kalerkantho

সন্ধান

বিপ্রদাশ বড়ুয়া

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



সন্ধান

অঙ্কন : দেওয়ান আতিকুর রহমান

ঋজুবাবু খাগড়াছড়ির চংড়াছড়ি গ্রামের ত্রিপুরা জাতিসত্তার ছাত্র। প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। আমার বাংলা বই ও ইংলিশ ফর টুডে তার বই। মা-বাবা জুমচাষের শত ব্যস্ততার মধ্যেও ছেলেকে পড়াশোনায় আগ্রহী করে তোলেন। লেখাপড়া শিখিয়ে অনেক বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখান এবং নিজেও দেখেন।

ঋজুবাবু জন্মের পর থেকে দেখছে পাহাড়, জুম, নদী, ছড়া গাছপালা ও পশুপাখির সঙ্গে বাধাবন্ধহীন খেলার জগৎ। স্কুলের পাঠ্য বইয়ে এসব কিছু নেই। ছড়া-কবিতা-গান-গল্প ইত্যাদিতেও তার চারপাশের পরিচিত পরিবেশ নেই। বাড়িতে মা-বাবা ও পাড়ার বন্ধুদের খেলাধুলায় যে ভাষায় তারা কথা বলে তার থেকে একেবারে আলাদা বইয়ের ভাষা ও জগতের। ত্রিপুরি শিশু বাড়িতে কথা বলে কক্বরক্ ভাষায়। স্কুলে একজন শিক্ষক আছেন ত্রিপুরি।

ফেব্রুয়ারির একদিন তিনি ঋজুবাবুকে প্রশ্ন করেন, ‘বলো তো, আমাদের মাতৃভাষার নাম কী?’ ওই শিশু সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল—‘আমাদের মাতৃভাষার নাম কক্বরক্। ’

উত্তর শুনে কক্বরক্ভাষী শিক্ষকের সন্তুষ্ট ও খুশি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হলেন না। তাঁর মনে পড়ল ছেলেবেলায় তাঁকেও এক শিক্ষক এই প্রশ্ন করেছিলেন। তিনিই এই একই প্রশ্নের উত্তর দিতে এই ভুল (?) করেছিলেন। ওই ভুল করে শাস্তি পেয়েছিলেন এবং নিজের উত্তর শুধরে নিয়েছিলেন।

তাঁর ছাত্র ঋজুবাবু যাতে লেখাপড়ায় অবহেলা না করে, পড়াশোনার প্রতি অবহেলার কারণে ভুল উত্তর দিতে আর কোনো দিন ভুল না করে, তার জন্য কঠোর শাস্তি দিলেন পিঠে বেত মেরে। শিশুরা তাদের শিক্ষকদের জগতের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী মনে করে। সেই জ্ঞানী গুরুর শাস্তি পিঠ পেতে নিয়ে অশ্রুচোখে কোথায় তার ভুল হলো তা জানতে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল। কক্বরক্ই তার মাতৃভাষা। ঋজুবাবু তো সঠিক উত্তরই দিয়েছিল। ভুলটা তার কোথায়, তার পরও তাকে শাস্তি পেতে হলো কেন? তাহলে কক্বরক্ কি তার মাতৃভাষা নয়?

ঋজুবাবু মাধ্যমিক শেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রশিক্ষণ পাস করলেন। রুইলুই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরি পেলেন। উত্তর দিকে তাঁর ছেলেবেলার সংরক্ষিত বন তেমন গহিন নিবিড় না হলেও এখনো অরণ্য বলা চলে। অরণ্যের মুখে জিরাক পাংখোর টংঘর, বনের পাহারাদার বুড়ো তিনি, একটি বন্দুক ও কুকুর আছে নিত্যসঙ্গী। বুড়োর পরিবার থাকে সাজেকের রুইলুই এলাকায়। কমলার জন্য সাজেকের খুব নাম। পাহাড়ের উপরিভাগ সমতল, সরকারি অফিস ও প্রাথমিক বিদ্যালয়। চারদিকে উপত্যকা, পাহাড়ি ছড়া, ঝরনা আর বাঁশবন ও গাছপালা।

