kalerkantho

রাজু পুলিশ নিউ ইয়র্কার

নিউ ইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্টের (এনওয়াইপিডি) কাউন্টার টেরর অফিসার হিসেবে সুনাম কুড়িয়েছেন ড. রাজুব ভৌমিক রাজু। নোয়াখালীর এই তরুণকে নিয়ে এখন সরব আমেরিকার গণমাধ্যম। রাজুর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছিলেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

১৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



রাজু পুলিশ নিউ ইয়র্কার

২০১৪ সাল 

১৭ ডিসেম্বর নিউ ইয়র্কের ব্রঙ্কসে একটি ভবন থেকে পথচারীর ওপর গুলি ছুড়েছিল এক বন্দুকধারী। এতে একজন নির্মাণ শ্রমিক ও একজন নারী গুলিবিদ্ধ হন। খবর পেয়ে সেখানে অভিযান চালায় পুলিশ। গুলিবিদ্ধ ব্যক্তিকে উদ্ধারের সময় এক পুলিশ অফিসারের ঘাড়ে একটি গুলি লাগে। মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। তবে শেষ পর্যন্ত গুলিবিদ্ধ তিনজনই প্রাণে বেঁচে যান। আর পুলিশও বন্দুকধারীকে গ্রেপ্তার করতে পেরেছিল।

২০১৫ সাল

ম্যানহাটানের একটি সাবওয়ে স্টেশন। আত্মহত্যার জন্য সাবওয়ে ট্র্যাকে (রেললাইন) ঝাঁপ দেয় এক তরুণ। যাত্রীদের মধ্যে একজন তা দেখে ডিউটিরত দুজন পুলিশ অফিসারকে জানায়। অফিসার দুজন দুই লাইনের দুই দিকে দৌড়ে যান। তাঁদের মধ্যে একজন লোকটিকে পড়ে থাকতে দেখেন। ততক্ষণে ট্রেন কাছাকাছি চলে এসেছে। পুলিশ অফিসার লাফ দিয়ে পড়ে ট্র্যাক থেকে তরুণটিকে ওপরে তুলে আনতে সক্ষম হন।

২০১৬ সাল

১৯ সেপ্টেম্বর। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত ১টা ২০ মিনিট। একে তো রাত, তার ওপর শীতের হাওয়া বইছে ব্যাটারি পার্ক এলাকার হাডসন নদীর পারে। হঠাৎ মধ্য বয়সী এক ব্যক্তি আত্মহত্যা করতে নদীতে ঝাঁপ দিলেন। পুলিশের দুজন অফিসার তখন ওই এলাকায় ডিউটি করছেন। কেউ একজন লোকটির নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়া দেখে কাছের ডিউটিরত পুলিশকে অবহিত করলেন। দুজন পুলিশ অফিসারের মধ্যে একজন ইউনিফর্ম খুলে দ্রুত পানিতে ঝাঁপ দিলেন লোকটিকে বাঁচাতে; কিন্তু লোকটি পুলিশ অফিসারকে পর্যন্ত টেনে পানির নিচে নিয়ে যায়।

যাহোক, শেষ পর্যন্ত চৌকস পুলিশ অফিসারের কারণে ৫৪ বছর বয়সী লোকটিকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল।

২০১৭ সাল

২৩ আগস্ট নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটানের ইস্ট হার্লেম এলাকায় রাতের অন্ধকারে এদিক-ওদিক ছুটছেন এক নারী। চিৎকার করে সাহায্য চাইছেন। কাছেই ছোট একটা শিশু ফুটপাতে পড়ে আছে। শিশুটি কাতরাচ্ছে। জানা গেল, ললিপপ খেতে গিয়ে শিশুটির গলায় সেটি আটকে গেছে। দুই বছরের ছেলেটি শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারছে না। ওই এলাকায় ডিউটি করছিলেন দুজন কাউন্টার টেরর অফিসার। তাঁরা চিৎকার শুনে ছুটে এলেন। অফিসারদের মধ্যে একজন সাহস করে শিশুটির গলা থেকে ললিপপটি বের করে আনার চেষ্টা করলেন। অবশেষে পেরেওছিলেন।

