kalerkantho

বিজয়ী শব্দাবলী

শাহ্‌নাজ মুন্নী

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



বিজয়ী শব্দাবলী

অঙ্কন : মানব

‘ও এম জি! মা, তুমি কিভাবে এই সব বস্তাপচা ন্যাকা ন্যাকা বাংলা গান শোনো, আর প্যাচপ্যাচে বাংলা উপন্যাস পড়ে চোখের পানি মোছ, বুঝি না!’

ঠোঁট গোল করে বিকৃত বাংলা উচ্চারণে যখন জারা বলত, তখন একে ইংরেজি মাধ্যমে পড়া কিশোরীর স্বভাবসুলভ উন্নাসিকতা বলেই ধরে নিত মাজেদা। হাসত।

মেয়েকে পাল্টা বলত, ‘তোরাই বা ওই সব ইংরেজি গানের হৈ-হল্লা, চিত্কার, চেঁচামেচির মধ্যে কী মজা পাস, কে জানে? ওসব শোনা যায়? মনে হয় কানের পর্দা ফেটে যাচ্ছে ...’

‘ইউ আর এ ব্যাকডেটেড উইমেন মা’—জারা বলত।

মাজেদা জানে, নতুন প্রজন্ম সব সময়ই আগের প্রজন্মের চেয়ে এগিয়ে থাকে। ফলে মাকে মেয়ের কাছে সেকেলে বা পুরনোপন্থী মনে হতেই পারে। মাজেদারও যেমন অল্প বয়সে অনেক সময় তার পড়ালেখা না-জানা মায়ের চিন্তা-ভাবনাকে প্রাচীন বলে ভ্রম হতো। পরে বয়স যত বেড়েছে, ততই বুঝেছে, প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা না করলে কী হবে, জ্ঞানে আর প্রজ্ঞায় মা কোনো দিকেই খাটো তো ননই, বরং কখনো কখনো তার বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানকেও মা অতিক্রম করে গেছেন নিজস্ব অভিজ্ঞতা আর বুদ্ধিমত্তার জোরে। চিন্তা-চেতনায় মাকে মনে হয়েছে অনেক আধুনিক। উচ্চশিক্ষার সার্টিফিকেট না থাকলেও মা ছিলেন অনেক উচ্চশিক্ষিতের চেয়েও  উন্নত মানসিকতার মানুষ। বয়স বাড়লে জারাও হয়তো মাকে নতুনভাবে উপলব্ধি করবে, ভাবত মাজেদা।

মফস্বল শহরে বাংলা মাধ্যম স্কুলে পড়াশোনা মাজেদা বেগমের।

পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পড়াশোনা তার।  

‘স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলা ছোটগল্পে আঞ্চলিক ভাষার প্রভাব’—বিষয়ে এমফিলও করেছে মাজেদা, এখন একটা সরকারি কলেজে বাংলায় অধ্যাপনা করছে। স্বামী আখলাক ব্যবসায়ী, লোহালক্কড়ের পারিবারিক ব্যবসা তার। আয়-রোজগার ভালো। মেয়ে জারা আর ছেলে জারিফকে নিয়ে সচ্ছল সংসার মাজেদার।

জারা আর জারিফকে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ানোর সিদ্ধান্ত অবশ্য মাজেদা নেয়নি, আখলাকই নিয়েছিল।

‘বাংলায় পইড়া কোনো লাভ নাই। ব্যবসা বলো, চাকরি বলো—যা-ই করতে যাও, ইংরেজি লাগবেই। দুনিয়াজুড়ে ইংরেজিরই রাজত্ব চলছে এখন। আমাদের গ্লোবালি ভাবতে হবে। আমার যেহেতু সামর্থ্য আছে, তাই শুধু বাংলা পড়ায়া আমি বাচ্চাদের জীবন নষ্ট করতে চাই না ...’

