kalerkantho


সুনামগঞ্জে উইমেন্স সাপোর্ট সেন্টারের উদ্যোগ

জোড়া লাগছে সম্পর্ক

শামস শামীম, সুনামগঞ্জ   

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



জোড়া লাগছে সম্পর্ক

উইমেন্স সাপোর্ট সেন্টারের তত্ত্বাবধায়ক সহকারী পুলিশ সুপার তাপস রঞ্জন ঘোষ

সাজনা, আছমা, খুশবালা, কাজলী, সীমা, তাহেরা, লাকী, পিয়ারা, মমতাজ কামরুন নেসা হতদরিদ্র পরিবারের এই তরুণীরা বিয়ের বয়স হওয়ার আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসেছিলেন। তাঁরাসহ অনেক নারী স্বামী ও তাঁর স্বজনদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে বিয়েবিচ্ছেদের জন্য পুলিশের শরণাপন্ন হয়েছিলেন।

কিন্তু পুলিশ তাঁদের অভিযোগ পর্যালোচনা, দুই পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে জোড়া লাগিয়েছে সম্পর্ক। এ উদ্যোগে গত এক বছরে স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখে আছেন জেলার ৩০-এর বেশি দম্পতি। নীরবে এ কাজটি করছেন সুনামগঞ্জ ‘উইমেন্স সাপোর্ট সেন্টার’-এর তত্ত্বাবধায়ক সহকারী পুলিশ সুপার তাপস রঞ্জন ঘোষ।

পুলিশ, সচেতন মহল ও হতদরিদ্র পরিবারের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জীবন ও বাস্তবতার পাঠ বুঝে ওঠার আগেই ওই তরুণীদের অনেকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে করে মা হয়েছেন অল্প বয়সে। সাংসারিক টানাপড়েনে স্ত্রীরা কথা বললে স্বামীরা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে ক্ষোভ ঝাড়তেন। আইনের সেবক হিসেবে পুলিশ অভিযোগ পাওয়ার পর মামলার মারপ্যাঁচে না ঢুকে দায়িত্ব নেয় দাম্পত্য জীবনে ছেদ না টানার। তারা খোঁজ করে ওই নারীর স্বজন ও স্বামীর দায়িত্বশীল স্বজনদের। তাঁদের ডেকে শুনে নেয় সংসারের যাবতীয় গল্প। এরপর যেসব দাম্পত্য দ্বন্দ্ব প্রাথমিক পর্যায়ে আছে এবং কৌশল নিলে জোড়া লাগানো সম্ভব, সেগুলো নিষ্পন্নের উদ্যোগ নেন সহকারী পুলিশ তাপস রঞ্জন ঘোষ।

তাঁদের বুঝিয়ে এবং নির্যাতক স্বামী ও তাঁদের পরিবারকে আইনের ভয় দেখিয়ে ভঙ্গুর দাম্পত্য জীবন জোড়া লাগিয়ে দেন। স্ত্রীকে নির্যাতন করা যাবে না মর্মে স্বামীর কাছ থেকে নেওয়া হয় লিখিত মুছলেকা। শুধু সম্পর্ক জোড়া লাগিয়েই দায়িত্ব শেষ করেননি এই পুলিশ কর্মকর্তা, দুজন নারী কনস্টেবল দিয়ে নিয়মিত এসব দম্পতির খোঁজ-খবরও নিয়ে থাকেন।

সূত্র মতে, আইনি হয়রানি, সময় ও অর্থের অপচয় এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবের কারণে সুষ্ঠু বিচার পাওয়ার শঙ্কা থেকে মামলায় না গিয়ে স্বামী-সন্তান নিয়ে এখন সুখে আছেন বিয়েবিচ্ছেদের জন্য আসা অন্তত ৩০ জন নারী। এসব শোনার পর বিভিন্ন স্থান থেকে উইমেন্স সাপোর্ট সেন্টারের শরণাপন্ন হচ্ছেন নির্যাতিত নারী ও তাঁর স্বজনরা। পুলিশ কর্মকর্তার সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন জেলার সুধীজন। পুলিশ সুপারও তরুণ কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দিয়ে ভালো কাজ আদায় করতে পারায় অভিনন্দন জানিয়েছেন।

জেলায় স্বামীদের বিরুদ্ধে যৌতুক, টাকা নিয়ে নির্যাতনসহ যেসব অভিযোগ থানায় আসে তা উইমেন্স সাপোর্ট সেন্টারের মাধ্যমে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। জেলার ১১ থানায় এসংক্রান্ত অভিযোগ এলে তা তাপস রঞ্জন ঘোষের কাছে পাঠানো হয়। অভিযোগ নিয়ে উইমেন্স সাপোর্ট সেন্টার পৃথকভাবে বর ও কনের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে। কখনো বিষয়টি জানানো হয় স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের। তবে যেসব সমস্যা জটিল, পুরনো ও সামাজিক নিষ্পত্তির বাইরে চলে গেছে সেসব সহজে এ নিষ্পত্তির বিবেচনায় নেওয়া হয় না। এ ছাড়া নিজস্ব সেল দিয়ে ঘটনার পূর্বাপর ও পারিপার্শ্বিক বিষয় জেনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তুচ্ছ কারণে বিয়েবিচ্ছেদ হলে শিশুসন্তানের ভবিষ্যৎ ও পরিচয় অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে, নিজেরাও সামাজিকভাবে নিরাপত্তাহীন ও প্রশ্নবাণে জর্জরিত হবেন—এমনটা বলার পর দম্পতিরা বিয়েবিচ্ছেদ থেকে সরে আসেন।

