kalerkantho

ছোছা কদম

ইমদাদুল হক মিলন

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ছোছা কদম

অঙ্কন : বিপ্লব চক্রবর্ত্তী

চৌধুরীদের বারবাড়ির সামনে একটা বকুলগাছ।

সেই গাছের সঙ্গে গরুর দড়ি দিয়ে প্যাঁচিয়ে বাঁধা হয়েছে কদমকে। রোদে পোড়া, বৃষ্টিতে ভেজা শরীরের রং কদমের অনেকটাই পুরনো গাছপালার দেহকাণ্ডের মতো। বকুলগাছের সঙ্গে প্যাঁচিয়ে বাঁধার ফলে গাছ আর কদম একাকার হয়ে গেছে। মাঝারি মানের গাছটি হঠাৎ করেই গেছে মোটা হয়ে।

কদমের আজ কী হয় দেখার জন্য বাড়ির লোকজনের সঙ্গে গ্রামের কিছু উত্সাহী লোকও জড়ো হয়েছে গাছতলায়। কদমের দশা দেখে তারা বেশ খুশি। ছোছাটা এবার আসল জায়গায় ধরা খেয়েছে। নিজাম চৌধুরী জাঁদরেল লোক। কোনও রকমের তেড়িবেড়ি বরদাশত করেন না।

বকুলগাছের অদূরে চৌধুরীদের কাছারি ঘর।

সেই ঘরে হাতলঅলা চেয়ারে বসে গুড়গুড়া হুঁকায় তামাক খাচ্ছেন নিজাম চৌধুরী। দুপুরের পরপর কদমকে ধরেই গ্রামের গণ্যমান্য দু-চারজনকে খবর দিয়েছিলেন। তারা কেউ কেউ এসেও পড়েছে। কাছারি ঘরের চেয়ার-বেঞ্চে ছড়িয়েছিটিয়ে বসে আছে। খানিক আগে একপ্রস্থ আদা চা দিয়ে গেছে বাড়ির পুরনো চাকর নবু। কদমকে ধরার কাজে আজ নবুর ছিল সবচেয়ে বড় ভূমিকা। ধরার পর গোয়ালঘরের বাতার সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা দড়ি এনে বাঁধাছাদার কাজটাও সে-ই করেছে। ফলে নবুর শরীরে এখন অন্য ধরনের স্ফূর্তি। যেন বিশাল একখানা গৌরবের কাজ সে করে ফেলেছে। হাঁটাচলার ভঙ্গিটাই বদলে গেছে। বেশ একটা কেউকেটা ভাব নিয়ে উঠানের কোণে দাঁড়িয়ে আছে এখন। মুখটা হাসি হাসি।

একসময় গম্ভীর গলায় নবুকে ডাকলেন নিজাম চৌধুরী। নবু।

প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ঘরে ঢুকল নবু। জে।

মাস্টার সাবরে খবর দেচ নাই?

দিছি না? লগে লগেই তো দিছি!

তয় এখনও আসে নাই ক্যান?

হেইডা আমি কেমতে কমু! নামাজ পড়তে বইছিল। আমারে কইল, যা, আমুনে।

এখনও আসল না, তার লেইগাই তো সালিস বহাইতে দেরি হইতাছে!

আরেকবার যামু? ডাইকা লইয়ামু?

চায়ের কাপে ফুরুক করে শেষ চুমুক দিল দলিল মাতবর। তারপর ডান হাতে ঠোঁট মুছে বলল, কাম নাই যাওনের। আইলে আইব, নাইলে আমরাই বিচার কইরা ফালামু।

মন্নাফ হাওলাদার সিগ্রেট টানে মুঠো করে। বুড়ো আঙুলের পাশের দুই আঙুলের ফাঁকে কায়দা করে সিগ্রেট আটকে, হাতটা মুঠো করে টানতে থাকে। ছোট্ট কলকে হাতের মুঠোয় ধরে গাঁজাখোররা যেভাবে গাঁজা টানে, ভঙ্গিটা অনেকটাই সে রকম। আর টানার সঙ্গে ফোওস্ ফোওস্ করে ভাল একটা শব্দ হয়। এখনও সেভাবেই সিগ্রেট টানছিল সে। শব্দের ফাঁকে বলল, রেজ্জেক মাস্টার বুড়া মানুষ। তারে ডাকনের কাম কী! এত ছোড বিচারে এত মানুষ লাগে না।

