kalerkantho

উদ্যমী বাংলাদেশ

কফি টাইম

মাহতাব, সাইফুল ও তানভীর—বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকানোর আগেই তিন বন্ধু মিলে শুরু করেছিলেন কফি টাইম। এখন তাঁদের চারটি শাখায় কাজ করে ৬০ জনের মতো তরুণ। এক সন্ধ্যায় তাঁদের সঙ্গে গল্প করে এসেছেন জুবায়ের আহম্মেদ

২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কফি টাইম

সাইফুল, তানভীর ও মাহতাব

মিরপুর অরিজিনাল ১০ থেকে ৬ নম্বর বাজারের একটু ভেতরে গেলেই হাতের বাঁয়ে রেস্টুরেন্টটি। সাইনবোর্ডে লেখা ‘কফি টাইম’। তখন সবে সন্ধ্যা নেমেছে। ঢুকতেই হাতের ডানে একটি সেলফি কর্নার। ইচ্ছামতো সেলফি তুলছেন অনেকে। নান্দনিক আলোকসজ্জায় ভেতরের আবহটা চমৎকার। রেস্টুরেন্টের দেয়ালও বাহারি নকশায় সাজানো। পুরো রেস্টুরেন্টেই লাল-নীল-বেগুনিসহ হরেক রকম বেলুন ঝুলছে। ‘গ্রাহকের সঙ্গে আসা বাচ্চাদের কেউ কাঁদলে আমরা বেলুন দিয়ে থাকি’—জানালেন মাহতাব ইসলাম। রেস্টুরেন্টটির উদ্যোক্তাদের একজন তিনি। কোনার একটি টেবিলে দেখলাম চার বন্ধু মিলে পিত্জা খাচ্ছেন। তাঁদেরই একজন নাহিয়ান। বললেন, ‘এখানকার পিত্জার টেস্ট বেশ ভালো, আর কফি অসাধারণ। দামও বেশি না। তাই বন্ধুদের নিয়ে এসেছি।’ পরিবার নিয়ে এসেছেন মকবুল হোসেন। বললেন, ‘মাঝে মাঝেই কফি টাইমে আসি। ভালোই সময় কাটে।’

 

শুরুর কথা

সাইফুল ও মাহতাব। জমজ ভাই। ছোটবেলা থেকেই আড্ডাপাগল। দুজনেই পড়ছেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। তখন ২০১৪ সাল। সাইফুল-মাহতাবদের শেষ সেমিস্টার চলছে। বন্ধুদের কেউ কেউ চাকরিতে যোগদান করেছেন, কেউ আবার চাকরির সন্ধান করছেন। চাকরির পেছনে না দৌড়ে নিজেরাই কিছু করবেন—ভাবলেন দুই ভাই। তাঁদের এই ভাবনা শেয়ার করলেন বন্ধু তানভীর আহমেদের সঙ্গে। তিনজনে মিলে সিদ্ধান্ত নিলেন এমন কিছু করবেন, যাতে আড্ডাটাও চলে আবার আয়-রোজগারও ভালো হয়। কী করা যায় ভাবতে ভাবতে কফি শপের আইডিয়া এলো মাথায়। কারণ মিরপুর-১০-এ তখনো ভালোমানের কোনো কফি শপ গড়ে ওঠেনি। মিরপুরে ৩৫ বর্গফুটের একটি ঘর ভাড়া নিলেন। নাম দিলেন ‘কফি টাইম’। তিনজন মিলিয়ে মোটমাট পুঁজি দেড় লাখ টাকা।

 

