kalerkantho


পিরোজপুর জেলা ও দায়রা জজ

মানবিক আদালত

শিরিনা আফরোজ, পিরোজপুর   

১৮ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০



হাজতিদের দুপুরে খাওয়ানো। আদালত প্রাঙ্গণে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ।

জামিনপ্রাপ্তদের হয়রানি বন্ধ। বিচারাধীন মামলার আসামিকে ডাণ্ডাবেড়ি না পরানোর মতো আইনের প্রয়োগ করে মানবিকতার পরিচয় দিয়েছেন পিরোজপুর জেলা ও দায়রা জজ মো. গোলাম কিবরিয়া।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালের জুলাইয়ে আদালত চলাকালে একদিন হাজতখানার দিক থেকে হৈচৈ আসে জেলা জজের কানে। তিনি অনুসন্ধান করে জানতে পারেন, হাজতিদের বেশির ভাগ সকালে দুটি রুটি খেয়ে এসেছে। সারা দিন অভুক্ত আছে। কারাগারে নিতে দেরি হলে তারা রাতের খাবারও পাবে না। এ আশঙ্কায় দ্রুত কারাগারে নেওয়ার জন্য হৈচৈ করছে। এর কয়েক দিন পর জজ কারাগার পরিদর্শনে যান। তিনি জানতে পারেন, আদালতে পাঠানোর সময় হাজতিদের দুপুরের খাবার হিসেবে চিঁড়া-গুড় সঙ্গে করে দেওয়া হয়।

ফেরার পর হাজতিরা রাতের খাবার পায়। জেলা জজ কারা কর্তৃপক্ষকে হাজতিদের দুপুরের খাবার আদালতে পাঠানোর কথা বলেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ পরিবহন সমস্যার কথা উল্লেখ করে অনাগ্রহ দেখায়। জজ জেলা আইনগত সহায়তা কমিটির সভায় বিস্তারিত আলোচনা করে এ মর্মে নির্দেশনা দেন, কারা কর্তৃপক্ষ হাজতিদের দুপুরের খাবার আদালতের হাজতখানায় সরবরাহ করবে। হাজতখানার পুলিশ খাবার পরিবেশনের বিষয়টি তদারকি করবে। হাজতখানায় ভারপ্রাপ্ত জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বিষয়টি সার্বিক দেখভাল করবেন।

তা ছাড়া জেলা জজ বিচারপ্রার্থী জনগণ এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিশুদ্ধ খাবার পানির পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে পিরোজপুর পৌরসভার সহায়তা নেন। পৌরসভা রিভার্স ওসমোসিস টেকনোলজির তিনটি আধুনিক পানি বিশুদ্ধকরণ যন্ত্র স্থাপন করে। সাধারণ বিচারপ্রার্থীদের বসার জন্য জেলা জজ আদালত ভবনের প্রতিটি ফ্লোরের বারান্দায় বেঞ্চের ব্যবস্থা করেন। গরম থেকে রক্ষা পেতে সিলিং ফ্যানের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

সূত্র আরো জানায়, ২০১৫ সালের ১৭ আগস্ট দুপুর ২টায় ফৌজদারি মিস কেস শুনানি চলছিল। দুটি সাধারণ প্রকৃতির সিআর মামলায় অভিযুক্ত ৭০ বছরের এক বৃদ্ধ ও রুগ্ণ ব্যক্তিকে ডাণ্ডাবেড়ি পরিয়ে আদালতে হাজির করা হয়। এ দৃশ্য ভাবিয়ে তোলে জেলা জজকে। কারণ জানার জন্য তিনি জেলারকে তলব করে আদালতে আনেন। জেলার সন্তোষজনক জবাব দিতে না পেরে ডাণ্ডাবেড়ি খুলে দেন। এ বিষয়ে জেলসুপারকে লিখিত বক্তব্য দিতে নির্দেশ দেন।