ঋজুবাবুর ত্রিপুরার শিক্ষকতা জীবনে প্রথম এসে গেল মাতৃভাষা দিবস একুশে ফেব্রুয়ারি। ৭১ জন ছাত্র-ছাত্রী। টুল-বেঞ্চি সরিয়ে ঢালাও বসার জায়গা করা হয়েছে পাটি ও হোগলা পেতে। এক পাশে গান গাওয়ার জন্য ছাত্র-ছাত্রীরা বসেছে। গায়ক-গায়িকা ছাত্র-ছাত্রীদের পেছনে বসে শিঙা, ধুদুগ, জান্দুরা ও খেং গরং নিয়ে বাদ্যযন্ত্রীরা। ছাত্র-ছাত্রীদের মা-বাবারাও বসেছেন। সবাই মঞ্চে বসা গায়ক-গায়িকাদের দিকে তাকিয়ে আছেন। ঋজুবাবু একুশে ফেব্রুয়ারি ও মাতৃভাষা দিবস সম্পর্কে বলে থামলেন। তারপর শুরু হলো, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গান। প্রথমে চাকমা ভাষায়—

ম ভেইয়র রক্ত লোই রাঙানো

একুশে ফেব্রুয়ারি

মুই হি পুরি ফেলে পারং?

পো হারা শত মার চোগ পানি লোই

বানিয়ে এ ফেব্রুয়ারি

মুই হি পুরি ফেলে পারং!

দর্শক ছাত্র-ছাত্রীদের একজন ওদের সঙ্গে সুর মেলে ধরল। প্রথম শ্রেণির প্রভা চাকমা দর্শকদের মাঝ থেকে গলা ছেড়ে গেয়ে উঠল। এক মা কোলের শিশুকে দুধ দিতে দিতে কেঁদে ফেললেন। তাঁর চোখে অশ্রু। শ্রোতারা নীরব, যেন শহীদদের শবাধার বহন করে নিয়ে চলছে তারা। গান শেষে স্কুলের তক্ষকটি ডেকে উঠল পাঁচবার—সবাই তাও মনোযোগ দিয়ে শুনল। এবার মারমা ছাত্র-ছাত্রীরা একুশের গানটি শুরু করল। বাদ্যযন্ত্র বেজে উঠল বিষণ্ন রাং রাং পাখির মতো—

কোঃ ক্রি স্যুই দঃ চুইনিরে হ্

ন্যইংছে তারাক ফেব্রুয়ারি

আক্যেয়াইরো গাঃ মুইং হন্যইং রেল্?

সাঃ প্যইচা রাগ্যই মুইং খাং

ম্যাকরে না অং স্রাংরে ফেব্রুয়ারি

আক্যেয়াইরো গাঃ মুইং হন্যইংরে রেল্?

এক মহিলা কোলে রাখা থলেটি পাশে নামিয়ে রাখল যেন মৃত শিশু। একটা ছোট্ট ছেলে তার কোর্তার জেব থেকে গিলা বের করে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে চলল।

একটি মেয়ে তার আধ খাওয়া শক্ত পেয়ারাটি গান শুনতে শুনতে খেতে ভুলে গেল। ত্রিপুরি ছেলে-মেয়েরা তাদের কক্বরক্ ভাষায় গাইতে শুরু করল—

আনি তাখুনি খৈঅ কুলুকজাক

নুইচিসা ফেব্রুয়ারি

তামা, খাইয়ই পালকনানি?

বাসা করই মানি মকল মুকতুই

সিক্লাইয়ই ফেব্রুয়ারি,

তামা খাইয়ই পালকনানি?