—এই চারটি ঘটনার নায়ক একজন। বাংলাদেশি আমেরিকান তিনি। নিউ ইয়র্ক পুলিশ বিভাগের (এনওয়াইপিডি) কাউন্টার টেরর অফিসার রাজু ভৌমিক। চারটি ঘটনাই যুক্তরাষ্ট্রের সব প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় ফলাও করে প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়।

৩০ বছরের তরুণ

রাজুর জন্ম নোয়াখালীর কবিরহাটের শ্রীনদ্দী গ্রামে ১৯৮৮ সালে। বাবা মিসর ভৌমিক, মা পুতুল ভৌমিক। দুই বোন-এক ভাই। রাজু বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ছিলেন। ওটারহাট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০০২ সালে এসএসসি এবং সরকারি মুজিব কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন ২০০৫ সালে। সে বছরই সপরিবারে মার্কিনমুলুকে পাড়ি জমান।

অচেনা জায়গা জঙ্গলের সমান

ছোটবেলায় দিদিমার কাছে রাজা-বাদশার কাহিনি শুনতেন। গল্পচ্ছলে দিদিমা বলতেন, ‘অচেনা জায়গা জঙ্গলের সমান’।  ছোট্ট রাজু তখন হয়তো বুঝে ওঠেননি এর মানে। কিন্তু আমেরিকায় যাওয়ার পরই টের পেলেন দিদিমার সেই কথার আসল মানে। আমেরিকায় শুরুর দিনগুলো সহজ ছিল না। প্রথম দিকে চাকরিবাকরি তো দূরের কথা, কাজও পাচ্ছিলেন না। ইংরেজিটাও ভালো মতো জানতেন না। ঠেকে শিখেছেন। যাহোক একসময় ম্যাকডোনাল্ডসে চাকরি মেলে। কিচেনে ধোয়ামোছা থেকে শুরু করে সব কাজই করতে হয়েছে; কিন্তু রাজুর পড়াশোনার আগ্রহ ছিল। কাজের পাশাপাশি কম্পিউটার সায়েন্স পড়তে থাকেন।

 

পুলিশ অফিসার হতে চেয়েছিলেন

পুলিশ অফিসার হয়ে অপরাধী পাকড়াও করবেন—ছেলেবেলা থেকেই এমন স্বপ্ন দেখতেন রাজু। আমেরিকা গিয়ে জানলেন এখানে পুলিশ হতে হলে নির্দিষ্ট বিষয়ে পড়াশোনা করতে হবে। তাই কম্পিউটার সায়েন্স পড়া বাদ দিলেন। ভর্তি হলেন আমেরিকান পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে। সেখান থেকে ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড ক্রিমিনাল ইন্টেলিজেন্সের ওপর স্নাতক হলেন। স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিলেন ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যান্ড হোমল্যান্ড সিকিউরিটির ওপর। এরপর নিউ ইয়র্ক সিটি পুলিশ ডিপার্টমেন্টে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা দিলেন। সে পরীক্ষাও সাফল্যের সঙ্গে উতরে গেলেন। অবশেষে স্বপ্ন এসে ধরা দিল হাতের মুঠোয়। সেটা ২০১২ সাল। নিউ ইয়র্ক সিটি পুলিশ ডিপার্টমেন্টে পুলিশ অফিসার পদে যোগদান করলেন রাজু।

