kalerkantho


‘অভিভাবকহীন’ আখাউড়া হাসপাতাল

রোগী দেখলেন টেকনোলজিস্টও!

বিশ্বজিৎ পাল বাবু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া   

১০ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



রোগী দেখলেন টেকনোলজিস্টও!

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একজন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাসহ চিকিৎসকের সংখ্যা ১০ জন। তবে গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ১১টা নাগাদ তাঁদের মধ্যে মাত্র একজন রোগী দেখেছেন।

সকাল সাড়ে ১১টার পর আরেকজন এসে কয়েকজন রোগী দেখে চলে যান। তবে কোনো রোগী দেখার কথা না থাকলেও এদিন সবচেয়ে বেশি রোগী দেখেছেন একজন ডেন্টাল টেকনোলজিস্ট ও মেডিক্যাল সহকারী। এ ছাড়া জেলা স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) নেতার অনুরোধে হাসপাতালটিতে রোগী দেখেন পাশের বিজয়নগর উপজেলার এক চিকিৎসক।

টিকিটের হিসাব অনুযায়ী, দুপুর সাড়ে ১২টা নাগাদ ওই হাসপাতালে প্রায় সাড়ে ৩০০ রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেয়। এভাবে প্রায় প্রতিদিনই তিন-চার শ রোগী বহির্বিভাগের সেবা নেয় বলে একাধিক সূত্রে জানা যায়।

এমনিতেই চিকিৎসক সংকট, তার ওপর চিকিৎসকরা নিয়মিত আসেন না বলে রোগীদের বিড়ম্বনার শিকার হতে হয় বলে অভিযোগ অনেকের। এরই মধ্যে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার (ইউএইচও) পদ নিয়ে ‘জটিলতার’ সৃষ্টি হওয়ায় এক প্রকার অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে হাসপাতালটি। এ অবস্থায় হাসপাতালটিতে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হকের হস্তক্ষেপ আশা করছেন অনেকে। অবশ্য আশার বিষয় হচ্ছে, গতকাল সোমবার একজনকে আখাউড়ার ভারপ্রাপ্ত ইউএইচও হিসেবে যোগদান করার আদেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন মেডিক্যাল কলেজের ডা. শফিউর রহমানকে আখাউড়ায় ওই পদে পদায়ন করা হয়েছে বলে জানা যায়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আখাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কাগজে-কলমে চিকিৎসক হিসেবে রয়েছেন আবু নাছের মো. আব্দুল কাদির, শাহনাজ বেগম, রায়হান উদ্দিন ভূঁইয়া, শাহনেওয়াজ হাসান, ফরিদা ইয়াসমিন, আফ্রিদ জাহান, শায়লা পারভীন, মো. আসাদুজ্জামান, রুহুল মোহসিন সুজন। এ ছাড়া সম্প্রতি ইউএইচও হিসেবে যোগ দেন ডা. নোমান মিয়া।

গতকাল সোমবার সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, উল্লিখিত চিকিৎসকদের মধ্যে রোগী দেখছেন শাহনাজ বেগম। এ ছাড়া রোগী দেখছেন পাশের বিজয়নগর উপজেলা থেকে আসা ডা. আশরাফুল আলম, আখাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিক্যাল সহকারী মো. আলমগীর ও ডেন্টাল টেকনোলজিস্ট লুত্ফুন নাহার। চারজনের কক্ষেই দেখা যায়, রোগীদের প্রচুর ভিড়। সকাল সাড়ে ১১টার পর এসে ডা. আবু নাছের মো. আব্দুল কাদির কয়েকজন রোগী দেখে চলে যান। আর ডা. রায়হান উদ্দিনকে ইউএইচও কক্ষে বসে পড়তে দেখা যায়।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, ইউএইচও ডা. নোমানকে কয়েক দিন আগে বদলি করা হয়েছে। আফ্রিদ জাহান আছেন মাতৃত্বকালীন ছুটিতে। রুহুল মোহসিন সুজনকে এক আদেশে রোহিঙ্গাদের সেবার জন্য পাঠানো হয়েছে। শায়লা পারভীন রবিবার জরুরি বিভাগ সামলেছেন বলে সোমবার আসেননি। মো. আসাদুজ্জামান একই সঙ্গে আখাউড়া ও বিজয়নগরে দায়িত্ব পালন করেন বলে মাঝেমধ্যে আসেন। শাহনেওয়াজ হাসান ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও আখাউড়ায় মিলিয়ে দায়িত্ব পালন করেন বলে শুধু শনি ও রবিবার আখাউড়ায় আসেন। ফরিদা ইয়াসমিন সোমবার আসেননি। ডা. রায়হান উদ্দিন পরীক্ষার জন্য প্রায়ই ছুটি নিচ্ছেন।

ডেন্টাল টেকনোলজিস্ট লুত্ফুন নাহার জানান, শুধু আজ (গতকাল) নয়, প্রায় সময়ই ওনাকে এভাবে রোগী দেখতে হয়। কেননা হাসপাতালে রোগীর চাপ অনুযায়ী চিকিৎসক নেই। জরুরি বিভাগে থাকা মো. আলমগীর জানান, তিনি অন্যান্য কাজের পাশাপাশি বাধ্য হয়েই বহির্বিভাগে রোগী দেখছেন।

ডা. আশরাফুল আলম জানান, জেলা স্বাচিপের সাধারণ সম্পাদক ডা. মো. শাহ আলমের অনুরোধে তিনি এ হাসপাতালে রোগী দেখতে আসেন। কথা হয়, গাইনি বিশেষজ্ঞ শাহনাজ বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আগে জেলা সদর ও আখাউড়া মিলে চাকরি করতে হতো বলে এখানে সময় বেশি দিতে পারতাম না। এখন নিয়মিতই আসি। আজ (গতকাল) এক থেকে দেড় শ রোগী দেখতে হয়েছে। ’ ডা. রায়হান উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, ‘হাসপাতালে চিকিৎসক সংকট রয়েছে। সবাই নিয়মিত থাকলেও রোগী দেখতে হিমশিম খেতে হয়। ইউএইচও হিসেবে একজনকে পদায়ন করা হয়েছে বলে জানতে পেরেছি। আশা করছি, চিকিৎসক সংকটের সমাধান হয়ে যাবে। ’

প্রসঙ্গত, হাসপাতাল খালি রেখে একসঙ্গে ১৮ চিকিৎসককে নিয়ে কক্সবাজার ভ্রমণ করে বিতর্কের সৃষ্টি করা ডা. নোমানকে এবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে বদলি করা হয়। ২০১৫ সালের ২১ অক্টোবর একসঙ্গে ১৮ চিকিৎসককে সঙ্গে নিয়ে কক্সবাজার ভ্রমণ গিয়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওই সময়কার আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) ডা. নোমান মিয়া। এ নিয়ে কালের কণ্ঠে সংবাদ প্রকাশিত হলে নোমানকে সেখান থেকে বদলি করা হয়। নোমান মিয়া আখাউড়ায় এলে তোলপাড় শুরু হয়। বিষয়টি আইনমন্ত্রী আনিসুল হক পর্যন্ত গড়ায়।


মন্তব্য