kalerkantho


নেত্রকোনা-কিশোরগঞ্জ

মহম্মদ ফুলে হোসেন

আটচল্লিশের ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি কিশোর। ছিলেন নেত্রকোনায়। বায়ান্নয় তিনি তরুণ। তখন কিশোরগঞ্জে আন্দোলন সংগঠক। ফুলে হোসেন একজন মুক্তিযোদ্ধাও। উত্তাল সেই দিনগুলোর কথা শুনেছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



মহম্মদ ফুলে হোসেন

১৯৪৮ সাল। আমি তখন নেত্রকোনার দত্ত হাই স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র। সারা ভারত কৃষক সম্মেলনে ভলান্টিয়ার ছিলাম। কমিউনিস্ট নেতা কমরেড শশীন চক্রবর্তীর সান্নিধ্যও পেয়েছি। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ পূর্ববঙ্গে ভাষার দাবিতে সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়। আমি ওই দিন মিছিলে আসার জন্য ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্বুদ্ধ করি।

তখন নেত্রকোনা মহকুমার প্রশাসক (এসডিও) ছিলেন গিয়াসউদ্দিন আহমেদ। আমরা মিছিল নিয়ে আঞ্জুমান হাই স্কুল থেকে ফৌজদারি কোর্টের সামনের রাস্তা দিয়ে দত্ত হাই স্কুলের দিকে যাচ্ছিলাম। দেখলাম এসডিও সাহেব কোর্টের দিকে যাচ্ছেন। আমরা সেদিকে এগিয়ে গেলাম। সামনে নিখিল দাশসহ (ছাত্র ফেডারেশনের নেতা) আরো কয়েকজন এসডিও সাহেবকে কোর্টে না যাওয়ার অনুরোধ করলেন; কিন্তু কাজ হলো না। পরে নিখিলদার ইঙ্গিতে আমরা কয়েকজন রাস্তায় শুয়ে পড়লাম। এসডিও সাহেব একজনকে ডিঙিয়ে গেলেন। কিন্তু দ্বিতীয়জনকে ডিঙাতে না পেরে পেছনে হটে তাঁর বাংলোয় চলে যান। সেদিন তিনি আর এজলাসে বসেননি। যা-ই হোক, এই আন্দোলন তখন শুধু ছাত্রদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ১৯৪৯ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত নেত্রকোনায় দু-একটা মিছিল-মিটিং ছাড়া আর বেশি কিছু হয়নি।

 

ঢাকার ঘটনা জেনেছিলাম পরদিন

বায়ান্নয় এসে আবার কর্মসূচি দেওয়া হলো। আমরা সেসবের খবর পেতাম লোক বা পত্রিকা মারফত। আমি আবার তখন কিশোরগঞ্জে গুরুদয়াল কলেজে আইএসসির ছাত্র। ২০ ফেব্রুয়ারি কিশোরগঞ্জে কোনো মিছিল-মিটিং হয়নি। ২১শে ফেব্রুয়ারি অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো আমাদের কলেজেও সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়। ছাত্র-ছাত্রীরা ক্লাস থেকে বেরিয়ে মিছিল করে। শহরে দোকানপাট বন্ধ ছিল। বাজারও বসেনি। তবে ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্রদের মিছিলে গুলির ঘটনা নিয়ে রীতিমতো অন্ধকারে ছিলাম। তখন পত্রপত্রিকাও ঠিকমতো পাওয়া যেত না। দিনের পত্রিকা কিশোরগঞ্জ পৌঁছতে পৌঁছতে রাত ১০টা-১১টা বেজে যেত। ফলে ২১শে ফেব্রুয়ারির ঘটনার বিবরণ ২২ তারিখ সকালে জানতে পারি আমরা।

 

