kalerkantho

দেখা থেকে লেখা

আমি একটি বই লিখেছি

শিল্পী মুর্তজা বশীরের সঙ্গে মিরাজুল ইসলামের সখ্যের বয়স প্রায় দুই যুগ। অনেক স্মৃতি জমেছে এত বছরে। সেগুলোই বই হয়ে এলো এই মেলায়। বইটির নাম নার্সিসাসে প্রজাপতি। বইটি লেখার গল্প পিন্টু রঞ্জন অর্ককে শুনিয়েছেন মিরাজুল ইসলাম

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



আমি একটি বই লিখেছি

মিরাজুল ইসলাম ও শিল্পী মুর্তজা বশীর

আঁকাআঁকির অভ্যাস ছিল। একবার তেলরঙে আঁকতে গিয়ে দেখি ঠিকমতো রং বসছে না ক্যানভাসে। বুঝলাম গুরু লাগবে। তখন চট্টগ্রামে থাকতাম। দৈনিক পূর্বকোণে লেখালেখিও করতাম। পূর্বকোণের আনোয়ার হোসেন পিন্টু ভাইকে বললাম, ‘ভাই, আশপাশে ভালো আর্টিস্ট কে আছে?’

—রাস্তার ওপারেই তো বশীর স্যারের বাসা। উনার কাছে যেতে পারো।

একদিন পিন্টু ভাই-ই সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে বললেন, ‘স্যার, আমার বন্ধু, পেশায় ডাক্তার, তবে লেখালেখিও করে।’

 

উনসত্তরের রূপকথা

২০০০ সালে স্যারকে নিয়ে উনসত্তরের রূপকথা নাম দিয়ে একটা লেখা লিখলাম। পড়ে স্যার বললেন, ‘মিরাজ, তুমি তো আমাকে অনেক ধরে ফেলতে পারছো।’ দিনে দিনে স্যারের সঙ্গে সম্পর্কটা একেবারে সহজ হয়ে এলো। স্যারের সঙ্গে দেখা হলেই নানা কিছু জানতে চাইতাম। যেমন ‘স্যার, এই কাজটা কিভাবে করলেন, রং কিভাবে মেশালেন, স্যার থিনার কিভাবে দিতে হয়? রং এখানে গাঢ় হলো কেন? মৌলিক রং আর যৌগিক রঙের তফাতটা কী?’

স্যার কিন্তু বিরক্ত হতেন না; বরং আগ্রহ নিয়েই সব দেখিয়েছেন। স্যারকে অনেক সময় কথায়ও পেয়ে বসত। যেমন—বলতেন, একেকটা রং হচ্ছে কবিতার একেকটা স্বর্গ। আমার একটা ক্যানভাস একটা কবিতা। একই কবিতা একেকজনের কাছে একেক রকমে ধরা দেয়। তোমাকে উইং (পাখা) সিরিজের গল্পটা বলি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে জীববিজ্ঞান বিভাগে একটি প্রজাপতি গ্যালারি আছে। সেখানে প্রজাপতির পাখাগুলোকে ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে বড় করে দেখেছি। একটা পাখাকে কয়েক গুণ বড় করে তার রংগুলো বোঝার চেষ্টা করেছি। তখন রংগুলো আমার কাছে বিশেষ হয়ে উঠেছে, হয়ে উঠেছে কবিতা।

 

মন না চাইলে আঁকেন না

বশীর স্যার বারবার নিজেকে ভেঙেছেন আবার গড়েছেন। তাঁর দেয়াল সিরিজের সঙ্গে পাখা সিরিজের কোনো মিল নেই। তাঁর একেকটি ফিগার একেক রকম। উনি আঁকেনও সময় নিয়ে। এখন যেমন কোনো ছবি আঁকছেন না। স্যারকে একবার জিজ্ঞেস করলাম, আপনার ছবি তো লাখ টাকায় কেনে মানুষ। এখন আঁকছেন না কেন?

উনি উত্তর দিয়েছেন, ‘ইচ্ছা করছে না। জিনিসটা তো মন থেকে আসতে হবে। অবশ্য আমি ছবি এঁকেই জীবনযাপন করি; কিন্তু ইচ্ছা না করলে আঁকতে পারি না।’ স্যার নিজেকে খুব ভালোবাসেন। আমাদের শিল্পীদের মধ্যে উনার মতো সেলফ পোর্ট্রেট আর কেউ করেননি। শতাধিক সেলফ পোর্ট্রেট আছে তাঁর। এই পোর্ট্রেটগুলো কাউকে গিফটও করেন না। তাঁর ব্যাপারে কেউ বেমক্কা মন্তব্য করলে যতক্ষণ না খণ্ডাতে পারছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত অস্বস্তিতে থাকেন। আরেকটা ব্যাপার ‘ফাঁকিবাজি’ শব্দটা বশীর স্যারের অভিধানে নেই।

 

নতুনরা আমার সম্পর্কে কী ভাবছে

বশীর স্যার সব সময় জানতে চান—এই প্রজন্মের শিল্পীরা তাঁর সম্পর্কে কী বলে? ওরা তাঁর কাজ পছন্দ করে কি না?