খলিল ভেণ্ডার নিরীহ ধরনের মানুষ। নরম-শান্ত গলায় বলল, মাস্টার আমগো বেবাকতের মুরব্বি। গেরামের বিচার-সালিস তারে ছাড়া হয় না। সে থাকলে ভাল হয়।

হুঁকার নল নবুর হাতে দিয়ে নিজাম চৌধুরী বললেন, সেইটা আমিও বুজি। এর লেইগা তারেঐ বেবাকতের আগে খবর দিছি। অহনতরি আইল না। তয় আমরা একটা কাম করি, সালিসটা শুরু কইরা দেই। মাস্টার যুদি আহে তো আইল, না আইলে নাই। কদমার ভাল একখান বিচার আইজ হওন উচিত। বহুত দিন ধইরা গেরামডারে ও জ্বালাইয়া খাইতাছে।

ওহাব আলী পঞ্চায়েত বলল, কারেক্ট। ছেমড়াডা বড় ফাজিল। ইংরাজিতে যাকে বলে...

কিন্তু ইংরেজি শব্দটা খুঁজে পেল না সে। থেমে গেল।

নিজাম চৌধুরী উঠে দাঁড়ালেন। তয় লন। শুরু করি।

তার দেখাদেখি বাকি চারজনও দাঁড়াল।

নবুর দিকে তাকিয়ে নিজাম চৌধুরী বললেন, এই ঘরের চের-বেনচি সব বাইরে নে। বহনের বেবস্তা কর।

হুঁকা রেখে প্রথমেই নিজাম চৌধুরীর চেয়ারটা বকুলতলায় নিয়ে রাখল নবু। তারপর চটপটে হাতে লম্বা বেঞ্চটা নিল, বাকি চেয়ারগুলো নিল। যে যার জায়গামতো বসে পড়ল।

তখন বকুলতলায় লোকজন আরও বেড়েছে। বাড়ির বউঝিরাও ঘর-দুয়ারের আনাচে-কানাচে এসে দাঁড়িয়েছে। মাথার ঘোমটা দাঁতে কামড়ে উঁকিঝুঁকি মারছে। কী বিচার ছোছাটার আজ হয়, দেখতে চাইছে।

কিন্তু যাকে নিয়ে এত কাণ্ড সে নির্বিকার। যেন গরুর দড়ি দিয়ে বকুলগাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা কোনও ব্যাপারই না। লোকজন, বিচার সালিস কোনও ব্যাপারই না। খানিক আগে ছোট মেন্দাবাড়ির তোতা তার পেটে আঙুল দিয়ে বেশ একটা খোঁচা মেরে জিজ্ঞেস করেছিল, কী রে কদমা, সমবাত কী?

ওই অবস্থায়ই বাইনমাছের মতো দুখানা মোচড় দিয়ে হেসে কুটিপাটি কদম। এমুন কইরেন না দাদা। ক্যাতকুতি লাগে।

কদমের শরীরে সুড়সুড়িটা বেশি। বগলের তলায়, কোকসার কাছে, তলপেটে কেউ হাত ছোঁয়ানো তো দূরের কথা, আঙুল তুলে ছোঁয়াবার ভঙ্গি করলেই মোচড়াতে থাকে কদম, আর খি খি করে হাসতে থাকে। অদৃশ্য এক কাতুকুতুতে আক্রান্ত হয়। বকুলগাছের সঙ্গে নবু যখন তাকে প্যাঁচিয়ে প্যাঁচিয়ে বাঁধছিল, তখন বগল কোকসা সব জায়গাতেই সুড়সুড়ি লাগছিল। ধরা পড়ার কথা ভুলে হেসে কুটিপাটি হচ্ছিল কদম। নবুকে সে ডাকে নবুদাদা। হাসতে হাসতে মোচড়াতে মোচড়াতে বলছিল, অ্যাই নবুদাদা অ্যাই, ক্যাতকুতি লাগে তো!

নবু গ্রাহ্য করেনি। বলেছিল, ক্যাতকুতি তোমার আইজ ছুইট্টা যাইব শালার পো শালা। কার বাইত্তে ধরা পড়ছ, উদিস পাইবা নে!

