kalerkantho

আপন সে জন

কত দিন দেখা হয়নি

চট্টগ্রামের আলাওল ডিগ্রি কলেজের সাবেক সহকারী অধ্যাপিকা আঞ্জুমান আরা। সাদাকালো একটি ছবি পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে আগলে রেখেছেন। ছবিটি তাঁর কলেজবেলার। এমন একজন আছেন এ ছবিতে, যিনি এখন অনেক বড়। আঞ্জুমান আরার ইচ্ছা, ছবিটি তাঁকে দেখান

৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কত দিন দেখা হয়নি

২০১৯। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আঞ্জুমান আরা

অর্ধশত বছর ধরে সযত্নে রাখা ছবিটি প্রায়ই বের করে দেখতাম। ছবিটি ইন্টারমিডিয়েট সরকারি বালিকা মহাবিদ্যালয়ের (এখনকার বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ) ১৯৬৬ সালের ছাত্রী পরিষদের। ছবির মধ্যমণি আমাদের সদ্য নির্বাচিত ভিপি, হাসিনা শেখ (তখন এভাবেই নামটি লেখা হতো) আপা। পাশে দণ্ডায়মান আমরা—যারা সেইবার তাঁর নেতৃত্বে কলেজ ছাত্রী পরিষদের নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলাম।

বহু দশক ধরে তাঁর সঙ্গে দেখা হয়নি; কিন্তু সাদাকালো ছবিটি যত্নে আগলে রেখেছিলাম। একদিন মনে হলো কোনোভাবে কি এই ছবির সূত্র ধরে তাঁর সঙ্গে দেখা করা যাবে? হাজারো প্রটোকল ভেঙে এ বড় কঠিন কাজ। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে এক দিন তাঁর কাছে ছবিটি পাঠালাম। তিনি ছবিটি দেখার সঙ্গে সঙ্গেই গণভবনে তাঁর সঙ্গে দেখা করার অনুমতি দিলেন।

নিরাপত্তাকর্মীরা অবগত ছিলেন বিধায় কয়েক স্তরের নিরাপত্তাবলয় পার হতে বেশি বেগ পেতে হলো না। গণভবনে নিচতলার সেই বিশাল রুমে গিয়ে সোফায় বসতেই চোখে পড়ল ফ্রেমে বাঁধানো বঙ্গবন্ধুর একটি ছবি। আমি কিছু বলার আগেই সঙ্গে আসা আমার নাতনি উত্ফুল্লচিত্তে বলে উঠল, ‘দেখো দাদি, জাতির জনক। তাঁর মেয়েই আমাদের প্রধানমন্ত্রী। দাদি, সত্যিই কি আজকে তাঁর সঙ্গে দেখা হবে?’ ক্লাস ফোরে পড়ুয়া নাতনির মধ্যে প্রধানমন্ত্রীকে দেখার ব্যাকুুলতা আমাকে মুহূর্তেই নিয়ে গেল ১৯৬৬ সালে। এমনই এক সকালে বদরুন্নেসা সরকারি মহাবিদ্যালয়ের বারান্দায় আমাদের কলেজের তরুণ নেতৃত্ব, সবার প্রিয়মুখ হাসিনা আপার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্য আমিও কী ভীষণ ব্যাকুল ছিলাম। তাঁর ফুফাতো বোন শেলী (আমার স্কুলজীবনের বান্ধবী) সেদিন আমাকে তাঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। সেদিনই কাছ থেকে দেখলাম আপার (শেখ হাসিনা) হাসিমাখা চেহারা। পরনে স্বাভাবিক পাড়ের সাদা শাড়ি, কাঁধে কাপড়ের ব্যাগ। লম্বা চুলের বেণিতে তাঁকে অসাধারণ লাগছিল।

গণভবনের এই ঘরে আরো কিছু সোফা পাতা আছে। সেখানে উপবিষ্ট কয়েকজন দর্শনার্থী নিজেদের মধ্যে মৃদু স্বরে কথা বলছেন। মাঝেমধ্যে সতর্ক দৃষ্টিতে হেঁটে যাচ্ছেন নিরাপত্তায় নিয়োজিত অফিসাররা। স্মৃতির পাতায় কত ঘটনা ভেসে উঠছে। মনে পড়ে যাচ্ছিল আমাদের সেই কলেজ ক্যান্টিনের কথা। প্রায়ই আমাদের নিয়ে কলেজ ক্যান্টিনে বসতেন আপা। তবে ক্লাস চলাকালে তিনি কখনোই আমাদের নিয়ে ক্যান্টিনে বা অন্য কোথাও আলোচনায় বসতেন না।

