kalerkantho

এখানে জীবন যেমন

কুলিপাড়া

৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কুলিপাড়া

বগুড়ার সান্তাহারে একসময় শুধু কুলিদের নিয়েই একটা পাড়া গড়ে উঠেছিল। এখনো এই পাড়াকে মানুষ কুলিদের পাড়া নামেই জানে। দেখতে গিয়েছিলেন মাসুদ রানা আশিক

 

সান্তাহার শহর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে সান্দিরা গ্রাম। এই গ্রামের উত্তর দিকে কুলিপাড়া। পুরো সান্দিরা গ্রাম সান্তাহার ইউনিয়নের মধ্যে পড়লেও; শুধু কুলিপাড়াটাই পড়েছে সান্তাহার পৌরসভার ৯ নাম্বার ওয়ার্ডে। এই পাড়ায় সবাই মুসলমান। সর্বমোট ৫৪টি ঘর। সবগুলোই মাটির। পাড়ার মাঝখান দিয়ে চলে গেছে একটা ইটের রাস্তা। ঠিক পাশেই আছে সরকারি গুদাম। এই গুদামে সার রাখা হয়। যে জায়গায় কুলিপাড়া গড়ে উঠেছে, সেই জায়গাটা বাংলাদেশ রেলওয়ের। ১৯৭১ সালের পর সান্তাহার ইয়ার্ডের ৭ নাম্বার শেডে পণ্য খালাস এবং লোড দেওয়া হতো। এসব পণ্য আসত ট্রেনে। সেখানে অনেক কুলি কাজ করত। মূলত সেই কুলিরাই ধীরে ধীরে এখানে বসতি গড়তে শুরু করে। সেই থেকেই এই পাড়ার নাম হয়ে যায় কুলিপাড়া। পরে ৭ নাম্বার শেডে পণ্য ওঠা-নামার কাজ বন্ধ হয়ে গেলে তারা চলে যায় পাশের সারের গুদামে। এখানে অনেকে কুলির কাজ নেয়। আবার কেউ কেউ সান্তাহার রেলওয়ে স্টেশনে কাজ শুরু করে। তাদের অনেকে এবং উত্তরসূরিরাও এখনো কাজ করছে স্টেশনে।

 

তিনজন কলেজে পড়ে

কুলিপাড়ায় প্রায় সবাই প্রাথমিকের পাঠ চুকিয়েছে। হাতে গোনা দু-একজন ছাড়া কলেজের গণ্ডি পেরোতে পারেনি কেউ। তেমনই তিনজনের কথা শুনলাম। সম্রাট, শাকিল ও রিয়া।  তিনজনই সান্তাহার সরকারি কলেজে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ে। তবে বেশির ভাগের ঝরে পড়ার কারণ জিজ্ঞেস করলে তারা বলে, ‘অনেকেরই পড়তে ভালো লাগে না। আবার টাকার বিষয়টাও আছে। টাকার অভাবেও অনেকে পড়াটাকে বেশিদূর নিয়ে যেতে পারেনি।’

 

অনেকে পেশা বদলেছে

কুলিপাড়ায় ঢোকার মুখেই একটা মসজিদ। আরেকটু এগিয়ে যেতেই দেখা পেলাম এক বয়স্ক নারীর। ধান শুকাতে দিয়েছেন তিনি। জিজ্ঞেস করলাম, ‘চাচি, ধান এবার কেমন হয়েছে?’ বললেন, ‘ধান তো ভালোই হয়েছে, বাবা।’ তবে এই ধান তার নিজের জমির নয়। স্থানীয় এক চাষির জমি বরগা নিয়েছিলেন তাঁর স্বামী। যা ধান হয়েছে, তার অর্ধেক জমির মালিকের। আর বাকি অর্ধেক তাদের। আরেকটু এগিয়ে যেতেই চোখে পড়ল একটা মুদি দোকান। সেখানে মোমিন নামে একজনকে পেলাম। আরো দুইজনের সঙ্গে তিনি বসে আছেন। তিনি জানালেন, ‘এখন কুলির কাজ করে হাতে গোনা কয়েকজন। বাকি সবাই কেউ রাজমিস্ত্রির কাজ করে। কেউ কৃষি কাজ করে। কেউ বা রিকশা-ভ্যান চালায়। আবার অনেকে বাজারে সবজি বেচে।

 

কেউ বসে থাকে না

এই পাড়ার একটা বৈশিষ্ট্য হলো, বাড়ির কেউ বসে থাকে না। বিশেষ করে মহিলারা। তারা বাড়িতে প্লাস্টিকের শিতলপাটি তৈরি করে। অবশ্য পাটি তৈরির সরঞ্জাম তাদের নয়, মহাজনের। একটি পাটি তৈরি করলে ৩০ টাকা করে পায় তারা। দিনে পাঁচ-ছয়টি পাটি তৈরি করা যায়। সে হিসেবে ১৫০ -১৮০ টাকা উপার্জন করে। প্রায় ২০টি বাড়িতে এই পাটি বোনা হয়। এ ছাড়া অনেক নারী চরকায় সুতা কাটে। এখানকার প্রতিটি বাড়িতে হাঁস-মুরগি আছে। কিছু কিছু বাড়িতে গরু-ছাগলও আছে।

 

অন্যের বিপদে চুপ করে বসে থাকি না

স্থানীয় এক মুরব্বিকে দেখলাম, বাড়ি থেকে বের হচ্ছেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এখানকার পরিবেশ কেমন?’ বললেন, ‘এখানে নেশাটেশা নাই। গুণ্ডা-বদমাশ নাই। মারামারি-হানাহানি হয় না খুব একটা। কেউ বিপদে পড়লে আমরা চুপ করে বসে থাকি না। নিজেদের যা আছে, তা দিয়েই তাঁকে উদ্ধার করার চেষ্টা করি। তবে আমাদের এখানে সবাই গরিব। কষ্ট করেই জীবন চলে। শিক্ষার আলো এখানে কম।’

     ছবি : লেখক

 

 

মন্তব্য