তারপর আস্তে আস্তে যখন লোকজন জুটতে শুরু করল, গ্রামের ত্যাঁদড় পোলাপানগুলো ঘিরে ধরল কদমকে, তখন ভাল একটা আজাব শুরু হল। যে সে আঙুল তুলে কাতুকুতু দিতে আসে, আচমকা খোঁচা দিয়ে ছুটে যায় কেউ। বড় মেন্দাবাড়ির টিপু একটা চোতরাপাতা ঘষে দিয়ে গেল পেটের কাছে। তার পর থেকে চুলকাতে চুলকাতে জায়গাটা এবড়োখেবড়ো হয়ে গেছে। তবে টিপুকে কদম ছাড়েনি। এক হাতে পাগলের মতো পেট চুলকাতে চুলকাতে তুবড়ির মতো শুরু করেছিল বকাবাজ্যি। যত রকমের বকা জানা ছিল সবই টিপুর ওপর ঝেড়েছে। তারপর চুলকানি বন্ধের সঙ্গে সঙ্গে মুখও বন্ধ করেছে। এখন নির্বিকার, চুপচাপ। ফ্যাল ফ্যাল করে নিজাম চৌধুরী গংদের দেখছে।

নিজাম চৌধুরী জলদগম্ভীর গলায় বললেন, হাজেরানে মজলিস, কদমারে আপনেরা বেবাকতেই চিনেন। অর কীর্তিকলাপও জানেন। গেরামডারে ও জ্বালাইয়া খাইল। জুয়ানমর্দ মানুষ কোনও কাম কাইজ করব না, কোনও বাড়িতে রাখতে চাইলে থাকব না, খাইব চুরি কইরা। না না, জিনিসপত্র, সোনাদানা, কাপড়চোপড়, থালাবাসন, হাঁড়িপাতিল, মোটকথা কোনও জিনিসই কদমা চুরি করে না। তয় কী চুরি করে? করে খাওন। ভাত, খালি ভাত চুরি করে।

কাজিবাড়ির আকবর বলল, না না, খালি ভাত চুরি করব ক্যান? মুড়িমিডাই চুরি করে, পিডা চুরি করে। গাছের আম-ডাব গয়া পাকা গাব বেবাক চুরি করে। আমগো বাইত্তে একদিন...

বলেই টের পেল নিজাম চৌধুরীর কথার মাঝখানে কথা বলা তার ঠিক হয়নি। নিজাম চৌধুরী যখন কথা বলেন তখন গ্রামের কেউ রা করে না। আজ কদমাকে ধরা পড়তে দেখে উত্তেজনায় ভুলটা আকবর করে ফেলেছে। আল্লাই জানে কদমাকে ছেড়ে আকবরকে নিয়েই সবাই পড়ে কি না এখন!

ওহাব আলী পঞ্চায়েত তখন কটমটে চোখে আকবরের দিকে তাকিয়েছে। তুই তো বড় লনছেন (ননসেন্স)। চদরি সাবের মুখের উপরে কথা কচ!

দলিল মাতবর বলল, আইজকাইলকার পোলাপান মহা বেদ্দপ। আদব-লেহাজ কিচ্ছু নাই।

খলিল ভেণ্ডার মিনমিন করে বলল, কাজিবাড়ির পোলা এমুন হইল কেমতে? ময়মুরব্বি মানে না!

রেগে গেলে তোতলাতে থাকে মন্নাফ হাওলাদার। চোখ দুটো বড় হয়ে যায়, আর মুখের কথা যায় আটকে। এখনও তা-ই হলো। তোতলাতে তোতলাতে সে বলল, এ এ এই না না নালায়েক, তু তুই এ এহেন থিকা যা।

কিন্তু নিজাম চৌধুরী আকবরকে ক্ষমা করলেন। হাসিমুখে বললেন, থাউক, পোলাপান মানুষ বুইজ্জা সারতে পারে নাই। ক আকবর ক, তগো বাইত্তে কী করছিল চোরায়?

