kalerkantho


খাগড়াছড়ি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট

কোটি টাকা নয়ছয়

আবু দাউদ, খাগড়াছড়ি   

১ জুলাই, ২০১৫ ০০:০০



কোটি টাকা নয়ছয়

বছর শেষ। সবখানে চলছে জুন ক্লোজিং (অর্থবছরের শেষ হিসাব)।

ঠিক এ মুহূর্তে এলো কোটি টাকার প্রকল্প। হাতে সময় মাত্র ২৬ দিন। টাকা তো আর ফেরত দেওয়া যায় না। দুই বছর মেয়াদি প্রকল্পের প্রথম বছরে অর্জন সেমিনার ও নাট্য উৎসব। ব্যয় এক কোটি ১৫ লাখ ৮৪ হাজার টাকা।

প্রতিষ্ঠানের নাম খাগড়াছড়ি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট (নৃসাই)। এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নামেমাত্র কাজ দেখিয়ে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খোদ প্রতিষ্ঠান-প্রধান সুস্ময় চাকমা এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

বছর শেষে মিলল টাকা

নৃসাই সূত্রে জানা গেছে, 'খাগড়াছড়ির ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের সংস্কৃতির উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ এবং ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আর্থসামাজিক অবস্থা বিশ্লেষণ' শীর্ষক কর্মসূচি।

এর আওতায় দুই বছরের জন্য এক কোটি ৮৬ লাখ ২৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়। চলতি বছরের জন্য বরাদ্দ এক কোটি ১৫ লাখ ৮৪ হাজার টাকা। 'সংস্কৃতি বিকাশ সাধনের জন্য সহায়তা তহবিল'-এর বিশেষ অনুদান খাত থেকে মন্ত্রণালয় গত মে মাসের শেষ সপ্তাহে অর্থ ছাড় দেয়।

গত ২৪ মে খাগড়াছড়ি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের ব্যবস্থাপনা কমিটির বৈঠক ডাকা হয়। বৈঠক মুলতবি হওয়ায় গত ৪ জুন ফের বেঠক অনুষ্ঠিত হয়। পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরীর সভাপতিত্বে সভায় আদিবাসী সংস্কৃতি বিকাশ ও উন্নয়নে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কর্মসূচি বাস্তবায়ন ও অর্থ ব্যয়ের জন্য নৃসাইয়ের গবেষণা কর্মকর্তা জিতেন চাকমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। নৃসাইয়ের উপপরিচালকের পরিবর্তে গবেষণা কর্মকর্তা এবং ক্ষমতাবলে পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের যৌথ স্বাক্ষরে প্রকল্পের সব চেক কর্তনসহ আয়-ব্যয় করার সিদ্ধান্ত হয়। এ ছাড়া কর্মসূচির সব ক্রয় প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করতে পর্যবেক্ষণ, বাস্তবায়ন, দরপত্র আহ্বান ও মূল্যায়ন এবং গবেষক ও তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগের জন্য পৃথক দুটি কমিটি গঠন করা হয়।

কোন খাতে কত টাকা

দুই বছরব্যাপী কর্মসূচিতে ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত প্রথম বছরের জন্য বরাদ্দ এক কোটি ১৫ লাখ ৮৪ হাজার টাকা। এ টাকায় শুধু গবেষণা ব্যয় ২৩ লাখ টাকা। সেমিনার, প্রশিক্ষণ ও কম্পিউটার কেনা বাবদ ১০ লাখ টাকা হারে ৩০ লাখ টাকা। যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সরঞ্জাম কেনার জন্য ২২ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। এ ছাড়া মুদ্রণ ও প্রকাশনা সাড়ে ছয় লাখ, বইপত্র কেনা পাঁচ লাখ ৭৩ হাজার, অডিও-ভিডিও পাঁচ লাখ, আসবাব পাঁচ লাখ ও অনুষ্ঠান উৎসব ১৫ লাখ টাকা।

সময় মাত্র ২৬ দিন

ব্যবস্থাপনা কমিটির বৈঠক হয়েছে গত ৪ জুন। এ হিসাবে সময় মাত্র ২৬ দিন। এই সময়ের মধ্যে দরপত্র আহ্বান, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, সেমিনার, প্রশিক্ষণ আয়োজন; বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, সরঞ্জাম, আসবাব কেনা; গবেষণামূলক লেখা সংগ্রহ করে মুদ্রণ, প্রকাশনা, অডিও-ভিডিও তৈরি প্রভৃতি কাজ। তার ওপর চারটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ওপর গবেষণা, উপজেলা ও ইউনিয়নভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ, গবেষণাধর্মী চারটি বই প্রকাশ। উপজেলাওয়ারি চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা ও সাঁওতালদের জীবনাচরণ নিয়ে পাঁচটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরি; ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা সম্পর্কে একটি বই, চারটি আদিবাসী নৃগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক অবস্থার ওপর চারটি পৃথক বই ও লেখকদের চারটি মৌলিক বই প্রকাশের কথা।