বলি, স্যার সত্যি বলতে কি এখন তো ছবি অনেক চেঞ্জ হয়ে গেছে। তবে ইন্সপিরেশন খুঁজতে ওরা আপনার কাছে যায়। শিল্পীসত্তা কেমন হওয়া উচিত, শিল্পীদের কিভাবে থাকা উচিত—এসবের জন্য ওরা আপনাকে গুরু মানে।

 

এসো একসঙ্গে খাই

একসময় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় চলে এলেন বশীর স্যার। আমি তিন-চার মাস পর পর চলে আসতাম। মনিপুরীপাড়ার বাসায় আড্ডা দিতাম। অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া উনি কাউকে দেখা দিতেন না। আগে অ্যাপয়েনমেন্ট, পরে দেখা। সেটা আমি হই বা অন্য যে কেউ হোক—এটাই নিয়ম। যদি ১০ মিনিটও দেরি করি বকা দিতেন।

একসময় পাবলো পিকাসোকে খুব ফলো করতেন। চাইতেন পিকাসোর মতো হবেন। পরে পিকাসো ঘরানা থেকে নিজের ঘরানায় চলে এলেন। উনি সকালে ও রাতে ছবি আঁকেন। ছবি আঁকার সময় কাউকে থাকতে দেন না। দূর থেকে দেখতাম আঁকছেন, কিন্তু ঘরে ঢুকতেই ক্যানভাসটা আস্তে করে উল্টে দিতেন। গ্লাভস পরতেন না। খালি হাতে আঁকতেন। সে জন্য একবার বুড়ো আঙুলে পচনও ধরেছিল। ২০১২ সালে খুব অসুস্থ হয়ে পড়লেন তিনি। তখন ডাক্তার ওনাকে তেলরঙে কাজ করতে নিষেধ করলেন। কারণ তেলরঙের গন্ধটা ফুসফুসের জন্য ক্ষতিকর।

বাইরে থেকে যতটা বোহেমিয়ান মনে হয়, উনি ভেতরে ততটা বোহেমিয়ান না। সব সময় চিন্তা করতেন, মাসটা কিভাবে যাবে, সঞ্চয় আছে কি না, আমার পরিবার ঠিকমতো চলবে কি না। বলতেন, শিল্পী পরিচয়ের কারণে আমার বাচ্চারা, আমার স্ত্রী কখনো যাতে কষ্ট না করে। ওনার সব কিছুই গোছানো। কতটুকু ভাত খাবেন, কখন নাশতা করবেন, কয়টায় গোসল করবেন—প্রত্যেকটা জিনিস রুটিন করা। খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে দিলখোলা। একবার পহেলা বৈশাখে উনার বাসায় গেলাম। ইলিশ আকৃতির একটা সন্দেশের অর্ডার দিলেন। উনার বাসায় কয়েক পদের তরকারি হয়। মুরগি, মাছ ও সবজি থাকেই। যতবারই গিয়েছি, বলেছেন, ‘খেয়ে এসেছো কি না? না হলে এসো একসঙ্গে খাই।’ খাবার টেবিলে বসে রাজ্যের গল্প জুড়ে দিতেন।

 

ধরতে চেয়েছি শিল্পের পেছনের শিল্পীকে

২০১৫ সালে উনার লেখা ‘সহস্র বছরে নদী’ কবিতার সুরারোপ করলাম। পরে সেই গানের একটা মিউজিক ভিডিও করলাম। তখনই মাথায় এলো উনাকে নিয়ে বড় পরিসরে কিছু একটা করব। স্যারকে নিয়ে ডকুমেন্টারি বানাচ্ছি দুই বছর ধরে। গেল বছরের কথা। বললাম, স্যার, আপনাকে নিয়ে একটা বই লিখব। তবে আপনি হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না। এটা ভেবে লিখব যে, মুর্তজা বশীর দুনিয়ায় নেই। তাহলে আমার জন্য লেখাটা চাপ হয়ে আসবে না। এবং লিখব আপনার পারসোনাল লাইফ নিয়ে।

—হাসনাত আবদুল হাই তো লিখতে চেয়েছিল, আমি অনুমতি দিইনি। তুমি তো জানো, আমার দুই মেয়ে যুই, যুথী। ওরা কী মনে করবে?

—‘তাদের কারো কোনো আপত্তি নাই’ বলার পর অনুমতি মিলল।

ছবি আঁকার পেছনের মানুষটা কেমন জীবনযাপন করেন সেটাই ছিল আমার লেখার বিষয়। উনার জীবনে যে কয়জন নারী এসেছেন, তাঁরা প্রত্যেকে তাঁর কাজকে প্রভাবিত করেছেন। যেমন তিনি আখিলাকে ভালোবেসেছেন, কারণ তার আগে ইতালির মারিয়ার কাছ থেকে কষ্ট পেয়েছিলেন। আবার আকিলার কাছে কষ্ট পেয়ে উনি তুলু ভাবির কাছে এলেন। প্রত্যেকবার উনার কাজের পরিবর্তন ঘটেছে। বিয়ে করার পর উনার কাজের রং বদলে গেল। সোনালি, লালের মতো উজ্জ্বল রং এলো। এর আগে রংগুলো সব ধূসর ছিল। এই যে পরিবর্তন, এগুলো আমি বোঝার চেষ্টা করেছি; ধরতে চেয়েছি শিল্পের পেছনের শিল্পীকে।

মন্তব্য