আকবর কথা বলবার আগেই খি খি করে হাসল কদম। ও কইব কী, আমিঐ কই, হুনেন। আইজকার এমুন টাইমে বইয়া অর মায় একদিন চিতইপিডা ভাজতাছিল। হেদিন আমি কোনহানে খাওন পাই নাই। বেপারি বাড়িত গিয়া বহুত নিয়ারা করছি, একমুঠ ভাত দেয় নাই। আইছি কাজিবাড়ি। আম্মারে পিডা ভাজতে দেইখা কইলাম, দুইহান পিডা দেন আম্মা, বহুত খিদা লাগছে। আম্মায় এমুন ধুর ধুর কইরা উটল! চুলার ছাইদারা দিয়া পিডাইতে আহে আমারে। আমি দৌড়াইয়া পলাইয়া গেলাম।

বলেই আবার খি খি করে হাসে কদম। আসলে কইলাম গেলাম না। রান্ধন ঘরের পিছে গিয়া বইয়া রইলাম। আম্মায় বুড়া মানুষ। চোক্কে দেখে কম। পিডা ভাইজ্জা কুলায় রাখে, পিছে থিকা হাত দিয়া আমি লইয়া যাই। এমতে কইরা গইন্না গইন্না পাঁচখান পিডা খাইলাম। প্যাট আল্লার রহমতে টাইট হইয়া গেল। তহন আম্মায় দেহে পিডা ভাইজ্জা কুলায় রাখে, পিডা যায় কই! আম্মায় তো কারবারডা বুইজ্জা গেল। তারবাদে আথকা এমুন চিইক্কার দিল, আকবইরা, ওই আকবইরা, এইমিহি আয়। চোরায় তো আমার বেবাক পিডা খাইয়া হালাইল! আকবইরা ঘর থিকা দৌড়াইয়া বাইর হওনের আগেই আমি পলাইয়া গেছি গা। হি হি হি।

কদমের হাসি দেখে পোলাপান আর বাড়ির বউঝিদের মধ্যে হাসির রোল পড়ে যায়। দেখে নিজাম চৌধুরী জোরে একখানা ধমক দেন। খামোশ।

সঙ্গে সঙ্গে সব চুপচাপ।

নিজাম চৌধুরী বললেন, চোরার কথা শুইনা হাসনের কিছু নাই। আর কার কী কওনের আছে কন আপনেরা। বেবাক হুইন্না তারবাদে অর বিচার করুম।

দলিল মাতবর বলল, মাইনষের কথা কী হুনবেন, আমারডা হুনেন। আমার খ্যাতের বাঙ্গি-তরমুজ তো বেবাক ওই চোরার পেডেঐ যায়।

মন্নাফ হাওলাদার বলল, বাড়ির ডাব-নাইরকল, ব্যাল কিচ্ছু অর লেইগা রাখতে পারি না।

ওহাব আলী পঞ্চায়েত বলল, আমার ছাড়াবাড়ির আম-জাম আর বরুই অর্ধেক খায় ও একলা।

খলিল ভেণ্ডার বলল, আমার রান্ধনঘর থিকা পাতিল ধইরা ভাত লইয়া গেছে, নুন-সালুন বেবাক লইয়া গেছে। একদিন না, বহুত দিন।

মকবুলের নানির গাছের পেয়ারা, বেগমের মায়ের গাছের কতবেল, আজাদের খালার ঝাঁকা থেকে শসা, আমিনুলদের বাড়ির নামার দিককার ক্ষেতের আখ, মিয়াবাড়ির জামরুল সবই যে চুরি করে খায় কদম, জানা গেল। কোনও বাড়ির মুড়ি-চিঁড়া, কোনও বাড়ির গরুর দুধ, নাড়ুমোয়া, মোটকথা খাওয়া যায় এমন সব কিছুই নিয়মিত চুরি করছে কদম। তার যন্ত্রণায় গ্রামের লোক অতিষ্ঠ।

সব শুনে নবুর দিকে তাকালেন নিজাম চৌধুরী। এইবার আইজকার ঘটনাটা ক। আমার বাড়িতে কী চুরি কইরা ধরাডা ও পড়ছে। আর কেমতে অরে তুই ধরলি।

কদম বলল, নবুদাদার কওনের কাম কী? আমিঐ কই।

নবু তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, না না, আমি কমু। আমগো বাড়িতে আইজ দোফরে খিচড়ি আর ইলশা মাছ ভাজা হইছে। রান্ধনঘরে বইয়াই খাইছে বেবাকতে। বাকি রইছে খালি আম্মায়। বাড়ির বেবাকতেরে খাওয়াইয়া হেয় খায়, এইডা নিয়ম।