মাজেদা আপত্তি করেনি। পড়ুক না। ইংরেজি পড়তে তো দোষ নেই। ছোটবেলা থেকে বাচ্চাদের সুন্দর করে বাংলা বলা তো শিখিয়েছে সে। একুশে ফেব্রুয়ারির  ভোরে ঘুম থেকে টেনে তুলে শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাতে নিয়ে গেছে, পহেলা বৈশাখে নতুন কাপড় পরিয়ে রমনা ছায়ানটে নিয়ে গেছে। অন্য ভাষার পাশাপাশি নিজের ভাষাটাকে মনে রাখলেই হয়, ভালোবাসলেই হয়। ইংরেজি পড়লে বাংলাকে ভুলে যেতে হবে—এমন দিব্যি তো কেউ দেয়নি। বাংলা ভাষার একটা আশ্চর্য শক্তি অছে বলে বিশ্বাস করে মাজেদা।   সেই বিশ্বাস থেকেই ওদের ইংরেজি মাধ্যমে পড়াটাকে মেনে নিয়েছে সে।

এর মধ্যে জারা একদিন বাসায় এসে ঘোষণা দিল—বাড়িতে বাংলা বলবে না সে, স্কুলের মিস বলেছে সব সময় ইংরেজিতে কথা বলতে। তাই সবার সঙ্গেই ইংরেজি ভাষায় কথা বলতে হবে তার। কাজ চালানোর মতো ইংরেজি বলতে পারে মাজেদা, কিন্তু সাহেবদের মতো অনর্গল ইংরেজি আসে না তার। জিবে আটকে যায়। জটিল লম্বা বাক্যগুলো মুখে বলার আগে মনে মনে বাংলা থেকে ইংরেজিতে ট্রান্সলেশন করে তারপর বলতে হয় তার, যে কারণে বলতে সময় লাগে। জারা আর জারিফ মায়ের এই প্রাণান্ত চেষ্টা দেখে নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করে।

মাজেদা এ নিয়ে রাগ করে না। সে নিজেও ওদের সঙ্গে হাসিতে যোগ দেয়। জারা ও জারিফ এখন আর একুশে ফেব্রুয়ারি বা পহেলা বৈশাখে মায়ের সঙ্গে সকালে বের হয় না। ওরা রাত জাগে, গভীর রাত পর্যন্ত পড়াশোনা করে ভোরবেলা ঘুমাতে যায়। মাজেদাও সেই জন্য আর ডাকাডাকি করে না। এগুলো গভীর অনুভবের বিষয়, প্রাণের তাগিদ না থাকলে জোর করে ওসব জায়গায় নিয়ে যাওয়ার কোনো অর্থ হয় না। মাজেদা একাই যায়, মাঝেমধ্যে তার সঙ্গী হয় জুনিয়র সহকর্মী তাসলিমা।

তাসলিমার মধ্যে শতভাগ বাঙালিয়ানা দেখতে পায় মাজেদা। আজকাল মেয়েরা তো শাড়ি পরতেই চায় না, সালোয়ার-কামিজ পরে, তার নিজের মেয়ে জারা তো আরেক কাঠি ওপরে, জিনস-ফতুয়াই তার সবচেয়ে প্রিয়; কিন্তু তাসলিমা সুন্দর করে কুঁচি দিয়ে পার্ট করে শাড়ি পরে। কপালে টিপ দেয়, খোঁপায় তাজা ফুল পরে। মাজেদা নিজেও শাড়িতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। তাসলিমার সঙ্গে তাই খুব জমে যায় তার। দুজন অসমবয়সী বান্ধবী যেন। তাসলিমা পুট পুট করে অনেক মজার কথা বলে। মাজেদা হাসতে হাসতে মরে যায়। ওর কয়েকটা কথার নমুনা—

‘জানেন আপা, এখনকার ছেলে-মেয়েরা কিন্তু প্রেমে পড়ে না, ক্রাশ খায়, বোকা প্রকৃতির মানুষরা ভালোবাসে। চালাকরা এত বেশি ক্রাশ খায় যে ওদের আর ভাত খাওয়া লাগে না। ’

মাজেদা সায় দিয়ে বলে—

‘ঠিকই বলেছ, আগে কখনো হ্যাং আউট শুনছ? এখন তো বন্ধুদের সঙ্গে বাইর হইলেই পোলাপান বলে, হ্যাং আউট করি ... হি হি হি!’

