kalerkantho


শেরপুর

'ওষুধ পাই, ডাক্তর পাই না'

হাকিম বাবুল, শেরপুর   

৩ নভেম্বর, ২০১৫ ০০:০০



'কমিনিটি কিনিক অওনে বালাই অইছে। এনে আইলে অসুগের কতা কইলেই ওষুধপত্র দেয়।

পেশার পরীক্ষা কইরা দেয়। ওষুধ পাই, কিন্তু ডাক্তর তো পাই না। সপ্তাহে না অইলেই মাসে যুদি এক দিন কইরা বড় ডাক্তর আইতো, রোগীগরে দেকতো, তাইলে খুব বালা অইতো। ' শেরপুর সদর উপজেলার বলাইরচর ইউনিয়নের জঙ্গলদী দক্ষিণপাড়া গ্রামের লাল মাহমুদ স্থানীয় কমিউনিটি ক্লিনিকের সেবা সম্পর্কে এভাবেই তাঁর কথা তুলে ধরেন।

লাঠিতে ভর দিয়ে কমিউনিটি ক্লিনিকে সেবা নিতে আসেন বৃদ্ধ ফুলেছা বেওয়া। সারা রাত তিনি কোমর-হাঁটুর ব্যথায় চিৎকার করেছেন। এখন দু্ই টাকা নিয়ে ওষুধ নিতে কমিউনিটি ক্লিনিকে এসেছেন। ওষুধ নিয়ে বাড়ি ফেরার সময় তিনি বলেন, 'এই ডিসপেন্সারিডা অওনে খুব বালা অইছে। দিনের বেলায় খোলা থাহে।

আইয়া অসুগের কতা কইয়া দুই ট্যাহা দিলে ওষুধ দেয়। ' চিকিৎসা সেবাপ্রার্থী স্থানীয় সালেহা বেগম বলেন, 'এহানে ওষুধ পাই, কিন্তু ডাক্তর তো নাই। ১৫-২০ দিন পরে পরেও যুদি একজন ডাক্তর বইতো, তাইলে তো বালা অইতো। '

ক্লিনিক সূত্রে জানা গেছে, অক্টোবরে ৬১৪ জন রোগী এ ক্লিনিক থেকে চিকিৎসাসেবা নিয়েছে। এর মধ্যে ১৬৮ জন পুরুষ, ৩৬৪ জন নারী, ৪৮ জন শিশু ও ৩৪ জন প্রসূতি। কমিউনিটি ক্লিনিক পরিচালনা ম্যানুয়েল অনুসারে প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিকে একজন করে সিএইচসিপি রয়েছেন। প্রকল্পের আওতায় তাঁদের নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রকল্পের মেয়াদ কাছাকাছি চলে আসায় বর্তমানে তাঁদের মধ্যে চাকরি হারানোর শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তাঁরা কমিউনিটি ক্লিনিক পরিচালনার জন্য সরকারের কাছে চাকরি স্থায়ীকরণের দাবি জানিয়ে আসছেন। এ ছাড়া একজন করে আয়া থাকলেও তাঁরা এখনো সম্মানী পাচ্ছেন না। শনি থেকে বৃহস্পতিবার সপ্তাহে ছয় দিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত কমিউনিটি ক্লিনিক খোলা থাকার কথা। তবে সেবা দেওয়ার কার্যক্রম চলে দুপুর ১টা পর্যন্ত। সপ্তাহে ছয় দিনের মধ্যে তিন দিন সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের স্বাস্থ্য সহকারী ও অন্য তিন দিন পরিবার-পরিকল্পনা বিভাগে এফডাব্লিওএ নিয়মিত বসেন। এ ছাড়া মাসে অন্তত একবার ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রের এমবিবিএস চিকিৎসকের রোগী দেখার কথা। কিন্তু ২০১২ সালে শুরুর পর থেকে এখানে কখনো এমবিবিএস চিকিৎসক বসেননি। সপ্তাহে তিন দিন বসার কথা থাকলেও এক-দুই সপ্তাহ পর পর একবার স্বাস্থ্য সহকারী আসেন। আর এফডাব্লিওএও সপ্তাহে এক-দুই দিন আসেন। কোনো কোনো সপ্তাহ আসেনও না। তবে ইপিআই ও টিকা দিবসের দিন তাঁরা ক্লিনিকে বসেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বলাইরচর ইউনিয়নের নব সৃষ্ট ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ডাক্তারকে ডেপুটেশনে শেরপুর জেলা হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ৩ নম্বর ওয়ার্ডের স্বাস্থ্য সহকারীর পদটি প্রায় এক বছর ধরে শূন্য। ৯ নম্বর ওয়ার্ডের স্বাস্থ্য সহকারীকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ায় তাঁর পক্ষে নিয়মিত ওই ক্লিনিকে বসা সম্ভব হচ্ছে না। এ অবস্থা কেবল জঙ্গলদী কমিউনিটি ক্লিনিকেই নয়, জেলার প্রায় সব কমিউনিটি ক্লিনিকের। স্বাস্থ্য সহকারীরা কমিউনিটি ক্লিনিকে সেবা দেওয়াকে অতিরিক্ত ঝামেলা মনে করেন। এ জন্য তাঁরা ইপিআই ও টিকা দিবসের দিন ছাড়া অন্য সময় এখানে আসতে চান না।