নিজাম চৌধুরী ধমক দিয়ে বললেন, এত প্যাচাইলের কাম নাই। আসল কথা ক।

কদমা বলল, আসল কথাডা আমি কই। বড় একখান থালে খিচড়ি আর দুই টুকরা একছেইয়া ইলশা মাছ ভাজা খালি লইছে আম্মায়, আথকা আমি রান্ধনঘরে ঢুইক্কা হেই থাল লইয়া দৌড় দিছি। বাঁশঝাড়তলে গিয়া হাউশ মিটাইয়া খাইছি। শেষ লোকমাডা মোখে দেওনের লগে লগে নবুদাদায় গিয়া আমারে ধইরা ফালাইছে। কেস ডিসমিস। হি হি হি।

নিজাম চৌধুরী অন্যদের দিকে তাকিয়ে বললেন, হুনলেন তো আপনেরা! চোরা নিজ মুখেই স্বীকার করল বেবাক কথা।

খলিল ভেণ্ডার মিনমিনে গলায় বলল, কদমার একটা ভাল স্বভাব হইল, ও কোনও সমায় মিছা কথা কয় না। যা করে হেইডা কইয়া ফালায়।

দলিল মাতবর বলল, ভাল বংশের পোলা তো! অর বাপদাদারা নামকরা মানুষ আছিল। রক্তের গুণডা আছে। তয় স্বভাবটা যে ছেমড়ার ক্যান এমুন হইল?

মন্নাফ হাওলাদার বলল, অভাব, অভাবে পইড়া হইছে। মা-বাপের এক পোলা। কদমার জন্মের কিছুদিন পর থিকাই অসুখে পড়ল অর বাপে। জাগাজমিন বেইচ্চা খাইচে অর চিকিস্যা করাইছে। মরণের সমায় পথের ফকির। বাড়ির ভিটা গেছে, ঘর গেছে। কদমার লেইগা রাইখা যায় নাই কিছুই। শ্যাষ জীবনে কদমার মায় তো ভিক্কা কইরা খাইত।

ওহাব আলী পঞ্চায়েত বলল, হ, কদমার বাপের পেরালাইস (প্যারালাইসিস) হইছিল। পেরালাইসে আঁতুড়ে হইয়া গেছিল।

নিজাম চৌধুরী বলল, বেবাকঐ বুজলাম। তয় কদমা জুয়ানমর্দ পোলা, ও ক্যান কাম কইরা খায় না?

শুনে কদম বলল, আমার কাম করতে ভাল্লাগে না।

সঙ্গে সঙ্গে ধমকে উঠলেন নিজাম চৌধুরী। খামোশ বুরবক কাহিকা!

তারপর দলিল মাতবরের দিকে তাকালেন। কন মিয়ারা, কী বিচার হইব?

দলিল মাতবর বলল, বিচারডা আমি ভাবছি। অরে গেরাম থিকা বাইর কইরা দেন। এই গেরামে ও থাকতে পারব না।

কদম বিস্মিত গলায় বলল, তয় আমি থাকুম কই? এইডা আমার গেরাম। বাড়িঘর কিচ্ছু নাই, তাও তো গেরামডা আমার। আমি এই গেরাম ছাইড়া যামু না।

মন্নাফ হাওলাদার বলল, তর ঘাড়ে যাইব।

খলিল ভেন্ডার বলল, কদমা থাকে কোন বাইত্তে?

অন্য কেউ কথা বলার আগেই কদম বলল, কোনও বাইত্তে থাকি না। এহেক দিন এহেক বাড়ির গোয়াইলঘরে, নাইলে রান্ধনঘরে, নাইলে নাড়ার পাল্লায় থাকি। খরালিকালে কোনও অসুবিধা নাই, শীতের দিনে শীতে বড় কষ্ট পাই। গেল শীতে মাস্টার সাবে একখান কম্বল দিছিল। মাঝখান দিয়া ভোগলা।  

কদমের কথাবার্তা শুনে হাসি পাচ্ছিল অনেকেরই, কিন্তু নিজাম চৌধুরীর ভয়ে শব্দ করে হাসতে পারছিল না। মুখ টিপে, মুখ লুকিয়ে হাসছিল অনেকেই। বাড়ির বউঝিরা নিঃশব্দ হাসিতে এ-ওর ওপর ঢলে পড়ছিল।

নিজাম চৌধুরী আবার দলিল মাতবরের দিকে তাকালেন। তয় এইডাঐ আপনেগো বিচার?