‘আর আপা, চ্যাটিং কথাটা শুনতে কেমন লাগে বলেন! অশ্লীল মনে হয়, অথচ কী অবলীলায় বাচ্চা পোলাপান এসব কথা বলে ...’

মাজেদা তখন তার শিক্ষকসুলভ জ্ঞান জাহির করে। বলে—

‘শোন তাসলিমা, ভাষা সব সময় পরিবর্তনশীল। বহতা নদীর মতো প্রবহমান। এটি কখনোই এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না। ভাষার পরিবর্তন হবেই, আর এই পরিবর্তন রোধ করাও সম্ভব না। ভাষার বাঁকবদল নিয়ে এত চিন্তা করারও কিছু নেই। পৃথিবীর সব ভাষায়ই অন্য ভাষার মিশ্রণ আছে। নতুন নতুন শব্দ ভাষাকে সমৃদ্ধও করে। ’

তাসলিমা একটু বাধা দিয়ে বলে, ‘কিন্তু আপা, কী হবে সেই নতুন শব্দ, আর কেমন হবে সেই বাঁকবদল, তা নিয়ে কিন্তু ভাবতে হবে। ’

মাজেদা বলে, ‘আচ্ছা বাদ দেও তো এই সব ক্লাসরুমের কথা, চলো চটপটি খেয়ে আসি। ’

দুজনে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে অল্পবয়সী কিশোরীদের মতো চটপটি খায়। ঝাল লাগলে ‘আহ্্-উহু’ করে। মাজেদা বলে, ‘বিয়ে করবা না তাসলিমা?’

‘আপা, ছেলে পাই না তো, আমার জন্য একটা ভালো ছেলে দেখেন। ’

‘ভালো ছেলে কই পাব?’ মাজেদা ঠোঁট উল্টে বলে।

‘কই পাবেন জানি না, বিয়ার কথা এখন যেই বলে তাকেই বলি ছেলে খুঁজতে। শুদ্ধ বাংলা বলতে পারে—এমন ছেলে চাই। আজকাল দেখি ফিটফাট ছেলে, কিন্তু মুখ খুললেই সব স্মার্টনেস শেষ। ভাষা শুইন্যা মনে হয় দৌড় দিই। ’

‘কেন এমন বলছ তাসলিমা? সবাই কি আর শুদ্ধ বাংলা বলে? আঞ্চলিক টান থাকতেই পারে। আসলে তোমার দেখা উচিত ছেলেটা কেমন; স্বভাব-চরিত্র, আচার-ব্যবহার এইগুলা...’

তাসলিমা হা হা করে ওঠে, ‘আল্লা, আপা, আপনে কী ভাবছেন! আমি কি আঞ্চলিক ভাষার কথা বলছি? হায় হায়, আঞ্চলিক তো আমিও বলি; কিন্তু সব জায়গায় কি সব ভাষা চলে? রাতে যেই কাপড় পইরা ঘুমান সেই কাপড় পইরা কি আপনে পার্টিতে যাবেন? অথবা কলেজে ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে যেভাবে আমি কথা বলি, সেভাবে কি ঘরে কথা বলব? ভাষা পোশাকের মতোই আপা, সব জায়গায় সব ভাষা চলে না। কথা বলা একটা আর্ট। সুন্দর কইরা কথা না বললে আর্ট নষ্ট হয়ে যায় আপা। ’

মাজেদা আর কিছু বলে না। তাসলিমার কথা শুনে তার জারার কথা মনে হয়। জারা এ-লেভেল শেষ করেছে। এরই মধ্যে আমেরিকার একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাডমিশন নিয়ে ফেলেছে। হয়তো সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই সেখানে পড়তে চলে যাবে। জারা কি শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরে আসবে? এ দেশে বসবাস করবে? সে কি এ দেশের কোনো ছেলেকে বিয়ে করবে? কে জানে? বুক চিড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয় তার। নিজের পেটের মেয়ে কত দূরে চলে গেছে, আর তাসলিমা পরের মেয়ে হলেও কত কাছে চলে এসেছে। দুজন সম্পূর্ণ দুই প্রকৃতির, তবু জারার জন্য যেমন তেমনি তাসলিমার জন্যও মনের মধ্যে কেমন একটা টান অনুভব করে মাজেদা।

