kalerkantho

বাঙালির বিশ্বদর্শন

খান-এ-খলিলি

সৈয়দ আখতারুজ্জামান   

২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



খান-এ-খলিলি

নাগিব মাহফুজ ক্যাফে

শহরটির নাম কায়রো। পুরনো কায়রো ধূসর, ঘিঞ্জি আর কোলাহলমুখর। খলিলি বাজার পুরনো কায়রোর মাঝখানে। লোকে ডাকে খান-এ-খলিলি। সারি সারি গলি, শত শত দোকান। অজস্র জিনিসপত্র। বেশুমার বিকিকিনি। ১৮ জনের দল আমাদের। কেউ কিনছেন নেফারতিতি, আনুবিস, হোরাস বা তুতেনখামেনের মূর্তি; কেউ কিনছেন প্যাপিরাসের ওপর আঁকা চিত্রকর্ম। ধাতুর তৈরি পিরামিডও কিনলেন কেউ কেউ। এর মধ্যে তিন-চারজনের ছোট্ট একটি দল গেল আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় দেখতে। আমিও ছিলাম সে দলে। ৯৭০ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠা। এখানকার আল আজহার মসজিদটিও দারুণ সুন্দর দেখতে। কায়রোকে এমনিতেও বলা হয় হাজার মিনারের শহর। 

 

নাগিব মাহফুজ ক্যাফে

আরবের প্রথম নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিক নাগিব মাহফুজের জন্ম পুরনো কায়রোতে। মিসরের প্রান্তিক মানুষের দুঃখ, যন্ত্রণা বয়ে বেড়াতেন তিনি। লেখায় তার নমুনা আছে।  তাঁর কায়রো ট্রিলজি পৃথিবীর পাঠককে মুগ্ধ করেছে। নাগিব মাহফুজ এই খলিলি বাজারেরই এক সাধারণ রেস্তোরাঁয় বসে চা খেতে খেতে লিখতেন। নানা রঙের মানুষের সঙ্গে আড্ডা দিতেন। তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে রেস্তোরাঁটির নতুন নাম রাখা হয়েছে নাগিব মাহফুজ ক্যাফে। এই বাজারে এসে এখন যদি এই ক্যাফেতে এক কাপ কফি না খেয়ে বাড়ি যাই, তবে লোকে বলবে কী? আমাদের মিসরী বন্ধু হামিদ ভাই পথ দেখিয়ে চললেন। পাঁচ মিনিট লাগল পৌঁছাতে। দ্বাররক্ষক দরজা খুলে সাদর অভ্যর্থনা জানালেন। ভেতরে ঢুকেই টের পেলাম এটি এখন আর আমজনতার দখলে নেই। অভিজাতরা আসনগুলোয় জমিয়ে বসেছে। গ্র্যান্ড ওবেরয় হোটেল এটি পরিচালনা করছে। আমরা নাগিব মাহফুজের চেয়ার-টেবিল খুঁজলাম। কর্মকর্তাদের কাছে খবর নিলাম। তাঁরা বললেন, সেটি আর নেই; কিন্তু আমরা নাছোড়বান্দা। সারা ঘরে চোখ বোলাতে লাগলাম। একটা দেয়ালে নাগিব মাহফুজের কয়েকটা ছবি দেখতে পেয়ে খুশির বাঁধ মানল না। আর তার কাছে একটি টেবিলও আছে। কয়েকটি চেয়ার রাখা টেবিল ঘিরে। সেখানে বসার পর মেন্যু কার্ড হাতে নিলাম।  নানা রকমের খাবারের নাম ও দাম লেখা। তার মধ্যে কারকাদাহ ও সাহলাবের নামও আছে। এগুলো কায়রোর নিজস্ব পানীয়। আছে মিল্ক শেক, জুসসহ হরেক রকমের চা-কফি; বিশেষ করে পুদিনা পাতা সহযোগে কালো চা আর দারচিনি দেওয়া মসলা-চা দুটিরই সুখ্যাতি আছে। আছে লুচি, পরোটা, কাবাব, গ্রিল চিকেন বা ল্যাম্ব। আমরা শেষতক কফিই অর্ডার করি। পুরো রেস্তোরাঁর ছাদ কারুকার্যময়। রেস্তোরাঁর ওয়েটারদের পোশাক আর টুপিতে আরবি নকশা। তবে এখানে খাবারের দাম বেশ চড়া।

ফিরতে হলো

১৯৮৮ সালে নোবেল প্রাইজ পাওয়া নাগিব মাহফুজ বলেছিলেন, ‘আমি মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে শ্রদ্ধা করি। সেই সঙ্গে অন্যের বিরুদ্ধ অবস্থানকেও অশ্রদ্ধা করি না। আমি জানি, এর জন্য আমাকে কঠিন মূল্য দিতে হবে এবং এটাই স্বাভাবিক।’ তাঁর ‘চিলড্রেন অব গাবেলাই’ বইটি প্রকাশের পর ১৯৯৪ সালে ৮২ বছর বয়সে নাগিব মাহফুজের জীবনের সেই কঠিন দিনটি ঠিকই এসেছিল। আততায়ী তাঁকে পিঠে ছুরি মেরে হত্যা করতে চেয়েছিল। অল্পের জন্য সে যাত্রা বেঁচে যান; কিন্তু ডান কাঁধের নিচে মারাত্মক জখম হওয়ায় প্রতিদিন কয়েক মিনিটের বেশি লিখতে পারতেন না। তাঁর স্মৃতিবিজড়িত রেস্তোরাঁটি থেকে আমাদের ফিরে আসতে হলো। হাতে সময় কম। সন্ধ্যা ৭টায় আমাদের ট্রেন আসয়োন রওনা হবে। তবে ফিরে আসার আগে নিজেরা নাগিব মাহফুজের ছবির সঙ্গে কয়েকটা ছবি তুলে নিলাম। এর মধ্যে দোকানগুলোতে আলো জ্বলে উঠল। খলিলি বাজার লাখো মানুষের ঢল নিয়ে রাতের আয়োজন শুরু করে দিল।

মন্তব্য