দলিল মাতবর আমতা গলায় বলল, আপনে যুদি অন্য বিচার করতে চান করেন। আমগো কোনও আপিত্তি নাই। কী কন মিয়ারা?

বাকি তিনজন প্রায় একসঙ্গে বলল, হ।

নিজাম চৌধুরী বললেন, কদমার যা স্বভাব, গেরাম থিকা বাইর কইরা দিলেও হেই স্বভাব যাইব না। ডাকের কথা আছে না, ‘জাইত যায় না ধুইলে, স্বভাব যায় না মরলে। ’ ও যেহেনে যাইব এই রকম চুরি কইরাঐ খাইব। অহন আমগো জ্বালাইতাছে, তহন অন্য মানুষরে জ্বালাইব।

মন্নাফ হাওলাদার বলল, হেইডা জ্বালাউক গিয়া। আমগো কী?

না হাওলাদার সাব, এই কথাডা ঠিক কইলেন না। দেশটা তো আমগো। দেশের মানুষও আমগো মানুষ। আমারে জ্বালান আর দেশের যেকোনও মানুষরে জ্বালান এক কথা। এইডা আমি মনে করি। যুদ্ধ কইরা দেশটা আমরা স্বাধীন করছি শান্তিতে থাকনের লেইগা। হেইডা খালি একজনের শান্তি না, দেশের বেবাক মানুষের শান্তি। দেশের কোনও মানুষের শান্তি ও নষ্ট করতে পারব না।

ওহাব আলী পঞ্চায়েত বিপুল উত্সাহে বলল, কারেক্ট।

নিজাম চৌধুরী আগের মতোই বক্তৃতার ভঙ্গিতে বললেন, যুদি এমুন হইত যে কদমা জীবনে কোনও দিন চুরি কইরা খায় নাই, আইজঐ পয়লা আমার বাড়িতে করছে, আমি অরে কিছু কইতাম না। মনে করতাম, পেডের দায়ে খাইছে। অরে আমি মাপ কইরা দিতাম। ও তো তা না।

খলিল ভেন্ডার তার স্বভাবসুলভ নিরীহ গলায় বলল, তয় আপনের বিচারডা কী, হেইডা কন? চোরারে আপনে জেলে দিতে চান?

কদম সঙ্গে সঙ্গে বলল, হ, জেলে দেন আমারে। জেলে আমি আরামে থাকুম। খাওনের কোনও অসুবিধা হইব না। শীতের দিনে মোডা মোডা কম্বল দিব।

কঠিন চোখে কদমের দিকে তাকালেন নিজাম চৌধুরী। না, অত আরামে তরে আমি থাকতে দিমু না। ছোট্ট একখান শাস্তি দিয়া তরে আমি ছাইড়া দিমু।

তয় হেই শাস্তির কথা তুই হারা জীবন মনে রাখবি। দেশের যেহেনেই থাকচ, না খাইয়া মইরা গেলেও চুরি কইরা খাইতে চাবি না। মানুষরে জ্বালাবি না।

শুনে লোকজনের মধ্যে কেমন একটা চাঞ্চল্য সৃষ্টি হল। এ-ওর দিকে তাকাতে লাগল, ফিসফাস করতে লাগল। কী শাস্তি, এ্যাঁ!

কথাডা দলিল মাতবর বলেই ফেললেন। শাস্তিডা কী?

অর জিবলাটা এককড়া পরিমাণ আমি কাইটা ফালামু।

আচমকা এমন শাস্তির কথা বলবেন নিজাম চৌধুরী কেউ কল্পনাও করেনি। কেমন বাকরুদ্ধ হয়ে গেল সবাই। এ-ওর মুখের দিকে তাকাতে লাগল। কী, জিভ কেটে ফেলবে! বলে কী?

