ক্যান্সার শব্দটি শুনলেই এখনো আমাদের মনে এক অজানা আতঙ্ক ভর করে। তবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অভূতপূর্ব অগ্রগতি এই মরণব্যাধিকে আগের চেয়ে অনেক বেশি নিয়ন্ত্রণযোগ্য করে তুলেছে। চিকিৎসকেরা বলছেন, ভয় পেয়ে লুকিয়ে রাখা নয়, বরং সঠিক সময়ে রোগ শনাক্ত করাই ক্যান্সার জয়ের মূল চাবিকাঠি। প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে অনেক ধরনের ক্যান্সার এখন সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব। তাই এই নীরব ঘাতক সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা এবং শরীরের ছোটখাটো পরিবর্তন নিয়ে সচেতন হওয়াই হতে পারে এর বিরুদ্ধে আমাদের সবচেয়ে বড় ঢাল। খবর ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক
- ক্যান্সার আসলে কী
আমাদের শরীর কোটি কোটি কোষ দিয়ে তৈরি। সাধারণত এসব কোষ নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে জন্ম নেয়, কাজ করে এবং একসময় মারা যায়। কিন্তু কোনো কারণে কোষের জিনে পরিবর্তন বা মিউটেশন ঘটলে সেই কোষ নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। তখনই সৃষ্টি হয় ক্যান্সার। এই অস্বাভাবিক কোষগুলো ধীরে ধীরে টিউমার তৈরি করতে পারে এবং শরীরের অন্য অংশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই ছড়িয়ে পড়ার প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘মেটাস্টেসিস’। বিশ্বজুড়ে ১০০টিরও বেশি ধরনের ক্যান্সার রয়েছে। তবে সাধারণভাবে এগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়।
- সলিড ক্যান্সার
এটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। স্তন, ফুসফুস, ত্বক, কোলনসহ বিভিন্ন অঙ্গে এ ধরনের ক্যান্সার হতে পারে।
- রক্তের ক্যান্সার
রক্তকণিকা বা লসিকাতন্ত্রে শুরু হওয়া ক্যান্সারকে এই শ্রেণিতে রাখা হয়। যেমন লিউকেমিয়া, লিম্ফোমা ও মাল্টিপল মায়েলোমা।
- মিশ্র ক্যান্সার
কিছু ক্যান্সার একাধিক ধরনের বৈশিষ্ট্য বহন করে। এগুলো তুলনামূলকভাবে বিরল।
- ক্যান্সারের সাধারণ লক্ষণ
ক্যান্সারের লক্ষণ রোগের ধরন ও অবস্থার ওপর নির্ভর করে ভিন্ন হতে পারে। তবে কিছু সাধারণ লক্ষণ রয়েছে, যেগুলোকে অবহেলা করা উচিত নয়।
- দীর্ঘদিন ক্লান্তি অনুভব করা
- রাতে জ্বর আসা
- ক্ষুধামন্দা
- অতিরিক্ত রাতের ঘাম
- দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা
- কোনো কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া
- ত্বকে নতুন তিল বা পুরনো তিলের আকৃতি ও রং পরিবর্তন
- শরীরের কোথাও অস্বাভাবিক গাঁট বা ফোলা
- প্রস্রাব বা মলের সঙ্গে রক্ত যাওয়া
- কাশির সঙ্গে রক্ত আসা
বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরে কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন দুই সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
- কেন হয় ক্যান্সার
ক্যান্সার মূলত একটি জিনগত রোগ। তবে এর অর্থ এই নয় যে এটি সবসময় বংশগত। গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ ক্যান্সার সরাসরি বংশগত কারণে হয়ে থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে জীবনযাত্রা, পরিবেশ ও বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ অভ্যাসের কারণে কোষে পরিবর্তন ঘটে এবং ক্যান্সার তৈরি হয়। যেসব কারণে বাড়ে ক্যান্সারের ঝুঁকি তৈরি হয় সেগুলো হলো—
- ধূমপান
ফুসফুস, মুখগহ্বর, খাদ্যনালি ও অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সারের অন্যতম প্রধান কারণ ধূমপান।
- পারিবারিক ইতিহাস
পরিবারের নিকটাত্মীয়দের ক্যান্সার থাকলে ঝুঁকি কিছুটা বেশি থাকে।
- পরিবেশ দূষণ
অ্যাসবেস্টস, কীটনাশক ও রেডনের মতো বিষাক্ত উপাদানের সংস্পর্শে দীর্ঘদিন থাকলে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
- অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
অতিরিক্ত চর্বি ও চিনি সমৃদ্ধ খাবার এবং শারীরিক পরিশ্রমের অভাব বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।
- অতিরিক্ত রোদে থাকা
সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি ত্বকের ক্যান্সারের অন্যতম কারণ।
ক্যান্সার নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসক প্রথমে রোগীর শারীরিক পরীক্ষা করেন এবং রোগের ইতিহাস সম্পর্কে জানেন। প্রয়োজন হলে বিভিন্ন পরীক্ষা করানো হয়। যেমন : রক্ত পরীক্ষা, সিটি স্ক্যান, এমআরআই, আলট্রাসনোগ্রাম, বায়োপসি ও জেনেটিক পরীক্ষা। ক্যান্সারের ধরন ও পর্যায় অনুযায়ী চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয়।
ক্যান্সার কি প্রতিরোধ করা সম্ভব : সব ধরনের ক্যান্সার প্রতিরোধ করা না গেলেও ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
- ধূমপান ও তামাকজাত পণ্য বর্জন করুন
- স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলুন
- নিয়মিত ব্যায়াম করুন
- অতিরিক্ত রোদ থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখুন
- নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও ক্যান্সার স্ক্রিনিং করান
- পরিবেশগত বিষাক্ত উপাদান থেকে দূরে থাকুন
ক্যান্সার শুধু শারীরিক নয়, মানসিকভাবেও একজন মানুষকে প্রভাবিত করে। তাই চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক সুস্থতাও গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, বই পড়া, মেডিটেশন, যোগব্যায়াম, কাউন্সেলিং কিংবা সাপোর্ট গ্রুপে যুক্ত হওয়া রোগীর মানসিক শক্তি বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।
ক্যান্সার মানেই জীবনের শেষ নয়। আধুনিক চিকিৎসার কারণে অনেক রোগী দীর্ঘদিন সুস্থ জীবনযাপন করছেন। তাই ভয় না পেয়ে সচেতন হওয়া, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা এবং শরীরের কোনো অস্বাভাবিক লক্ষণকে গুরুত্ব দেওয়াই হতে পারে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র।