মাইক পাচ্ছিলাম না

শহীদি মসজিদের সঙ্গেই ছিল ইসলামিয়া বোর্ডিং। সেখানে ছাত্ররা থাকত। আস্তে আস্তে বোর্ডিংয়ের সামনে লোকজন আসতে থাকে। একসময় সেটা সভার আকার ধারণ করে। তখন জানা যায়, ২১শে ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় গুলি হয়েছে, ছাত্র মারা গেছে। সভায় সাধারণ মানুষও যোগ দিল। সেখানে আরো কয়েকজনের সঙ্গে আমিও বক্তৃতা দিলাম। সেখান থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়—পরদিন (২৩ ফেব্রুয়ারি) শোকদিবস পালন করা হবে। জেলখানার সামনে খেলার মাঠে মিটিং হবে। মিটিংয়ের জন্য মাইকের ব্যবস্থা করার ভার পড়ে আমার ও দুজন সহকর্মীর ওপর। কিন্তু কিছুক্ষণ পর জানতে পারি, খেলার মাঠে যে মিটিং হবে, সেটা প্রচারের জন্য মাইক পাওয়া যাবে না। কারণ এসডিও সাহেব ছাত্রদের মাইক ভাড়া দিতে নিষেধ করেছেন। মাইকের দোকানে গিয়ে দেখি তালা ঝুলছে।

ভীষণ অসুবিধার মধ্যে পড়ে গেলাম।  একজন বললেন, ‘মাখন মিয়াকে গিয়ে ধরো।’ মাখন মিয়ার পুরো নাম মাসুদুল আমিন খান। কলেজের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের ভাইস প্রেসিডেন্ট, কলেজ ছাত্র সংসদেরও ভাইস প্রেসিডেন্ট তিনি। তাঁর বাবা ছিলেন কিশোরগঞ্জের তখনকার সরকারি পিপি। সব শুনে মাখন ভাই কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। পরে বললেন, ‘এক কাজ কর, কাল সকালে পাঁচ-ছয়টা ছেলে নিয়ে আমার বাসায় আসবি।’

 

মাইকটা আপনার ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়

২৩ ফেব্রুয়ারি সকালে কয়েকজনকে নিয়ে মাখন ভাইয়ের বাসায় গেলাম। তিনি আমাদের শহীদি মসজিদে নিয়ে গেলেন। মসজিদের ইমাম মাওলানা আতাহার আলীকে (নেজামে ইসলামের সভাপতি) খবর দেওয়া হলো। তিনি নেমে এলেন।

মাখন ভাই বললেন, ‘হুজুর আপনার কাছে আসছি একটা আবদার নিয়ে।’

—বলেন।

—হুজুর, কালকে তো ঢাকায় গুলি হয়েছে। আমার ছাত্র ভাইয়েরা মারা গেছে। আমরা আজকে শোকদিবস পালন করব। কিন্তু কোথাও মাইক পাচ্ছি না।

—মাইক পাচ্ছেন না। আমি কী করতে পারি?

—হুজুর, মসজিদের মাইকটা আজকে আমাদের দিতে হবে।

—আরে কী বলেন মিয়া। এই মাইক কী করে দেব!

যা-ই হোক, অনেকক্ষণ ধরে দুজনে বাগিবতণ্ডা চলল। শেষে মাখন ভাই আমাদের নির্দেশ দিলেন, ‘ওই তোরা উঠ। মাইকের স্পিকার খুলে ফেল।’

আমরা জোর করেই মাইকসহ অন্যান্য যন্ত্রপাতি নিয়ে এলাম। সেই মাইক নিয়ে প্রচার করতে করতে ১২টার দিকে খেলার মাঠে উপস্থিত হলাম। লোকে মাঠ প্রায় ভরপুর। চেয়ার-টেবিল কিচ্ছু নাই। আমরা সবাই ঘাসের ওপর বসেছি। অনেকের সঙ্গে আমিও সেই জনসভায় বক্তৃতা দিই। সভায় সরকারের নির্মমতার নিন্দা জানিয়ে শোক প্রস্তাব গৃহীত হলো। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় কিশোরগঞ্জ মহকুমা রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। কলেজ ছাত্র সংসদের নেতারাই সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