বাস্তবতা হলো, কথা থাকলেও সেমিনার ও নাট্য উৎসব ছাড়া কিছুই হয়নি। তবু বাস্তবায়িত বলে দেখানো হচ্ছে। শোনা গেছে, কাজ বাস্তবায়নের আগেই বিভিন্ন নামে-বেনামে চেক ও নগদ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। নিয়োগপ্রাপ্ত গবেষকদের গবেষণার আগেই বেতন দেওয়া হয়েছে।

কী চমৎকার দেখা গেল

গত ৮ জুন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে এক দিনের সেমিনারের মধ্য দিয়ে কোটি টাকার প্রকল্পের বৈধ প্রক্রিয়া শুরু হয়। সাদামাটা একটি সেমিনারের পর অন্যদিন লুপ্তপ্রায় লুরিদের নিয়ে আরেকটি সেমিনার করা হয়। এরপর গত ১৯ জুন থেকে পাঁচ দিনব্যাপী নাট্যানুষ্ঠান হয়েছে নৃসাই মিলনায়তনে।

৮ জুনের সেমিনারের জন্য আড়াই লাখ টাকা ব্যয় ধরা ছিল। এর মধ্যে আপ্যায়ন জনপ্রতি ৫০০ টাকা, সম্মানী এক হাজার টাকা এবং ব্যাগ, ফাইল বাবদ ৬৫০ টাকা বরাদ্দ ছিল। কিন্তু অধিকাংশ অংশগ্রহণকারীকে ৫০০ টাকা হারে সম্মানী দেওয়া হয়। ব্যাগের দাম ১০০ টাকা হতে পারে। এ ছাড়া লুরিদের নিয়ে আয়োজিত সেমিনারের জন্য বরাদ্দ একই পরিমাণ টাকার অর্ধেকও খরচ হয়নি। এমনকি প্রবন্ধকার ও আলোচকদের সম্মানীও ঠিকভাবে দেওয়া হয়নি।

এদিকে পাঁচ দিনের নাট্যোৎসব হলেও এতে উৎসবের রেশ ছিল না। কেবল মঞ্চ আলোকসজ্জার নামে এক লাখ টাকার বেশি আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ খাতে ব্যয় ধরা ছিল প্রায় দেড় লাখ টাকা। অথচ নৃসাই মিলনায়তনে যেনতেনভাবে নাট্য অনুষ্ঠান শেষ করা হয়। কেবল সাউন্ড সিস্টেম ভাড়া দেখানো হয়েছে ৭৫ হাজার টাকা। নাট্যদলের সম্মানী দুই লাখ টাকা নির্ধারিত ছিল। প্রতিটি দলকে ২০ হাজার টাকা হারে দেওয়ার কথা থাকলেও তা মানা হয়নি। নাট্যোৎসবে অংশ নেওয়া হিল কালচারাল অর্গানাইজেশনের সাধারণ সম্পাদক তাপস ত্রিপুরা বলেন, 'খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির ছয়টি নাট্য সংগঠনের আটটি দল অংশগ্রহণ করে। আমার একটি নাট্যদলের জন্য ১০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। '

কর্মকর্তারা কী বলেন

নৃসাই গবেষণা কর্মকর্তা ও কর্মসূচির আয়-ব্যয় কর্মকর্তা জিতেন চাকমা বলেন, 'ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কোটি টাকার কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে। এখানে অনিয়মের কিছুই ঘটছে না। '

নৃসাই ব্যবস্থাপনা কমিটির অন্যতম সদস্য অ্যাডভোকেট রতন কুমার দে বলেন, 'গত ৪ জুন বৈঠক করে প্রকল্প বাস্তবায়নের তাগাদা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ওই প্রকল্পে কী আছে, কত টাকার প্রকল্প, কী কী কাজ হবে, সে সম্পর্কে অন্ধকারে আছি। গবেষণা কর্মকর্তা নিয়োগ-সংক্রান্ত উপকমিটির সদস্য হিসেবে একটি প্রক্রিয়ায় জড়িত ছিলাম মাত্র। 'নৃসাই খাগড়াছড়ির উপপরিচালক সুস্ময় চাকমা বলেন, 'প্রকল্পটি সম্পর্কে আমি ওয়াকিবহাল নই। আমাকে প্রকল্প বিষয়ে অবহিত করা হচ্ছে না। গবেষণা কর্মকর্তা তাঁর ইচ্ছামতো সব কিছু পরিচালনা করছেন। আমি এ বিষয়ে সংস্কৃতিসচিবকে লিখিতভাবে জানিয়েছি, কর্মসূচির স্বচ্ছতা, জবাবদিহি বা কোনো ধরনের ব্যত্যয়ের সঙ্গে আমি নিজে এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জড়িত নয়। এমনকি দায়বদ্ধ নয়। ' তিনি মনে করেন, 'প্রতিষ্ঠান-প্রধানের সঙ্গে সমন্বয় না করে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কোনো কাজ বাস্তবায়ন করা আইনের পুরোপুরি পরিপন্থী।

 


মন্তব্য