অনুষ্ঠান শেষ। এক পাংখো, এক বনযোগী, এক গারো শিশু তাদের মায়ের ভাষার কথা ভাবল, গান গাইতে চেষ্টা করল মনে মনে। সবাই চলে যাচ্ছে। পাহাড় থেকে তাদের বাড়ি অভিমুখী ঢালু পথ বেয়ে নামতে হয়। পাশে আছে কমলাগাছ মাঝে মাঝে। কমলা শেষ। এক মা কমলা পাতা ছিঁড়ে কচলে গন্ধ শুঁকছেন, তাঁর মাথায় খবং, মাথা ধরার ব্যামো আছে তাঁর, আগে আগে যাচ্ছে মেয়ে, প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। তার বাংলা বইয়ে কোথাও তাদের কথা নেই। একটি কবিতা বা গল্প বা গান অথবা ছবি কিছুই নেই। পাহাড় বেয়ে নামতে নামতে যা দেখছে তার কিছুই নেই। একেবারে নিচে আছে ছড়া, ঝরনার জলের স্রোতধারা। একটা বনমোরগ ডেকে উঠল, একটা ভিরেজ বা ভীমরাজ। একটা ফুল-পাতাহীন জংলি বাদামগাছ। জুমের একটি পরিত্যক্ত মোনঘরের পাশের গাছে কলার মোচা বের হচ্ছে, এক ঝাঁক ছাতারে পাখি স্বভাবসুলভ ক্যাঁচ ক্যাঁচ করছে।

ঋজুবাবু নিজের কামরায় এসে বসলেন। আগামী বছর চাক, রাখাইন, ম্রো বা বোম যেসব ছাত্র-ছাত্রী আছে সবার ভাষায় গান গাইতে দেবেন। তাদের পশুপাখির ডাক শোনাতে বলবে চাক, ম্রো, বনযোগী, কুকি, নাগাদের মাতৃভাষায় এবং বাংলায়ও জানাতে বলবে। ততক্ষণে স্কুল কমিটির সভাপতি ঢুকে বেশ কড়া ভাষায় এ ধরনের অনুষ্ঠানের জন্য দোষারোপ করে বসলেন। রাষ্ট্রভাষা বাংলার বদলে অন্য ভাষায় গান গাওয়ার জন্য ঋজুবাবু ত্রিপুরাকে প্রস্তুত হতে শাসিয়ে দিলেন। কক্ষের পেছনের দিকের ঠাণ্ডা প্রশস্ত খোলা জানালা দিয়ে দিন শেষের ফুরফুরে হাওয়া ঢুকছিল, ওদিকে দেখা যায় অরণ্যের অবশিষ্ট গাছপালা, প্রায় পত্রপুষ্পহীন এবং তখনো বসন্তের নাগালের বাইরে পড়ে ধুকপুক করছে, দিনের শেষ সূর্য সব কিছু শিকারির মতো অসহায় তাকিয়ে আছে মনে হলো ঋজবাবুর। এ সময় তিনি জানালা দিয়ে তাকাতেই দেখলেন বুড়ো কমলাগাছের ওপর একটি শঙ্খচিল বেশ করে তাকাচ্ছে আর স্কুল কমিটির সভাপতি বেশ রেগেমেগে জুতোর শব্দ তুলে বেরিয়ে যাচ্ছেন, যেন বনপ্রহরীর গাদা বন্দুক থেকে গুলি বেরিয়ে যাচ্ছে শিকারির আনন্দে। স্বভাববশত দরজার পাল্লা প্রায় বন্ধ হয়ে গেল। ঠিক এমন সময় সেই আধখোলা দরজা ঠেলে ঢুকে পড়লেন জীবন্ত শহীদ বরকত।

বরকত বললেন, ‘ঠিক যে মুহূর্তে আমি গুলি খেয়ে পড়ে গেলাম, মেডিক্যালের পাকা রাস্তার শয্যায়, আমার গায়ের পাতলুনে ছড়িয়ে পড়েছে রক্তের বড় বড় ফুলের নকশা আঁকা চিত্রশিল্প। কিন্তু কবরে একটিও মোমবাতির পবিত্র শিখার আলো পড়েনি, তার আলো নিশ্চয়ই পড়বে আদেশকারীর কবরে। তবে তার তো শিগগির মৃত্যু বা নিহত হওয়ার কোনো আতঙ্ক নেই। ’

ঋজুবাবু এদিক-ওদিক হাতড়ে বলে উঠলেন, ‘শহীদ বরকত ভাই, তুমি কি দেশের সকলকে মাতৃভাষায় উচ্চশিক্ষা দিতে পারবে মনে করো!’

