kalerkantho


পদ্মা-যমুনায় ইলিশ ধরা থেমে নেই

মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি   

১০ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



একদিকে চলছে অভিযান, অন্যদিকে চলছে মা ইলিশ শিকার। দৌলতপুর উপজেলার যমুনা নদীতে প্রতিদিন শত শত নৌকায় অবাধে ইলিশ ধরা হচ্ছে।

৬০০ গ্রাম থেকে শুরু করে এক কেজি ওজনের মা ইলিশ ধরা পড়ছে জেলেদের জালে। এসব ইলিশ বিক্রি হচ্ছে বাঁচামার বাজার, চরকাটারি বাজার, চরকাটারির ভোটঘর বাজার এবং বাঘুটিয়া ইউনিয়নের পারুলিয়া বাজারসহ নদীর বিভিন্ন ঘাটে। প্রতিদিন বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ধরা ইলিশ মাছ বিক্রি হচ্ছে ওই সব বাজারে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতিদিন কমপক্ষে দেড় হাজার মণ ইলিশ বিক্রি হচ্ছে। বড় আকারের ইলিশ ৩০০ আর ছোট আকারের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৫০ টাকা কেজি দরে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালীদের সহায়তায় প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই চলছে এসব ইলিশ ধরা ও বিক্রির পুরো প্রক্রিয়া।

শুধু দৌলতপুরই নয়, শিবালয় উপজেলার চর শিবালয়, কানাইদিয়ার চর এবং আলোকদিয়ার চরেও চলছে মা ইলিশ ধরা। এসব ইলিশ ধরার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিচ্ছেন কানইদিয়া চরের বাবুল ফকির, চর শিবালয়ের মুসা মোল্লা, গেদা ব্যাপারী, তাহের, আইনুদ্দিন, আলোকদিয়া চরের মুক্তার আলী ও মঞ্জু মাতবর। এখানকার ইলিশ বিক্রি হচ্ছে জাফরগঞ্জ বাজার এলাকার কয়েকটি পয়েন্টে, তেওতা বাজার, গান্ধাইল ও আরিচা ঘাটে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রভাবশালী মহলের সহায়তায় মৌসুমি জেলেরাই মূলত মা ইলিশ ধরছে। পেশাদার জেলেরা সাধারণত নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার সাহস করে না।

মানিকগঞ্জের দৌলতপুর, শিবালয় ও হরিরামপুর উপজেলার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে যমুনা ও পদ্মা নদী। দৌলতপুরের চরকাটারি ইউনিয়ন থেকে মাঝখানে শিবালয় উপজেলা রেখে হরিরামপুরের ধুলসুরা ইউনিয়ন পর্যন্ত মানিকগঞ্জের আওতায় পড়েছে প্রায় ৫৫ কিলোমিটার নদীপথ। কোনো কোনো স্থানে নদী পাঁচ-ছয় কিলোমিটার পর্যন্ত প্রশস্ত। এই ৫৫ কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে অসংখ্য চর। এসব চরে বসবাস করা লোকেরাই মূলত নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ইলিশ ধরতে দলে দলে নদীতে নামে। আর টাকার বিনিময়ে তাদের নৌকা নামাতে অনুমতি দেয় স্থানীয় প্রভাবশালীরা। বিনিময়ে তারা পুলিশের অভিযানের আগাম সংবাদ দিয়ে সতর্ক করে। ধরা পড়লেও কম সাজা বা টাকা-পয়সা দিয়ে ছাড়িয়ে আনার ব্যবস্থাও করা হয়। শুধু তা-ই নয়, মৌসুমি জেলেদের কাছ থেকে কম দামে ইলিশ কেনার কাজটাও করে ওই প্রভাবশালীরা। নিষেধজ্ঞার সময় পার হলে প্রায় দ্বিগুণ দামে ওই ইলিশ বাজারে ছাড়ে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এবার শিবালয় উপজেলার এক ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও তাঁর ভাই এবার ২০টি ট্রলার মালিকের সঙ্গে চুক্তি করেছেন। শিবালয় উপজেলার এক আওয়ামী লীগ নেতা ১২টি, উপজেলা পরিষদের এক জনপ্রতিনিধি ২০টি, আরেক ইউপি চেয়ারম্যান ১০টি, প্রভাবশালী আরেক নেতা ২০টি, একজন মত্স্য ব্যবসায়ী ২০টি ট্রলারের সঙ্গে চুক্তি করেছেন। চুক্তি অনুযায়ী মৌসুমি জেলেরা তাঁদের কাছে মাছ বিক্রি করবে বা তাঁদের মাধ্যমে মাছ বিক্রি করবে। তাঁরা মাছ কিনে নিজস্ব লোকজনের বাসাবাড়িতে এবং শোলার পেটিতে গোপনে ওই মাছ মজুদ করে রাখেন। আরিচা ঘাটে একটি বরফ কারখানাতেও ওই ইলিশ মজুদ রাখা হয়। এই চিত্র শুধু শিবালয় উপজেলার নয়, দৌলতপুর ও হরিরামপুর উপজেলাতেও একই চিত্র পাওয়া গেছে।

আরিচা ঘাটে মাছ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গত বছর মানিকগঞ্জের সীমানায় কমপক্ষে ২০০ ট্রলার দিয়ে অবৈধভাবে ইলিশ মাছ ধরা হয়েছে। ওই সময় বাম্পার লাভ হওয়ায় এবার আরো বেশি ট্রলার নামানো হয়েছে। একটি ট্রলারের মালিকের নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ওই ট্রলার মালিক গত বছর খরচ বাদ দিয়ে প্রায় তিন লাখ টাকা লাভ করেছেন। ’

মানিকগঞ্জ জেলা মত্স্য কর্মকর্তা মো. নূরতাজুল হক বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ইলিশ ধরার ব্যাপারে আমরা জিরো টলারেন্স। আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি। গত রবিবার পর্যন্ত ৩৭ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। জরিমানা করা হয়েছে তিন লাখ ৫৮ হাজার টাকা। ইলিশ মাছ উদ্ধার হয়েছে ৩৯২ কেজি। ’ প্রভাবশালীদের মদদে অবৈধভাবে মা ইলিশ ধরার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটা সবাই জানে। এসব বিষয় দেখা আমাদের দায়িত্ব নয়। ’


মন্তব্য