 

মাইলের পর মাইল হেঁটেছি

২৩ ফেব্রুয়ারির সভা করেই আমরা থেমে থাকিনি। আমি তখন কিশোরগঞ্জ মহকুমা ছাত্রলীগের অফিস সেক্রেটারি। সংগ্রাম পরিষদের সদস্যরা প্রতিটি থানা সদরে সভা-সমাবেশ করার সিদ্ধান্ত নেন। আমার ওপর ভার পড়ল হোসেনপুর, কটিয়াদি, পাকুন্দিয়া, নিকলি ও করিমগঞ্জে আন্দোলন সংগঠনের। দুজন সহকর্মী নিয়ে প্রতিটি থানায় সমাবেশ করেছি। আমি সাইকেল চালাতে জানতাম না। হেঁটে মাইলের পর মাইল অতিক্রম করেছি। কোনো কোনো জায়গায় বাধ্য হয়েই সহকর্মীদের সাইকেলের রডের ওপর কিংবা পেছনে বসে যেতে হয়েছে। বিস্কুট ও চা খেয়ে সারা দিন পার করেছি। আমরা কিশোরগঞ্জের প্রতিটি থানায় ছাত্র-জনতার ব্যাপক সাড়া পেয়েছি। ফেব্রুয়ারির পর মার্চেও আন্দোলন চালিয়ে যাই। ১১ মার্চ কিশোরগঞ্জ শহরসহ মহকুমার সর্বত্র ভাষা দিবস পালিত হয়। আন্দোলনের কারণে ধড়পাকড় হতে পারে—এমন আশঙ্কায় কিছুদিন ময়মনসিংহে গিয়ে গাঢাকা দিয়ে থাকতে হয়েছিল আমাকে। 

একজন মহম্মদ ফুলে হোসেন

১৯৩৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের গৌরীপুর থানার চুরালি গ্রামে মাতুলালয়ে জন্ম। ম্যাট্রিক পর্যন্ত নেত্রকোনায় পড়েছেন। ইন্টারমিডিয়েট কিশোরগঞ্জে। ১৯৫৮ সালে কিশোরগঞ্জ গুরুদয়াল কলেজ থেকে বিএ পাস। ১৯৬০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এমএ পাস করেন। সে বছরই নীলফামারী কলেজে বাংলার অধ্যাপক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। নরসিংদীর রায়পুরা কলেজের প্রিন্সিপাল হিসেবে ১৯৮২ সালে অবসর গ্রহণ করেন। মাঝখানে ১৯৬৬ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ঢাকায় সোভিয়েত ইনফরমেশন ডিপার্টমেন্টের প্রেস সেকশনের চিফ এডিটর ছিলেন। ১৯৭০ সালে অধ্যক্ষ হিসেবে চুয়াডাঙা কলেজে যোগদান করেন। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে বাংলাদেশ সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুজিবনগরে বাংলাদেশ ভলান্টিয়ার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। একপর্যায়ে পশ্চিমবঙ্গে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিভিন্ন সভা-সমাবেশ আয়োজন করে জনমত গঠনে ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনটি বইও লিখেছেন ফুলে হোসেন। ১৯৬০ সালে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন। স্ত্রী বেগম মাহমুদা গৃহিণী। তিন সন্তানের জনক তিনি। বড় ছেলে লেনিন মাহমুদ একটি বেসরকারি কম্পানিতে চাকরি করেন। মেজো ছেলে তারেক মাহমুদ পেশায় চিকিৎসক। ছোট ছেলে কায়সার মাহমুদ আমেরিকায় থাকেন। স্বামী-স্ত্রী দুজনই এখন ঢাকায় মগবাজারে নিজেদের বাসায় থাকেন। তাঁর অবসর কাটে বই পড়ে।   ছবি : মোহাম্মদ আসাদ



মন্তব্য