আমেরিকায় পুলিশের চাকরি পাওয়া কঠিন বটে; কাজটা ঝুঁকিপূর্ণও। কারণ এখানে প্রতিবছর প্রায় ৩০০ পুলিশ অফিসার নিহত হন। রাজু বলছিলেন, নিউ ইয়র্ক সিটিতে প্রায় সব দেশের মানুষ বাস করে। সে সঙ্গে পৃথিবীর সব রকমের ক্রিমিনালও। গ্যাং, মাফিয়া আর ড্রাগ ডিলাররা এখান থেকেই সারা বিশ্বের অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করে। তাই ট্যাক্টিকেল (কৌশলী) হওয়া যেমন দরকার, দরকার শক্তিও।  

 

এখন কাউন্টার টেরর অফিসার

নিউ ইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্টের (এনওয়াইপিডি) কাউন্টার টেরর অফিসার হিসেবে প্রায় চার বছর ধরে কাজ করছেন রাজু। বললেন, ‘নিউ ইয়র্ক সিটি হচ্ছে পৃথিবীর মোস্ট ডিজায়ারেবল টেররিস্ট অ্যাটাক স্পট। সব সময় এ সিটিতে টেররিস্ট থ্রেট থাকে। আমার প্রধান কাজ সম্ভাব্য সন্ত্রাসী আক্রমণ চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী পুলিশি অ্যাকশন নেওয়া। উপরন্তু নিউ ইয়র্ক সিটিতে সব ধরনের নিউক্লিয়ার কেমিক্যাল, বায়োলজিক্যাল এবং রেডিওলজিক্যাল আক্রমণেও রেসপন্স করতে হয়।’ তবে বিপদে-আপদে মানুষের সেবা করতে পারলে ভালো লাগে রাজুর। বললেন, ‘আমি মানুষের সেবা করতে পছন্দ করি। প্রায় সাত বছর ধরে এনওয়াইপিডিতে আছি। আশা করি ভবিষ্যতে আরো অনেক মানুষের সেবা করতে পারব।’

 

অধ্যাপনাও করেন

রাজুর অভিধানে ‘অবসর’ শব্দটা নেই বললেই চলে। পুলিশে চাকরির পাশাপাশি দুটি কলেজে অধ্যাপনাও করেন তিনি। রাত ৯টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত এনওয়াইপিডিতে দায়িত্ব পালন করতে হয়। এরপর বাসায় ফিরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে যান সিটি ইউনিভার্সিটির জন জে কলেজ অব দ্য ক্রিমিনাল জাস্টিসে। সেখানে সকাল ১০টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত আইন ও অপরাধ বিজ্ঞান বিষয়ে পড়ান। সপ্তাহে তিন দিন। বাকি দুই দিন যান হসটজ কমিউনিটি কলেজ অব দ্য সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউ ইয়র্কে। সেখানে তিনি মনোবিজ্ঞান বিষয়ে ক্লাস নেন।

তাঁর লেখা বই পড়ানো হয়

এখন পর্যন্ত রাজুর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা এগারো। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন প্রকাশনী থেকে বইগুলো বেরিয়েছে। গল্প-উপন্যাস ছাড়াও কয়েক শ সনেটও লিখেছেন। জন জে-তে রাজুর লেখা তিনটি বই পড়ানো হয়। বইগুলো হলো ‘লিডিং থিওরিজ অব ডেলিনকুয়েন্ট বিহেভিয়ার অ্যান্ড ক্রিমিনোলজি’ (অস্টিন অ্যান্ড ম্যাকলি পাবলিশার্স), ‘অ্যাক্টিভ শ্যুটার : মোটিভ, মেথড, অ্যান্ড ম্যাডনেস (স্কলার্স প্রেস) এবং প্রিভেন্টিভ ডিপ্রেশন অ্যাট ওয়ার্কপ্লেস সাইকোলজিক্যাল ইন্টারভেনশন (স্কলার্স প্রেস)।

 