জারা বিদেশ থেকে তুষার ঝরার ছবি পাঠায়। সাদা বরফের মধ্যে লাল জ্যাকেট পরে গড়াগড়ি করার ছবি। জানায় যে পরীক্ষায় সে ভালো রেজাল্ট করছে। খুব ভালো আছে। গ্র্যাজুয়েশন শেষ হওয়ার পর দেশে আসে জারা। মেয়েকে দেখে অবাক লাগে মাজেদার। মনে হয় অনেক দূরের মানুষ হয়ে গেছে সে।

‘বিয়েটিয়ের কথা ভাবিস নাকি জারা?’ মাজেদা জিজ্ঞেস করে।

জারা হাসে, ‘কাম অন মা, এত তাড়া কিসের?’

আখলাকের সঙ্গে মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলাপ করে মাজেদা। বয়স তো ২৫ হয়ে গেল; বিয়ে-শাদির কথা কি ভাববে না, জারা? আখলাকও মেয়ের মতোই হাসে। বলে, ‘শোনো, পশ্চিমা দেশে চল্লিশের আগে বিয়ের কথা ভাবে না কেউ, জারা কি করবে তার সিদ্ধান্ত ওকেই নিতে দেও। ’

বাবা-মাকে জানায়, আরো পড়তে চায় জারা। পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন করবে। জারিফও বোনের পথ ধরে। উচ্চশিক্ষার জন্য চলে যায় অন্য দেশে। মাকে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘চিন্তা কোরো না মা, আমি ঠিকই পড়াশোনা শেষ করে দেশে চলে আসব। ’

ঘরে এখন আখলাক আর মাজেদা, দুই বুড়ো-বুড়ি।

মাজেদা কলেজ থেকে অবসর নিয়েছে। শরীরটাও বেশি ভালো থাকে না আজকাল। তবু সকালবেলা উঠে ধানমণ্ডি লেকের পাশে হাঁটতে যায় মাজেদা। কৃষ্ণচূড়াগাছের নিচে লাল ইটের বাঁধানো পথ ধরে হাঁটে। মাঝেমধ্যে তাসলিমাও আসে। বিয়ে হয়েছে তার। স্বামী আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে ফরাসি ভাষার শিক্ষক। একটু বয়স্ক, তবে মানুষ ভালো। তাসলিমার ইচ্ছা পূরণ হয়েছে। তার স্বামী চমত্কার করে কথা বলে।

‘যে যা চায়, তা যদি খুব বেশি করে চায় তাহলে সে সেটা পায় আপা। ’ তাসলিমা বলে।

‘সব সময় কি আর তা হয়?’ মাজেদা ভাবে, ‘সে-ও তো এই জীবনে কত কিছু চেয়েছে, সব কি আর পেয়েছে?’

‘আপনার চাওয়াতে হয়তো খাদ ছিল আপা। ’ তাসলিমা বলে।

 মাজেদা আর মেয়েটার সঙ্গে তর্কে যায় না। থাক, সে তার বিশ্বাস নিয়ে থাকুক। সকালে হেঁটে আসার পর সারা দিন আর তেমন কোনো কাজ থাকে না। অখণ্ড অবসর। ঘুম, টেলিভিশন দেখা আর বিশ্রামের মধ্যে নিজেকে মাঝেমধ্যে কেমন যেন অথর্ব লাগে। আগে তো ছাত্র-ছাত্রী, কলেজে যাওয়া, লেকচার রেডি করা, পরীক্ষার খাতা দেখা—এমন কত কাজ ছিল। এখন যেন কাজ আর খুঁজে পাওয়া যায় না। সময় কাটানোটাই একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।   

