সমিতির সভাপতি আতাউর রহমান তোতা ও সাধারণ সম্পাদক রঘুনান কর্মকার এ অভিযোগ আনেন। তাঁরা দাবি করেন, ডাকাতি হওয়া স্বর্ণ কেনা, স্বর্ণ চোরাচালান, অবৈধভাবে এসিড ব্যবহার এবং ভারতীয় কারিগর এনে স্বর্ণালংকার বানানোর অভিযোগ তুলে ওই কর্মকর্তা তাঁদের কাছে দুই কোটি টাকা দাবি করেছেন। তাঁর সহযোগী হিসেবে এনএসআইয়ের কর্মকর্তা চৌধুরী আসিফের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ আনা হয়।

ছিনতাইকারীর গুলিতে হত্যার ঘটনায় পিস্তলসহ একজন গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ডাকাতির ঘটনায়ও ব্যবহৃত পিস্তল, মাইক্রোবাসসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিছু স্বর্ণালংকারও উদ্ধার হয়েছে। এ দুটি ঘটনায় কিছুটা অগ্রগতি হলেও দুই দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগের ঘটনায় দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখছে না সাধারণ মানুষ। এ ব্যাপারে তারা বলছে, শর্ষের ভেতর ভূত থাকলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না।

গতকাল সোমবার মানিকগঞ্জের স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মানিকগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেক স্বপনের মতবিনিময় অনুষ্ঠানে বক্তারা একই ধরনের কথা বলেন। মানিকগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পিপি আবদুস সালাম বলেন, শান্তিপূর্ণ জেলা হিসেবে গত এক মাসে তিনটি ঘটনায় মানিকগঞ্জের সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তার নামে চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠার বিষয়টিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, অপরাধী যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

মানিকগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বাবুল মিয়াও মানিকগঞ্জকে শান্তিপূর্ণ জেলা হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, কোনো বিষয়কেই ছোট করে দেখার উপায় নেই। অভিযুক্তদের বিষয়ে অবশ্যই তদন্ত করা হবে।

এ সময় স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেক স্বপন বলেন, ‘মানিকগঞ্জের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আমরা সব জায়গায় গর্ব করে আসছি। কিন্তু কিছু ঘটনায় আমরা বিব্রত। তবে এ থেকে শিক্ষা নিতে হবে।’ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, যা রটে তা কিছুটা বটে। তবে কাউকে অন্ধভাবে দোষারোপ করাও ঠিক নয়। বিষয়টি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশপ্রধানের সঙ্গে কথা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, যথাযথ কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।

এর আগে মানিকগঞ্জের পুলিশ সুপার মাহফুজুর রহমান খুন ও স্বর্ণের দোকানে ডাকাতির ঘটনায় জড়িত আসামিদের গ্রেপ্তার, মালামাল উদ্ধারসহ তদন্তের অগ্রগতির বিস্তারিত বর্ণনা দেন। পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগের বিষয়টি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, এরই মধ্যে এর তদন্ত শুরু হয়েছে। বিষয়টি আগে থেকেই মানিকগঞ্জের চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি সুদেব সাহা যেহেতু জানতেন, বিষয়টি তাঁকে জানানো উচিত ছিল। তবে ডাকাতি আর চাঁদাবাজির বিষয়টি এক করে দেখা ঠিক নয়। দুটি পৃথক ঘটনা। সবাইকে আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, তাঁর সময়কালেই সব বিষয়ের রহস্য উদ্ঘাটিত হবে।

উল্লেখ্য, মানিকগঞ্জের পুলিশ সুপার পদোন্নতি পেয়ে অ্যাডিশনাল ডিআইজি হয়েছেন। অল্প কিছুদিনের মধ্যে তাঁর অন্যত্র বদলি হওয়ার কথা রয়েছে।



মন্তব্য