কেউ কেউ বলল, হ, ভাল শাস্তি। জিবলা কাইটা দিলে ইহজিন্দেগিতে আর চুরি কইরা খাওনের সাধ হইব না।

কিন্তু শাস্তির কথাটা কদম পাত্তাই দিল না। ভাবল, চৌধুরী সাহেব তার সঙ্গে মশকরা করছেন। ঠোঁট উল্টে মজাদার একটা মুখভঙ্গি করল। ইহ্, জিবলা কাইটা দিব! ‘চাচায় কইছে খালাত ভাই, আল্লাদের আর সীমা নাই। ’

কদমের কথা শুনে এখন আর কেউ হাসছে না। কেমন একটা থমথমে পরিবেশ চারদিকে। ব্যাপারটা খেয়াল করে নিজাম চৌধুরী বললেন, কী মিয়ারা, রাও করেন না ক্যান? কন কেমুন শাস্তি? বিচারডা আপনেরা মানলেন কি না! তয় এইডা ছাড়া আর কইলাম কোনও শাস্তি অরে দিমু না। জিবলা কাটনের পর ও গেরামেই থাকব। তয় খাইতে হইব কামকাইজ কইরা।

তার পরও কেউ কোনও কথা বলল না। মন্নাফ হাওলাদার একটা সিগ্রেট ধরিয়ে মুঠো করে টানতে লাগল। দেখে নিজাম চৌধুরীরও তামাকের নেশা পেল। নবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, তামুক আন।

নবু উত্সাহী গলায় বলল, লগে কি একখান বেলেডও লইয়ামু? বেলেড দিয়া জিবলা কাটতে সুবিধা হইব। ধরবেন আর ঘ্যাঁচ।

না, অর জিবলা আমি বেলেড দিয়া কাডুম না। কাডুম কাঁচি দিয়া। এক হাতে জিবলাডা টান দিয়া ধরুম, আরেক হাতে পোচাইয়া পোচাইয়া কাডুম। তামুকের লগে ধার দেইখা একখান কাঁচি আনবি।

এবার কদম বুঝে গেল সত্যি তার জিভ কাটা হবে। দিশেহারা অসহায় চোখে দলিল মাতবর গংদের দিকে তাকাতে লাগল। হায় হায়! জিবলা কাইটা দিলে আমি খামু কেমতে! কথা কমু কেমতে! ও মিয়ারা, আপনেরা দিহি কিছু কন না? হায় হায়! আমারে মাপ কইরা দেন।

ছাইড়া দেন আমারে। আমি আর কোনও দিন চুরি কইরা খামু না। আমি এই গেরাম থিকা যামু গা। আমার জিবলাটা আপনেরা কাইটেন না।

কদম হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। চদরি সাব, ও চদরি সাব। আমারে আপনে মাপ কইরা দেন। আমার জিবলাটা আপনে কাইটেন না। চদরি সাব, ও চদরি সাব... ...

এ সময় সৌম শান্ত রাজ্জাক মাস্টারকে দেখা গেল চৌধুরীবাড়ির দিকে হেঁটে আসছেন। পরনে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি, চোখে চশমা, হাতে একখানা ছাতা। তিনি যখন কদমের অদূরে এসে দাঁড়িয়েছেন, তখন নিজাম চৌধুরীর গুড়গুড়া হুঁকা আর একখানা কাস্তে নিয়ে নবুও হাজির। হুঁকার নল চৌধুরী সাহেবের হাতে দিয়ে কাস্তে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বিকেলবেলার রোদের একটা রেখা এসে পড়েছে কাস্তের ধারের ওপর। ঝকঝক করছে কাস্তে।

রাজ্জাক মাস্টারকে দেখে আগের মতোই কাঁদতে কাঁদতে কদম বলল, ছার, ও ছার, আপনে আমারে বাঁচান ছার, আপনে আমারে বাঁচান।

রাজ্জাক মাস্টারকে দেখেই খলিল ভেন্ডার তার চেয়ার ছেড়ে দিয়েছে। সেই চেয়ারে বসে শাস্তির কথাটা শুনলেন রাজ্জাক মাস্টার। শুনে প্রথমে স্তব্ধ হলেন, তারপর চশমা খুলে পাঞ্জাবির খুঁটে মুছতে মুছতে বললেন, লঘু পাপে গুরুদণ্ড।

নিজাম চৌধুরী তামাক টানতে টানতে রুক্ষ গলায় বললেন, না, গুরুদণ্ড না, এইটাই আসল দণ্ড। এইটাই হওন উচিত।

রাজ্জাক মাস্টারকে দেখে দলিল মাতবর গংদের মুখে কথা ফুটি ফুটি করছে। আমতা গলায় সে বলল, জিবলাটা না কাইটা অরে আপনে গেরাম থিকা বাইরঐ কইরা দেন।

ওহাব আলী পঞ্চায়েত সব সময়ই নিজাম চৌধুরীর পক্ষে। সে বলল, তয় চদরি সাবের ওই লেচকারটার (লেকচার) দাম রইল কী? দ্যাশের মানুষ, শান্তি, স্বাধীনতা!