সুধীজন ও আইনজীবীরা জানান, বিয়েবিচ্ছেদ মামলায় যারা জড়িত তারা দরিদ্র পরিবারের। মামলার পর তারা পদে পদে হয়রানির শিকার হন। অনেক সময় প্রভাবের কারণে সুষ্ঠু বিচার পাওয়ার আশা থাকে না। শেষে হাল ছেড়ে দেন তাঁরা। অনেক ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী নিজেদের ভুল বুঝে মামলা তুলে সংসার করেন। তাই শুরুতেই এই ঝামেলা মেটানোর পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।

রবিবার রাতে সদর থানায় সহকারী পুলিশ সুপার তাপস রঞ্জন ঘোষের কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, সামাজিকভাবে দাম্পত্য দ্বন্দ্ব নিষ্পত্তির বিষয়টি শোনে হবিগঞ্জের আজমিরিগঞ্জের নগর গ্রাম থেকে তাঁর কাছে এসেছেন দুই ভাই। দিরাই উপজেলায় বিয়ে দেওয়া তাঁদের বোনকে স্বামী নির্যাতন করছেন। চার বছর ধরে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সয়ে সংসার চালাচ্ছেন তিনি। এই নারী নির্যাতনের কারণে বিয়েবিচ্ছেদ চান। তাঁর দুই ভাই-বোনের সংসার টিকিয়ে রাখার আশা নিয়ে এসেছেন তাপস রঞ্জনের কাছে। এভাবে প্রায় প্রতিদিনই মেয়ে, বোন ও স্বজনের দাম্পত্য জীবন অটুট রাখতে সহায়তার জন্য এখানে আসেন অনেকে।

বিয়েবিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা সদর উপজেলার আলমপুর গ্রামের সাজনা বেগমের স্বামী শমছু মিয়া বলেন, ‘তাপস স্যার আমরারে রক্ষা খরছইন। আমরা অখন সুখে আছি। তাইন লোক দিয়া মাঝে-মধ্যে আমরার খবরও নেওয়াইন। আমরা দুইজনও মিল্যামিইশ্যা চলরাম। ’ দক্ষিণ সুনামগঞ্জের পাগলাবাজার এলাকার কাজলী রায়ের ভাই দনাই রায় বলেন, ‘তাপস স্যারের প্রতি আমাদের পরিবার কৃতজ্ঞ। তিনি আমার বোনের সংসার রক্ষা করেছেন। আমার বোনের স্বামী আর বোনকে নির্যাতন করে না। তারা খুশি আছে। ’

সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) ড. খায়রুল কবির রোমেন বলেন, ‘আদালতে অনেক মামলা আছে বিয়েবিচ্ছেদের। দীর্ঘদিন ধরে চলছে। অনেকে আর খোঁজ-খবর নিচ্ছে না। এসব মামলা শুরুতে এভাবে (উইমেন সাপোর্ট সেন্টার) সমাধান করা যায় তাহলে পরিবার ও সমাজের জন্য মঙ্গলের। পুলিশের এই উদ্যোগ প্রশংসার। ’

তাপস রঞ্জন ঘোষ বলেন, ‘পুলিশ সুপার মো. বরকত উল্লাহ খানের পরামর্শ নিয়ে আমরা সম্মিলিতভাবে এই প্রক্রিয়ায় কাজ করে সুফল পেয়েছি। এ কাজে আমাকে সহযোগিতা করছেন অনেক সহকর্মী। তবে সব কেইস নিষ্পত্তি করতে যাই না। কারণ আইনি জটিলতা ও সামাজিক প্রশ্ন আছে। ’ তিনি বলেন, ‘শুধু সংসার জোড়া লাগিয়েই আমরা হাল ছেড়ে দিই না, উইমেন্স সাপোর্ট সেন্টারের কর্মীরা ফলোআপে রাখেন। স্ত্রী-স্বামী ও তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে খোঁজ-খবর নেন। সামাজিক দায়িত্ব থেকেই আমরা এটা করছি। ’

পুলিশ সুপার মো. বরকত উল্লাহ খান বলেন, ‘সহকারী পুলিশ সুপার তাপস রঞ্জন ঘোষকে উইমেন্স সাপোর্ট সেন্টারের দায়িত্ব দেওয়ার পর ভালো ফল পাচ্ছি। মামলা করতে আসা নারীরা সিদ্ধান্ত বদলে স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখে সংসার করছেন। এসব মামলায় সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হয়রানি ও ভোগান্তিতে পড়ে। অনেক সময় সুষ্ঠু বিচার পায় না। এ কারণেই আমাদের এই প্রচেষ্টা। ’


মন্তব্য