‘তাই তো করি এখন। ’

‘গারো, হাজং, মণিপুরী, ম্রো... সকলের, সকলকে?’

‘সকলের জন্য চাওয়ার মধ্যে বিশ্ববিধানের শক্তি আছে। ’

‘তুমি কি মৃত্যুর পরও ঘুমিয়ে থাকার স্বপ্ন দেখেছিলে কখনো? নয়তো এ কথা বলছ কী করে!’

‘আমি জীবিত থাকাকালে কখনো এ রকম স্বপ্ন দেখিনি, তা এখনো সত্য। ’

‘দেখোনি বলেই স্বপ্ন নেই এ কথা ঠিক নয়। ’

‘ঠিক নয় বলে উড়িয়ে দিলেও তা প্রমাণ করা কঠিন নয়’—বরকত বললেন।

‘তাহলে এখন তোমার কী করার আছে?’ ঋজুবাবুর প্রশ্ন।

‘আমি সকলকে নিয়ে তোমাদের কাছে যেতে চেয়েছি বাংলাদেশের নানা অঞ্চলের ভাষার কথায় ভেসে ভেসে। ’

‘যেতে চাওয়া আর যাওয়া এক কথা নয়। ’

‘চাওয়াটা যেতে পারার চেয়ে অনেক বড়। আমরা রাষ্ট্রভাষা চেয়েছি বলে তোমরা মাতৃভাষায় কথা বলতে পারছ। সারা বিশ্ব তা মাথা পেতে নিয়েছে এখন। একুশে ফেব্রুয়ারি হয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ’

‘এ জন্যই তোমরা প্রতিবছর ফিরে ফিরে আসো। ’

‘আসি এটাই সত্য, এর বেশি আমরা জানি না। আমাদের যাওয়া-আসায় কোনো লাগাম নেই। আমাদের পায়ের তলায় আছে এক রকম স্রোত। রাষ্ট্রভাষা উর্দু কেন হবে, সেটা বুঝতে পারিনি। এর মধ্যে কি কোনো দোষ ছিল? পাপ ছিল? বাঙালিরা তো বাংলাকেই রাষ্ট্রভাষা চাইবে। না-চাওয়াটাই হতো অপরাধ ও অন্যায্য। ’

ঋজুবাবু বললেন, ‘আমি তো রাষ্ট্রভাষা নয়, মাতৃভাষার কথা বলছি। স্কুলজীবনে অর্থাৎ সেই ছাত্র বয়সে এটা এভাবে বুঝতে পারিনি। ’

‘বেঁচে থাকাটা আমার কাছে ছিল আনন্দের। শহীদ হয়েও আছি আনন্দে, এখানেও এসেছি সেই আনন্দের স্রোতে—এর বেশি আমি আর জানি না। ’ বলেই বরকত দরজা খুলে হাঁটতে শুরু করলেন। ঋজুবাবুও পিছু নিলেন। পৌঁছে গেলেন রাস্তা পেরিয়ে পাহাড়ের খাদের কিনারায়। সেখানে পাহাড় নেমে গেছে গভীর নিচে, তারপর আবার আরেকটি পাহাড়ের চড়াই শুরু। সেখানে কুশায়া জমেছে, তার নিচে অসচরাচর ঘন অরণ্য। ঋজুবাবু বিস্মিত, এ রকম কোনো কিছু তিনি জানেন না, আর জানলেও কোনো দিন যাওয়া হয়নি, আর এ পরিস্থিতিতে তিনি কী করবেন তাও ভেবে পেলেন না। এ রকম অবস্থায় তিনি সব কিছু যাচাই ও বিবেচনা করে চলতে শুরু করলেন কুয়াশায় ঢাকা নীরব বনভূমির দিকে। পেছনে কোথায় যেন বাদ্যযন্ত্রে বাজছে—মুই হি পুরি ফেলে পারং?


মন্তব্য