তাঁর তরুণ নেতৃত্ব যে কতটা বলিষ্ঠ ছিল তার সাক্ষী আমরা, যারা সেই ছাত্রী পরিষদ নির্বাচনে তাঁর অধীনে বিভিন্ন সদস্য ছিলাম। নির্বাচনের আগে এক দিন তিনি আমাকে ডেকে বললেন, ‘আনজু, তোমাকে নির্বাচনে অংশ নিতে হবে’—সম্মোহিতের মতো তাঁর আদেশে নির্বাচনের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। কলেজ নির্বাচন যেদিন হলো, সেদিনের একটি ঘটনা আজও মনে পড়ে। হাসিনা আপার আপন খালাতো বোন ফরিদা শেখ ও আমি ছিলাম একই ক্লাসের ছাত্রী। নির্বাচনের দিন বিকেলে ফরিদা শেখ ও আমি এবং আরো অনেক ছাত্রী মিলে কলেজের ফুলের বাগানের পাশে পত্রিকা বিছিয়ে হাসিনা আপার জন্য দোয়া করতে বসে গিয়েছিলাম। নির্বাচনের পরের দিন পত্রিকায় ফলাফল ছাপা হলো। কলেজ ভিপি পদে হাসিনা আপার জয়; জিএস পদে নাজমা চৌধুরী এবং অন্য সদস্যদের সঙ্গে সোশ্যাল মেম্বার পদে আমার নাম ছিল। সেই অল্প বয়সে হাসিনা আপার নির্বাচনে জয়লাভ আর সুদীর্ঘ অর্ধশতাব্দী পরে জাতিকে চতুর্থবারের মতো নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ লাভ—এ যেন একই সূত্রে গাঁথা। একটি ধারাবাহিকতা।

নাতনির প্রিয়ন্তীকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আঞ্জুমান আরা

জাতির জনকের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর সেই তরুণ বয়সেই (১৯৬৬-৬৭ সালের কথা) বুঝতে পেরেছিলেন যে ভাষা আন্দোলনের মধ্যেই স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের বীজ নিহিত। তাই তো তিনি ২১ ফেব্রুয়ারির দিনে আমাদের সবাইকে সারিবদ্ধ করে স্লোগান দিয়ে শহীদ মিনারে নিয়ে যেতেন এবং ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেন। একটি বিশেষ ঘটনার কথা মনে পড়ে। এক দিন কলেজ কমনরুমে তিনি আমাদের ডেকে নিয়ে বললেন সামনে ২১শে ফেব্রুয়ারি। ভাষা আন্দোলনের ওপর আমাদের কলেজ সংগঠনের পক্ষ থেকে একটি ম্যাগাজিন ছাপা হবে। তোমরা সবাই লেখা দেবে। তাঁর আদেশ অনুযায়ী আমরা কেউ গল্প, কেউ প্রবন্ধ, কেউবা কবিতা লিখে জমা দিলাম। মনে আছে আমার লেখা একটা প্রবন্ধ  ছাপা হয়েছিল।

হঠাৎ প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তায় নিয়োজিত অফিসারদের কর্মতৎপরতা বেড়ে উঠলে আমার এই দীর্ঘ ভাবনায় যেন ছেদ পড়ল। বুঝতে পারলাম প্রধানমন্ত্রী কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবেন। আমরা সবাই উঠে দাঁড়ালাম। আমার নাতনিকে দেখে মনে হলো সে যেন আমার চেয়েও বেশি উদ্দীপিত। আমাকে ফিসফিস করে সে বলল, পরের পরীক্ষায় একটি স্মরণীয় দিন রচনা এলে আমি আজকের ঘটনার কথা লিখব। আমরা দুরুদুরু চিত্তে তাঁর পথের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। তাঁর মতো লার্জার দ্যান লাইফ, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তি কি আমার মতো সাধারণ একজনকে চিনতে পারবেন? তিনি কি আমাকে সময় দেবেন? এগুলো ভাবতে ভাবতেই দেখলাম তিনি রুমে প্রবেশ করেছেন। আমাকে দেখেই তিনি হেসে দিলেন। নির্মল, প্রাণবন্ত সেই হাসি। কাছে আসতেই তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। তাঁর চেম্বারে নিয়ে পাশে বসালেন। আমার মতো সাধারণ একজনকে এত সহজে কাছে টেনে নিয়ে তিনি আবারও প্রমাণ করলেন—কতটা অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী তিনি। মনে হলো আমি যেন ৫০ বছর আগে ফিরে গিয়েছি। মনে হলো, আমরা যেন সেই আগের মতো মধুর ক্যান্টিনে বসে আছি কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায়—তাঁর ডাকা মিটিংয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে তাঁর বক্তব্য শুনছি।

 

ছাত্রী পরিষদ ও বার্ষিকী পরিষদ

১৯৬৬।  বাঁ থেকে (বসা): অধ্যাপিকা রাইসা সুলতানা, অধ্যাপিকা হালিমা খাতুন, অধ্যাপিকা জুবায়দা শরীফ, অধ্যক্ষা সৈয়দা জাহানআরা করিম, ডক্টর সুফিয়া খাতুন, অধ্যাপিকা খুরশীদ সাহাব, অধ্যাপক মোহাম্মদ মোকাররম হোসায়েন। বাঁ থেকে (দাঁড়ানো) : অনুপমা দেবনাথ, আতিয়া নাসরিন, কামরুন্নেছা, আঞ্জুমান আরা, রোকেয়া খাতুন, হাসিনা সেখ, নাজমা চৌধুরী, সাদেকা বেগম, সেলিনা বেগম, সালমা বেগম, রোকেয়া খানম (ছবি পরিচিতির ক্ষেত্রে বার্ষিকীতে ছাপা হওয়া বানান রীতি অনুসরণ করা হয়েছে)।

মন্তব্য