kalerkantho


আখাউড়ার দুই মা

একজন অভাগিনী অন্যজন পাষাণী

বিশ্বজিৎ পাল বাবু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া   

১৯ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



আলাদা ঘটনা। আলাদা গল্প।

তবে দুটি ঘটনা ও গল্পের প্রধানই হলেন মা। একজন ‘অভাগিনী’ মা। আরেক মা ‘পাষাণি’। ঘটনার খাতিরে মায়েদের এমন উপাধিই দিল অনেকে। ঘটনা জেনে, দেখে অনেকের চোখেই পানি আসে। ক্রোধে ফেটে পড়ে অনেকে।

অভাগিনী ৯০ বছর বয়সী মা শিকার হয়েছেন সন্তানের অবহেলার। টানা তিন দিন ছিলেন খোলা আকাশের নিচে। আরেক পাষাণি মা তাঁর এক দিনের সন্তানকে ফেলে চলে গেছেন।

শিশুটির কান্না যেন এখনো থামছেই না। কে জানে, পাষাণি সেই মায়ের জন্যই হয়তো তার এ কান্না।

অভাগিনী মায়ের কূলকিনারা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) হস্তক্ষেপে সন্তান ঘরে তুলেছেন তাঁর মাকে। তবে পাষাণি সেই মায়ের এখনো খোঁজ মেলেনি। শিশুটির ঠাঁই হয়েছে ‘নকল মা’য়ের কাছে। ইউনিয়ন পরিষদের এক মেম্বার (সদস্য) পাষাণি মায়ের এক দিনের সন্তানের দায়িত্ব নেওয়ায় ওই মেম্বারের স্ত্রী এখন শিশুটির মায়ের ভূমিকায়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ার এ দুটি ঘটনা মানুষকে বেশ নাড়া দিয়েছে।

অভাগিনী মা : মাটি থেকে সামান্য উঁচু একটি ভিটা। চারপাশ খোলা। ওপরটাও একেবারে ফাঁকা। তাকালে আকাশ দেখা যায়। ভিটার ওপর চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ছেঁড়া কাপড়, কাগজ। এরই মধ্যে চট বিছিয়ে বসে আছেন এক বৃদ্ধা। হাতে একটি লাঠি। বয়স ৯০ বছর ছুঁই ছুঁই।

এভাবে কেমন করে থাকছেনÍপ্রশ্ন করতেই অস্পষ্ট উত্তর, ‘মেঘ আইছে না দেইক্কা সমস্যা অইছে না। ’ রোদের মধ্যে কষ্ট হয়নিÍএমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘কষ্ট অইলেই বা আর কী করা যাইব। আমার কপালে যা আছিল তা তো অইবই। ’

কথাগুলো বলছিলেন চিন্তামনি রবি দাস। দুই দিন ধরে তিনি খোলা আকাশের নিচে বাস করছেন। খাওয়া-দাওয়া এক প্রকার বন্ধ। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া ওই বৃদ্ধাকে প্রাকৃতিক কাজও সারতে হয়েছে এখানে বসে থেকেই। ছেলে, ছেলের বউ কিংবা অন্য কোনো স্বজন তাঁকে ঘরে তুলছে না।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া পৌর এলাকার বড়বাজার রেলগেটসংলগ্ন এলাকায় বসবাস চিন্তামনি রবি দাসের পরিবারের। চিন্তামনির স্বামী আবু রবিদাস মারা গেছেন। তিন ছেলের মধ্যে বড় ছেলে গাদুরার রবিদাস প্রকাশ সুরেশও মারা গেছেন। দ্বিতীয় ছেলে বাবুলাল জুতা সেলাইয়ের কাজ করেন। সবার ছোট ছেলে দুলাল রবিদাসের খোঁজ নেই বেশ কিছুদিন ধরে।

আখাউড়া-লাকসাম ডাবল লাইন প্রকল্পের আওতায় পড়েছে তাঁদের বসতভিটা। এরই মধ্যে কিছু টাকাও পেয়েছে চিন্তামনির ছেলেরা। ঝড়ে চিন্তামনির ছেলে বাবুলালের ঘর ভেঙে পড়লে সম্প্রতি তিনি পাশের ঘরে ভাড়া থাকছেন। গাদুরার স্ত্রী ও সন্তানরা থাকছে আগের জায়গাতেই।

এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত সোমবার সকালে গাদুরার সন্তানরা তাদের দাদি চিন্তামনিকে কাকা বাবুলালের ঘরের সামনে ফেলে রেখে যায়। দুই দিন ধরে তিনি খোলা আকাশের নিচে ওই ঘরের সামনেই পড়ে থাকেন। রোদের মধ্যে তিনি প্রচণ্ড কষ্ট পান। এমনকি পোকামাকড় ও পিঁপড়া ওই বৃদ্ধার চারপাশ ঘিরে ফেলে।

গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বৃদ্ধা চিন্তামনিকে একটু সরিয়ে একটি বেড়ার আড়ালে নেওয়া হয়েছে। তবে এ স্থানটিও খোলা আকাশের নিচে। হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জে থাকা মেয়ে সরস্বতী রবিদাস খবর পেয়ে ছুটে এসে মাকে বেড়ার আড়ালে নিয়ে যান। কালের কণ্ঠ’র এ প্রতিবেদক বুধবার দুপুরে বিষয়টি আখাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ শামছুজ্জামানকে জানান। কিছুক্ষণের মধ্যেই ইউএনও চিন্তামনির কাছে গিয়ে পৌঁছান। চিন্তামনির মেজো ছেলে বাবুলাল দাসকে ডেকে এনে তিনি মাকে ঘরে তোলার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি মায়ের পা ধরে বাবুলালকে ক্ষমা চাওয়ানো হয়। ওই বৃদ্ধার ওষুধ কেনাসহ খাবারের জন্য পাঁচ হাজার টাকা অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দেন ইউএনও। এ সময় ওয়ার্ড কাউন্সিল মো. আতিকুর রহমানসহ এলাকার লোকজন উপস্থিত ছিলেন।

পাষাণি মা : মাকে ঘিরে সন্তানের অবহেলার বিষয়টি সুরাহা করেছেন ইউএনও। আর মায়ের ফেলে যাওয়া এক দিনের সন্তানের ত্রাণকর্তা হয়েছেন আখাউড়া উপজেলার দক্ষিণ ইউনিয়নের মেম্বার মো. হান্নান। আনুষ্ঠানিকতা শেষে মায়ের ফেলে যাওয়া শিশুটিকে এখন থেকে লালন-পালন করবেন হান্নান ও তাঁর স্ত্রী।

জানা গেছে, গত মঙ্গলবার দুপুরে এক শিশুকে নিয়ে নুরপুর গ্রামে ঘুরতে থাকেন এক নারী। একপর্যায়ে ওই নারী এলাকার একটি বাড়িতে গিয়ে পানি পানের ইচ্ছা পোষণ করেন। পানি পানের ছুতোয় শিশুটিকে ওই বাড়ির একজনের হাতে তুলে দেন। এরপর তিনি কৌশলে সরে যান। এর পর থেকে আর ওই নারীর খোঁজ মেলেনি। ধারণা করা হচ্ছে, ওই নারীই শিশুটির মা।


মন্তব্য