এর পরে জেল কোড এবং পুলিশ রেগুলেশন অব বেঙ্গল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কারাগার থেকে বিচারাধীন বন্দিদের আনা-নেওয়ার সময় ডাণ্ডাবেড়ি পরানোর বিধান নেই। তবে ৭১৫ বিধি অনুযায়ী, সাজাপ্রাপ্ত কয়েদিদের মধ্যে যারা ‘গ’ শ্রেণির বন্দি, তাদের মধ্যে ভয়ংকর অথবা দুর্ধর্ষ থাকলে পুলিশ সুপারের নির্দেশে বিশেষ ব্যবস্থা হিসেবে ডাণ্ডাবেড়ি পরানো যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে কারারক্ষক প্রত্যেক বন্দির জন্য চামড়ার পট্টি অবশ্যই সরবরাহ করবেন, যাতে ত্বক ছিঁড়ে না যায়। সাজাপ্রাপ্ত দুর্ধর্ষ কয়েদি ছাড়া অন্য কোনো বিচারাধীন বন্দিকে কারাগার থেকে আনার সময় ডাণ্ডাবেড়ি পরানোর আইনত কোনো সুযোগ নেই। জেল কোডের ঊনবিংশ অধ্যায়ে বর্ণিত মতে, কোনো বন্দি অপরাধ করলে কারাগারের ভেতরে শাস্তিস্বরূপ তাকে ডাণ্ডাবেড়ি পরিয়ে রাখা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে এরূপ বন্দিকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করার আগে অবশ্যই ওই বেড়ি খুলে ফেলতে হবে মর্মে জেল কোডের ৭২১ বিধিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। এ ঘটনার পর কারাগার থেকে আদালতে আনা-নেওয়ার সময় কোনো বিচারাধীন বন্দিকে ডাণ্ডাবেড়ি পরানো হচ্ছে না।

আইনজীবীরা জানান, বিচারের জন্য প্রস্তুত মামলা বদলি করার পর জামিনে থাকা আসামিদের পুনরায় সংশ্লিষ্ট আদালতে জামিনের আবেদন করতে হয়। এটি সারা দেশের আদালতগুলোতে প্রচলিত। এতে আসামিদের অযথা খরচ ও হয়রান হতে হয়। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি নির্দেশনা দেওয়া হয়, দায়রা আদালত থেকে জামিনে মুক্ত আসামি জামিননামা দাখিল করলে তাদের পুনরায় বদলি আদালতে জামিনের আবেদন বা জামিননামা দাখিল করতে হবে না।

জেলা ও দায়রা জজ আদালতের নাজির মো. মামুন আলী জানান, জেলা জজশিপে ২০১৭ সালের এপ্রিলে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল সিভিল ও ফৌজদারি মিলিয়ে ১৪ হাজার ৭১৬; যার মধ্যে নিষ্পত্তি করা মামলার সংখ্যা ৪৪২। বিপুলসংখ্যক মামলার বিপরীতে জেলা জজশিপে মোট ২০টি বিচারকের পদ থাকলেও ছয়টি পদ শূন্য রয়েছে। সংকট থাকায় অতিরিক্ত কাজ করতে বিচারকদের হিমশিম খেতে হয়। বিচারকের সংখ্যা কম থাকা সত্ত্বেও ২০১৪ সালের তুলনায় ২০১৫ সালে দেড় গুণ বেশি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। ২০১৬ সালে এ সংখ্যা আরো বেড়েছে। পিরোজপুরের আইনজীবী রাজ্জাক খান বাদশা বলেন, ‘যতক্ষণ আদালতে থাকি এর পরিবেশ-প্রতিবেশ সবার অনুকূলে থাকে। প্রায় দুই শ বছর পর আদালত বারের প্রত্যেক সদস্যকে আকৃষ্ট করেছে। ’

জেলা আইনগত সহায়তা কমিটির সদস্য গৌতম নারায়ণ রায় চৌধুরী বলেন, ‘জেলা জজ আদালতের দৃশ্যপট পাল্টে দিয়েছেন। ’ পিরোজপুর পৌরসভার মেয়র হাবিবুর রহমান মালেক বলেন, ‘আদালতে পানি সরবরাহের জন্য তাগিদ অনুভব করেন জজ। তাঁর অনুরোধে পৌরসভা থেকে তিনটি আধুনিক পানি বিশুদ্ধকরণ যন্ত্র স্থাপন করে নিয়মিত পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। ’ পিরোজপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) খান মো. আলাউদ্দিন বলেন, ‘জেলা ও দায়রা জজ মো. গোলাম কিবরিয়া পিরোজপুরে যোগদান করে আদালত অঙ্গন থেকে সব অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও অপসংস্কৃতি দূর করেছেন। ’

 


মন্তব্য