এদিকে আখলাকের একটুও  অবসর নেই। তার ব্যবসা দিন দিন আরো বাড়ছে।  

জারা-জারিফ প্রায়ই ফোন করে, স্কাইপে কথা বলে। সেই সময়টা ভালোই কাটে মাজেদার। জারিফ হয়তো জিজ্ঞেস করে, ‘গরুর মাংস রাঁধার রেসিপি কী, মা? আজকে আমি নিজে মাংস রাঁধতে চাই। ’

মাজেদা তখন প্রবল উত্সাহে সেই রেসিপি দিতে শুরু করে। ‘মাংস প্রথমে ভালো করে ধুতে হবে, ধুয়েছ তো, বাবা?’

‘হ্যাঁ, মা। ’

‘এবার রসুন বাটা, জিরা বাটা, এলাচ, আদা বাটা, গরম মসলা, হলুদ, মরিচ সব মিশিয়ে একটু মেরিনেট করে নাও। লবণ দিয়েছ তো, বাবা?’

‘হ্যাঁ, মা...’

‘একটু মেথি গুঁড়া দিতে পারবা? ঘ্রাণটা ভালো হবে...’

‘ওহ নো, মা, এইটা তো কিনি নাই; এখন কিনতে হলে আবার সুপার শপে যেতে হবে। ’

‘ও আচ্ছা, তাহলে থাক। না দিলেও চলবে...। ’

একসময় লাইন কেটে যায়। মাজেদা মনে মনে কল্পনা করতে থাকে ছেলের মাংস রান্নার বিভিন্ন ধাপ। আহা, যে ছেলে ঢাকায় প্লেটটাও ধুয়ে খায়নি, সে এখন নিজে থেকে রান্না করছে।  

‘মা, তুমি আমেরিকা আসো। এখানে এসে আমাদের দেখে যাও। ’

জারা-জারিফ দুজন প্রায়ই বলে। আখলাকও বলে, হাতের কাজটা একটু গুছিয়ে নিই, তারপর যাব।

এর মধ্যে জারার জরুরি ফোন। এ মাসেই আখলাক আর মাজেদাকে আমেরিকা যেতে হবে। কোনো অজুহাত সে শুনবে না, মা-বাবাকে আসতেই হবে। কারণ জারা বিয়ে করছে।

বিয়ে? কাকে?—মাজেদা উত্তেজনায় কাঁপতে থাকে।

জারা জানায়, তার অনেক দিনের বয়ফ্রেন্ড রবার্টকে বিয়ে করছে সে।

খবরটা পেয়ে একটু দমে যায় মাজেদা। রবার্টের ছবি দেখেছে সে। দুয়েক দিন স্কাইপে হাই-হ্যালোও হয়েছে। কিন্তু বাঙালি কাউকে বিয়ে না করে আমেরিকান বিয়ে করা! মাজেদা মন থেকে মেনে নিতে পারে না। মুষড়ে পরা মাজেদাকে সান্ত্বনা দেয় আখলাক। বলে, ‘যার যার জীবন তার তার। জারা যদি সুখী হয়, তবে আমাদের আপত্তি করার কী আছে, বলো? তা ছাড়া সবার ওপর মানুষ সত্য, সে বাঙালি, না আমেরিকান, তাতে কী আসে-যায়?’

মেয়ের জামাইয়ের সঙ্গে যে একটু আরাম করে নিজের ভাষায় কথা বলব, তাও পারা যাবে না! এখন আবার কষ্ট করে ইংরেজি বলতে হবে। —মাজেদা ভাবে।

‘আরে, মেয়ে-জামাইয়ের সঙ্গে কয়টা কথা আর বলবা, বাদ দেও তো। এত ভাবলে চলে?’ আখলাক বলে।

‘আরে মাতৃভাষায় যেভাবে আদর করে জামাইয়ের খোঁজ-খবর করা যায়, বিদেশি ভাষায় তেমন আদর করে, আন্তরিকভাবে আমি কথা বলতে পারব, বলো? মনের ভাবটা প্রকাশ করতে পারব? নিজের অনুভূতি জানাতে পারব?’

