kalerkantho


এস এম সুলতানের ২৩তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

লালমিয়ার বজরা

সাইফুল ইসলাম তুহিন, নড়াইল    

১০ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



লালমিয়ার বজরা

শিল্পী সুলতানের নিজ হাতে গড়া শিশুস্বর্গ বজরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

এস এম সুলতানের স্বপ্ন ছিল, শিশুরা প্রকৃতির কাছে থেকে শিখবে। তারা নদীতে একটি বজরায় ভেসে বেড়াবে।

মনের আনন্দে ছবি আঁকবে। ছবি আঁকতে আঁকতে সুন্দরবন চলে যাবে। জীবিতকালে সুলতানের এই স্বপ্ন সত্যি হলেও মৃত্যুর পর তা থেমে গেছে।

স্থানীয়রা জানায়, ১৯২৪ সালের ১০ আগস্ট নড়াইলের  মাছিমদিয়ায় মেছের আলী ও মাজু বিবির সংসারে  জন্মগ্রহণ করে একটি শিশু। জন্মের সময় তার নাম রাখা হয় লালমিয়া। পুরো নাম শেখ মোহাম্মদ সুলতান। নড়াইলের সবাই তাকে লালমিয়া নামেই ডাকত। ১৯৩৩ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থান ঘুরে সুলতান জন্মস্থান মাছিমদিয়ায় ফিরে আসেন। তিনি ছিলেন চিরকুমার।

শিশুদের জন্য ফাইন আর্ট স্কুল ও শিশুস্বর্গ গড়ে তোলেন। কুড়িগ্রামে পৈতৃক জমিতে একটি ছোট ঘর ছিল তাঁর। আর ছিল গোটা কয়েক বিড়াল, কুকুর ও বানর। পালিত কন্যা নিহার বালা তাঁকে দেখাশোনা করত। সুলতানের শিল্পকর্মের বিষয় ছিল কৃষক, জেলে, তাঁতি, কামার, কুমার, মাঠ, নদী, হাওর, বাঁওড়, জঙ্গল, সবুজ প্রান্তর তথা খেটে খাওয়া পেশিবহুল মানুষ। বাঁশি বাজাতেও পটু ছিলেন।

সুলতানের সেই স্বপ্নের কথা জানতে পেরে ১৯৯২ সালে তৎকালীন জার্মান রাষ্ট্রদূত পিটার জেভিসের আর্থিক সহায়তা করেন। প্রায় ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় একটি  ইঞ্জিনচালিত নৌকা। ৬০ ফুট লম্বা এবং ১৩ ফুট চওড়া নৌকাটির ভেতরে রান্না, খাওয়ার ব্যবস্থাসহ ভেতরে বসবার জন্য দুই পাশে বেঞ্চ ও ওপরে গ্রিল দিয়ে ঘিরে রাখা হয়। যাতে শিশুরা নিরাপদে প্রকৃতির কাছাকাছি এসে ছবি আঁকাআঁকি করতে পারে। সুলতান কয়েক দিন শিশুদের নিয়ে চিত্রা নদীতে ভেসে ছবিও এঁকেছেন।

১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। নড়াইলের কুড়িগ্রামে তাঁকে সমাহিত করা হয়। আজ তাঁর মৃত্যুর ২৩তম বার্ষিকী।

সুলতানের মৃত্যুর পর সেই ভ্রাম্যমাণ শিশুস্বর্গ বজরা অরক্ষিত হয়ে পড়ে। প্রায় দুই-তিন বছর পানিতে ভেসে থাকলেও আর কখনো চলেনি। অবহেলার একপর্যায়ে বজরাটি চিত্রা নদীতে তলিয়ে যায়। তখন প্রশাসনের পক্ষ থেকে বজরাটি উদ্ধার ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। জেলা প্রশাসন সুলতানের ঘাটে একটি ঘর নির্মাণ করে সেখানে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সহায়তায় বজরাটি উত্তোলন করে। বর্তমানে বজরাটির বাইরের কাঠ ভেঙে, তলা ফেটে বসে গেছে। এর বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। কাঠে ঘুণ ধরে খসে পড়ছে। টিকিটিকি আর তেলাপোকা আখড়া বেঁধেছে।

এ বিষয়ে নড়াইল সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি মলয় কুমার কুণ্ডু বলেন, ‘আমরা নিজেকে সুলতানপ্রেমী দাবি করি। কিন্তু তাঁর আদর্শ নিয়ে ভাবি না। ভাবলে সুলতানের শিশুস্বর্গ নৌকাটি এভাবে নষ্ট হতো না। ’

নড়াইল শিল্পকলা একাডেমির সাংস্কৃতিক কর্মকর্তা মো. হায়দার আলী বলেন, ‘২০১৪ সালে শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকি নৌকা ও ঘাট মেরামতের জন্য চিঠি দিতে বলেছিলেন। আমি এ কয়েক বছরে অনেক চিঠি দিয়েছি। কিন্তু তার কোনো প্রতিক্রিয়া পাইনি। ’

নড়াইলের জেলা পরিষদের সদস্য আইনজীবী রওশন আরা কবীর লিলি বলেন, ‘গত বছর নড়াইলের ডিসি (সাবেক) বলেছিলেন ঘাট ঠিক করে সেখানে নৌকা তৈরি করবেন। তিনি তাঁর কথা রাখেননি। ’

সুলতানের পালিত কন্যা নিহার বালা বলেন, ‘সবাই শুধু সুলতানের জন্ম আর মৃত্যুর দিনে তাঁকে মনে করতে আসে। তাঁকে ভালোবাসলে শিশুদের ভালোবাসতে হবে। ’

সুলতানের ছাত্র ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের শিক্ষক বিমানেষ বিশ্বাস বলেন, ‘সুলতান প্রকৃতিকে ভালোবাসতেন। তাই তিনি তাঁর বাড়িটি একটি জঙ্গলে আর পশুপাখি দিয়ে ভরে রেখেছিলেন। আমরা তাঁকে বুঝি না বলেই তাঁর আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতি গুরুত্ব দিই না। ’

নড়াইলে সদ্য যোগদান করা জেলা প্রশাসক মো. এমদাদুল হক চৌধুরী বলেন, ‘সুলতান ও চিত্রা নদী নড়াইলের ব্র্যান্ড। আমি মন্ত্রণালয়ের কাছে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ করব। ’


মন্তব্য