এখনো পড়াশোনা করছেন

রাজু স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউ ইয়র্ক থেকে ইনস্ট্রাকশন অ্যান্ড এডুকেশন বিষয়ে মাস্টার্স করছেন এখন। সাংবাদিকতায় মাস্টার্স করতে সম্প্রতি ভর্তি হয়েছেন হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে। সাইকোলজি ইন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি ও সাইকোলজি ইন ফরেনসিক সাইকোলজি বিষয়ে পিএইচডি করেছেন যথাক্রমে ক্যালিফোর্নিয়ার সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি এবং মিনেসোটার ওয়াল্ডেন ইউনিভার্সিটি থেকে। আরো দুটি বিষয়ে ডক্টরেট করছেন তিনি। আমেরিকান কলেজ অব এডুকেশন থেকে এডুকেশন ইন লিডারশিপ বিষয়ে এবং বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে পিএইচডি করছেন ক্যালিফোর্নিয়ার সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি থেকে।

 

বিবেকানন্দকে আদর্শ মানেন

‘স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, ‘এভরিথিং ইজ ইজি হোয়েন ইউ আর বিজি, বাট নাথিং ইজ ইজি হোয়েন ইউ আর লেইজি।’ আমি এ কথায় খুব বিশ্বাস করি। যখন নিজেকে ব্যস্ত রাখি, তখন সব কাজকে সোজা মনে হয় এবং অনেক কিছু করা যায়। অপচয় না করে যদি সময়ের সদ্ব্যবহার করা যায়, তাহলে অনেক কিছু করা সম্ভব। সোম থেকে শুক্রবার গড়ে চার ঘণ্টা ঘুমাই। ছুটির দিনে ১০ ঘণ্টার মতো ঘুমিয়ে বাদবাকি ঘুমের ঘাটতি পুষিয়ে নিই। তা ছাড়া আমার স্ত্রী প্রিয়াংকা ঘোষ অনেক সহায়তা করে। সে সংসারের প্রায় সব কিছু সামলে রাখে।’

দুই বছরের কন্যা আরিয়া, স্ত্রী, মা আর শাশুড়িকে নিয়ে সুখেই দিন কাটছে রাজুর। ডলি আর পলি নামে দুই বোনকে বিয়ে দিয়েছেন আমেরিকায়। বললেন, পরিবারের সবাই অনেক সাপোর্টিভ। এদিক থেকে আমি অনেক ভাগ্যবান।

 

আমার দেশের মাটি

আমেরিকায় থাকলেও বাংলাদেশকে ভুলে যাননি। বললেন, ‘বাংলাদেশে অনেক বন্ধু ও আত্মীয় আছে। ছোটবেলার বন্ধুদের সব সময় মিস করি। বাংলাদেশ আগের থেকে অনেক উন্নত হয়েছে; কিন্তু পড়াশোনার মান এখনো বিশ্বমানের হতে পারেনি। আমাকে আমার বাংলাদেশের বন্ধুরা মাঝে মাঝে বলে, ‘তুই কিভাবে দুইটা মাস্টার্স ও দুইটা ডক্টরেট শেষ করবি?’ আমি বলি, এখানে কোনো সেশনজট হয় না, সকাল থেকে রাত ২টা পর্যন্ত ভার্সিটিতে প্রতিনিয়ত ক্লাস চলে। হাইব্রিড ক্লাস (আধা অনলাইন, আধা ক্লাসে) ও অনলাইন লাইভ ক্লাস চলে। যে যার সুবিধামতো পড়াশোনা করছে। এ সুযোগ বাংলাদেশে থাকলে শিক্ষার্থীরা অনেক উপকৃত হতো।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতে চাই

যদিও আমেরিকায় পুলিশ অফিসার হিসেবে কাজ করছি; কিন্তু আমি মনেপ্রাণে বাঙালি। বাংলাদেশের পুলিশ বিভাগে কাজ করতে পারলে ভালো লাগত। হয়তো ভবিষ্যতে কোনো একসময় সে সুযোগ আসবে। পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতে চাই।

মন্তব্য