‘তুমি বড্ড প্যাচপ্যাচ করো, এসব নিয়ে ভেবে মাথা নষ্ট করার দরকার কী? আমাদের সঙ্গে আর কয়দিন দেখা হবে ওদের?’ আখলাক খুব বিরক্ত হয়।

‘আচ্ছা, জারিফও কি বিদেশি মেয়ে বিয়ে করবে? ছেলের বউয়ের সঙ্গেও আমাকে কৃত্রিমভাবে কথা বলতে হবে?’

মাজেদার মন থেকে সংশয় দূর হয় না। আখলাক এবার আর স্ত্রীর কথার উত্তর দেয় না, বলে বলুক।

শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ ক্লান্তিকর ভ্রমণ শেষে আমেরিকা পৌঁছায় মাজেদা-আখলাক দম্পতি। জারা বিয়ের প্রস্তুতি নিয়ে মহাব্যস্ত। পছন্দসই গাউন কেনা, সেই মতো সাজসজ্জা এসব নিয়ে তার পরিকল্পনার অন্ত নেই।  

মাজেদা গিয়ে জারিফকে ধরে। বলে, ‘আমি তো আমেরিকান আদব-কায়দা বুঝি না। ওদের কালচারও জানি না। ওরা মেয়ে-জামাইয়ের সঙ্গে কিভাবে কথা বলে, আমাকে একটু শিখিয়ে দে তো বাবা। ’ 

‘ওহ মা, কি সুইট তুমি!’ জারিফ বলে, ‘এসব নিয়ে একদম ভাববা না, রবার্ট অন্য রকম ছেলে। তোমার যেমন ইচ্ছা তেমন করে ওর সঙ্গে কথা বোলো। ’

মাজেদা তবু মনে মনে ইংরেজিতে কথা গুছিয়ে নেয়। প্রথমে জিজ্ঞেস করবে, কেমন আছ বাবা, মাই সান ইন ল? তোমার মা-বাবা কেমন আছে? হাউ আর ইওর প্যারেন্টস? এবারের উইন্টারে বাংলাদেশে বেড়াতে এসো। কাম ভিজিট বাংলাদেশ ইন দিস উইন্টার। খুব ভালো লাগবে তোমার। ইউ ফিল রিয়েলি গুড। ইত্যাদি ইত্যাদি।

বিয়ের দিন খুব সুন্দর দেখায় জারাকে। সাদা গাউন আর সাদা ফুল দিয়ে সেজেছে জারা। মাজেদা মুগ্ধ হয়ে যায় মেয়েকে দেখে। মেয়েকে লাল বেনারসি পরাতে না পারার দুঃখ ভুলে যায় সে। রবার্ট এসেছে চমত্কার একটা কালো ব্লেজার আর প্যান্ট পরে।

মাজেদা রবার্টের সঙ্গে যেসব কথা বলবে বলে ভেবেছিল, সেসব আবার ইংরেজি ভাষায় মনে মনে ঝালাই করে নেয়। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে রবার্ট এসে মাজেদার পাশে বসে। তারপর মাজেদা কিছু বলার আগেই পরিষ্কার বাংলা ভাষায় বলে,

‘মা, আপনি কেমন আছেন?’

মাজেদা খানিকটা হতভম্ভ হয়ে চারপাশে তাকায়। এতক্ষণ ধরে মনে মনে সাজিয়ে রাখা সব কথা ভুলে যায় সে। যেন ঠিক বুঝে উঠতে পারে না কী হচ্ছে?

রবার্ট তখন আবার বলে,

‘মা, আমি আপনার সঙ্গে কথা বলার জন্য বাংলা ভাষা শিখেছি। জারা বলেছে, আপনি বাংলা ভাষা খুব ভালোবাসেন। আমিও বাংলা ভাষা খুব ভালোবাসি। ’     

মাজেদার হঠাৎ কী হয়, মনে হয় গলার কাছে কিছু একটা আটকে আছে, সে তার চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারে না।    


মন্তব্য