কফি দিয়েই শুরু

২০১৪ সালের ১২ নভেম্বর। আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করল কফি টাইম। শুরুটা কফি দিয়েই। প্রথম দুই দিন তেমন একটা লোক সমাগম হয়নি; কিন্তু তৃতীয় দিন থেকে তরুণদের আড্ডায় মুখরিত হয়ে উঠল কফি টাইম। মাসখানেকের মাথায় ভিড় সামলাতে রীতিমতো বেগ পেতে হয়েছে তাঁদের। প্রথম দিকে নিজেরাই ক্রেতাদের কাছ থেকে অর্ডার নিতেন। তারপর কফি রেডি হলে ছোট মাইকে ডেকে ডেকে সার্ভিস দিতেন। শুরুতে দাঁড়িয়েই কফি পান করতে হতো কাস্টমারকে। মাস দেড়েকের মাথায় ৩৪টি সিটের ব্যবস্থা করেন। এ-কান ও-কান করে নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে তাঁদের কফির গল্প। উত্তরা থেকেও লোকজন কফি টাইমে আসত। মিরপুর ব্রাঞ্চে দারুণ সাড়া পেয়ে ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে উত্তরায় নতুন ব্রাঞ্চ খোলেন কফি টাইমের। এখন মিরপুর ও উত্তরা মিলিয়ে মোট চারটি শাখা রয়েছে কফি টাইমের। শুরুতে শুধু কফি মিলত। এখন বিভিন্ন ধরনের কাবাব, নান, সেট মিল, পিত্জা এবং ইটালিয়ান, ম্যাক্সিকান, চায়নিজ, আফগানি খাবারও পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত খোলা থাকে কফি টাইম। পাশাপাশি মেজবানি খাবারের একটি রেস্টুরেন্টও দিয়েছেন মিরপুরে। নাম ‘প্রিয় মেজবান’। সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘‘আমার মতো অনেকে মেজবানি খাবার খুব পছন্দ করেন; কিন্তু মিরপুরে মেজবানি খাবারের কোনো রেস্টুরেন্ট নেই। পরে আমরা ‘প্রিয় মেজবান’ নামে রেস্টুরেন্ট দিলাম। এখন বেশ সাড়া পাচ্ছি।’’ অল্প সময়ে তাঁদের এই প্রতিষ্ঠানটিও পেয়েছে জনপ্রিয়তা। মিরপুরের বাইরে থেকেও মানুষ এখানে খেতে আসে। মোহাম্মদপুর থেকে তাফসিরুল ইসলাম তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে প্রিয় মেজবানে এসেছেন মেজবানি খাবার খেতে। খাবার কেমন লাগল প্রশ্ন করতেই বললেন, ‘বেশ ভালো লেগেছে। চট্টগ্রামের মেজবানি খাবারের ফ্লেভার পেয়েছি।’ কফি টাইমের জনপ্রিয়তার কারণ কী? ‘আমরা সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্পন্ন খাবার পরিবেশনের চেষ্টা করি। কাস্টমার কী পছন্দ করে সে বিষয়ে খেয়াল রাখি। তাঁদের কাছ থেকে রিভিউ নিয়ে থাকি। তাঁদের অতিথিদের মতোই আপ্যায়ন করা হয়। এখানকার পরিবেশটাও চমৎকার। মানুষ শুধু খেতে নয়, বিনোদনের জন্যও কফি টাইমে আসে।’

খাবার ও দরদাম

কফি টাইমে হট ও কোল্ড দুই রকমের কফিই মিলবে ৪০ থেকে ৯০ টাকার মধ্যে। বার্গার পাওয়া যাবে ১২০-২৫০ টাকায়। পিত্জার দাম ৩২০ থেকে ৬৪০ এবং তন্দুরি কাবাবের দাম ১২০-২৫০ টাকা। সেট মিল ২৩০ আর স্টুডেন্টদের জন্য ১২০ টাকা। প্রিয় মেজবানে জনপ্রতি মেজবানি গোস্ত ১৬৫ টাকা। কালা ভুনা জনপ্রতি ২৩৫ টাকা। জনপ্রতি মেজবানি ডাল ৮৫ টাকা। মেজবানি সেট মিল মিলবে ২৫০ এবং কালা ভুনা সেট মিলের দাম ৩৬০ টাকা।

 

ওরা সবাই শিক্ষার্থী

এখন কফি টাইম ও প্রিয় মেজবান মিলে সাইফুলদের প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন প্রায় ৬০ জন তরুণ। কিচেন শেফ ছাড়া প্রায় সবাই বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। কফি টাইমের উদ্যোক্তাদের আরেকজন মাহতাব ইসলাম বলেন, ‘এখানে কেউ চাকরির জন্য এলে আগে তার প্রয়োজনটা দেখি। কাজটা যদি তার খুব দরকার হয়, পদ খালি না থাকলেও নিয়ে নিই।’ রেস্টুরেন্ট ব্যবসার পাশাপাশি তিন বন্ধুই বিমান হলিডেজে চাকরি করেন।

 

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

ভবিষ্যতে একটা ফুড ফ্যাক্টরি করতে চান বলে জানালেন সাইফুল ইসলাম। বললেন, ‘‘আমরা এমন একটা ফুড ফ্যাক্টরি করতে চাই, যেখানে আপনি কোরিয়ান ফুড চাইলে পাবেন, আবার চায়নিজ ফুড চাইলে তা-ও পাবেন। আমরা চাই সব ধরনের খাবারের সমন্বয়ে ‘দি গ্রেট ফুড ফ্যাক্টরি’ বানাব।” আগামী দিনে মিরপুরের মধ্যে ফ্রি হোম ডেলিভারি সার্ভিস চালুর পরিকল্পনাও আছে তাঁদের।      

ছবি : মোহাম্মদ আসাদ

মন্তব্য