ব্যাপারটা বুঝতে পারলেন না রাজ্জাক মাস্টার। নিজাম চৌধুরীর মুখের দিকে তাকালেন। কথাগুলো আমাকে একটু বুঝিয়ে বলুন চৌধুরী সাহেব।

সেই কথাগুলো আবার বললেন নিজাম চৌধুরী। শুনে খানিক চুপ করে রইলেন রাজ্জাক মাস্টার। তারপর ধীর-শান্ত গলায় বললেন, খুব সুন্দর কথা। আসলেই দেশের সব মানুষ আমাদের মানুষ। সব গ্রামই আমাদের গ্রাম। আমরা চাই সব মানুষই শান্তিতে থাক। এ জন্যই আমরা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি। কদমের জন্য সেই শান্তি কেন নষ্ট হবে? কিন্তু এর পাশাপাশি আর একটা কথা আছে। বায়ান্ন সালে আমাদের ভাষাটা কেড়ে নিতে চেয়েছিল পাকিস্তানিরা। বুকের রক্ত দিয়ে আমরা তা ঠেকিয়েছি। প্রকৃত অর্থে সেদিন থেকেই শুরু হয়েছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। একাত্তর সালে সেই যুদ্ধে আমরা জয়ী হলাম। আর আজ স্বাধীন বাংলাদেশে সামান্য ভাত চুরি করে খাওয়ার অপরাধে, বাঙালি হয়ে একজন বাঙালির মুখের ভাষা আমরা কেড়ে নেব? এটা বড় অন্যায় হবে চৌধুরী সাহেব। কদমের দোষটা আমরা জানি। কেন সে এমন করে, তাও জানি। কিন্তু তার দোষটা শুধরাবার চেষ্টা তো আমরা কেউ কখনও করিনি! কদমও তো দেশের মানুষ, তার কথা আমরা কেন ভাবিনি?

রাজ্জাক মাস্টারের কথা শুনে সবাই কেমন চিন্তিত হল। তাই তো! এভাবে তো ভাবা হয়নি!

রাজ্জাক মাস্টার বললেন, আমি গরিব স্কুল মাস্টার। অতিকষ্টে দিনাতিপাত করি। নুন আনতে পান্তা ফুরায়। তার পরও আজ থেকে কদমের দায়িত্ব আমার। ও খাবে আমার বাড়িতে, থাকবে আমার বাড়িতে। এত দিন যে অন্যায় সে করেছে, তার হয়ে আমি আপনাদের কাছে সেই অন্যায়ের জন্য মাফ চাইছি।

হাত জোড় করে উঠে দাঁড়ালেন রাজ্জাক মাস্টার। কদমকে আপনারা মাফ করে দিন।

ঘরদুয়ারের আনাচকানাচে দাঁড়িয়ে থাকা বউঝিদের দিকে তাকিয়ে বললেন, মা-বোনরা, আপনারাও কদমকে মাফ করে দিন।

রাজ্জাক মাস্টারের কথায় সবাই আপ্লুত হয়ে গেল। যে যার মতো করে বলতে লাগল, হ, আমরা অরে মাপ কইরা দিলাম। একদম মাপ কইরা দিলাম।

নিজাম চৌধুরী গম্ভীর গলায় বললেন, নবু, কদমারে ছাইড়া দে।

কদমা তখন আনন্দে আত্মহারা। ছেড়ে দেওয়ার পর কোনও দিকে তাকাল না সে। আচমকা একটা দৌড় দিল, মাঠের দিকে নেমে গেল।

সূর্য ডোবার আগে রক্তের মতো লাল হয়েছে আকাশ। গ্রামের ধারে খোলা আকাশের তলায় নির্জনে পড়ে আছে সবুজ ঘাসের উদাস একখানা মাঠ। সেই মাঠের ওপর দিয়ে আনন্দে ফেটে পড়া শিশুর ভঙ্গিমায় ছুটছে কদম। যেন তার মতো স্বাধীন মানুষ এই পৃথিবীতে আর কেউ নেই।


মন্তব্য