জঙ্গলদী কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি মো. হাবীবুল্লাহ মিস্টার বলেন, 'আমরা কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে থাকি। জটিল রোগী হলে আমরা এখান থেকে হাসপাতালে রেফার করি। আমাদের দেওয়া স্লিপ নিয়ে হাসপাতালে গেলে সঙ্গে সঙ্গে রোগী ভর্তি করা হয়। প্রায় ৩০ ধরনের ওষুধ এখান থেকে রোগীদের দেওয়া হয়। একসময় বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হলেও এক বছর ধরে দুই টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। সেই টাকা দরিদ্র রোগীদের কল্যাণে ব্যয় করা হয়। '

হাবীবুল্লাহ মিস্টার জানান, এ এলাকার মানুষ খুব অসহায়, দরিদ্র। মাঝেমধ্যে একজন ডাক্তার এলে ভালো হতো। বিশেষ করে প্রসূতি ও শিশুরা উপকৃত হতো। তিনি বলেন, 'এত দিন উৎসাহ নিয়ে কাজ করলেও এখন আমরা হতাশ। চাকরি স্থায়ী না হলে আমার মতো সিএইচসিপিরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। তাতে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে সরকারের যুগান্তকারী সাফল্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব হবে না। '

ক্লিনিকের এফডাব্লিওএ শেফালী আক্তার বলেন, 'আমি সপ্তাহে তিন দিন এবং স্বাস্থ্য সহকারীর বাকি তিন দিন বসার কথা। অনেক সময় দেখা যায়, ক্লিনিকে বসে আছি কোনো রোগী নেই। তখন বাড়ি বাড়ি ঘুরে তাদের সেবা দিই। বিভাগীয় কাজের চাপে হয়তো কখনো বসা হয় না। তবে সময় পেলেই ক্লিনিকে বসি। '

জঙ্গলদী কমিউনিটি ক্লিনিকের জমিদাতা মো. ফরহাদ আলী বলেন, 'ক্লিনিকটির জন্য সরকারকে আমি পাঁচ শতক জমি লিখে দিয়েছি, যাতে মানুষ চিকিৎসাসেবা পায়। কিন্তু মাঝখানে এটি বন্ধ ছিল। মাকড়সা আর ইঁদুর-বিড়াল বাসা বেঁধেছিল এখানে। তখন দুঃখ হতো, জমিটা দিয়ে তো কোনো লাভ হলো না। বর্তমান সরকার এইটা চালু করায় এহন মনে শান্তি লাগে। যে উদ্দেশ্যে জমিটা দিছিলাম, সেটা বাস্তবায়ন হচ্ছে। তবে মাসে একবার করে হলেও নিয়মিত একজন বড় ডাক্তার বসলে খুবই ভালো হতো। '

এ ব্যাপারে শেরপুরের সিভিল সার্জন ডা. মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো এখানে তুলনামূলক ভালো চলছে। গ্রামের মানুষ কিছুটা হলেও স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে। তবে নিয়ম থাকলেও কমিউনিটি ক্লিনিকে ডাক্তারদের বসা সম্ভব হচ্ছে না। চিকিৎসক সংকটের কারণেই এটা হচ্ছে।

 


মন্তব্য