kalerkantho


তোমার ভয় নেই মা

মুক্তিযোদ্ধার যুদ্ধবাড়ি

৫ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



মুক্তিযোদ্ধার যুদ্ধবাড়ি

প্রায় ২০ বছর আগের কথা। একটি সভায় মুক্তিযুদ্ধকে এক লোক গণ্ডগোল বলে বক্তৃতা করছিল। শোনার পর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা গিয়াসের খুব খারাপ লাগছিল। ওই দিন থেকে ভাবতে শুরু করেন নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানাতে হবে। রাজবাড়ীতেও গড়ে তুলতে হবে একটি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। তারপর জাহাঙ্গীর হোসেন জানলেন আরো অনেক কথা

 

নানা লোক নানা কথা বলছিল; কিন্তু গিয়াস অবিচল ছিলেন। নেমে পড়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন সংগ্রহে। দূরে দূরে যেতে থাকলেন। মুক্তিযোদ্ধা ও কমান্ডারদের কাছে। পেতে থাকলেন যুদ্ধকালীন পোশাক, ছবি ইত্যাদি। তাঁকে বেশি সহযোগিতা করেছেন গোয়ালন্দের কমান্ডার রফিকুল ইসলাম এবং পাংশার কমান্ডার মোহাম্মদ আলী মাস্টার। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাও সংগ্রহ করেন। সেই সঙ্গে যোগাযোগ করতে থাকেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ও সদস্যসচিব মফিদুল হক তাঁর আন্তরিকতা দেখে পাশে দাঁড়ান। গিয়াসকে মফিদুল হক মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের কল্যাণী ক্যাম্পে ফরিদপুরের মুক্তিযোদ্ধাদের ছবি জোগাড় করে দেন। সংখ্যাটি এক শর বেশি। এসব ছবি দেশে আর কোথাও নেই। ছবিগুলো তুলেছিলেন ব্রিটিশ সাংবাদিক পল কর্নেট ও তাঁর স্ত্রী। এই সাংবাদিক দম্পতি একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধাদের ছবি ও তাঁদের নিয়ে প্রতিবেদন পাঠাতেন ব্রিটিশ সংবাদপত্রে। তাঁরা একসময় একাত্তরে তোলা ছবিগুলো হারিয়ে ফেলেছিলেন। যাহোক ২০০৯ সালের দিকে আবার ছবিগুলো খুঁজে পাওয়া যায়।

রাজবাড়ীর ক্যাপ্টেন বাবুলের নেতৃত্বাধীন মুক্তিযোদ্ধাদলের ছবিও আছে গিয়াসের জাদুঘরে। বাবুল ও তাঁর সহযোদ্ধারা তখন দেশে প্রবেশের চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। সেই অভিযানের ছবিগুলো এখানকার গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রহ।

এ ছাড়া মুস্তাক নামের এক মুক্তিযোদ্ধার কাছ থেকে রণাঙ্গনের কয়েকটি ছবি সংগ্রহ করেছেন গিয়াস। মুক্তিযুদ্ধের সময় মুস্তাক নৌবাহিনীতে ছিলেন। একাধিকবার রাজবাড়ী থেকে খুলনা গিয়ে মুস্তাকের কাছ থেকে ওই সব ছবি সংগ্রহ করেছেন গিয়াস।

 

পরিবার উৎসাহ দিয়েছে

পরিবারের কাছ থেকে বড় রকমের সহযোগিতা পেয়েছেন গিয়াস। তাঁর স্ত্রী নাজমা বেগম মনার ওপর তিনি খুব খুশি। তাঁর তিন ছেলে—সৌদিপ্রবাসী গোলাম কিবরিয়া মিলন, ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার গোলাম শাহরিয়ার তাহান এবং ছোট ছেলে গোলাম আম্বিয়া সোহানও অনেক সহযোগিতা দিয়েছে। গিয়াসের শাশুড়ি আমেনা বেগম মুক্তিযুদ্ধের সময় গর্ভবতী ছিলেন। পাকিস্তানি বাহিনীর তাণ্ডবের কারণে হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয়নি তাঁকে। বিনা চিকিৎসায় অনেক যন্ত্রণা নিয়ে গর্ভের সন্তানসহ মারা যান তিনি। নাজমা দুঃসহ স্মৃতি ভুলতে পারেন না। তিনি স্বামীর এই জাদুঘর স্থাপনের পেছনের প্রধান উৎসাহদাতা। ছেলেরাও মা-বাবার ইচ্ছাকে সম্মান করেছেন। বাবা যখন জাদুঘরের জন্য বাড়ির সামনের জমি দান করেন, তখন তাঁরা কেউ অমত করেননি; বরং আর্থিক সহযোগিতা দিয়েছেন।

গিয়াস বলেন, ‘বড় ছেলে মিলনকে বিয়ে দিয়েছি। মিলনের স্ত্রী কামরুন নাহার নিশি শহীদ পরিবারের সন্তান।’ নিশির দাদা শহীদ আব্দুল হাকিম মোল্লা পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে শহীদ হন। নিশির চাচা ডা. আব্দুল সাত্তার মোল্লাও একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তাই জাদুঘরে দর্শনার্থী এলে নিশি এগিয়ে যান। দর্শনার্থীদের সময় নিয়ে জাদুঘরটি ঘুরিয়ে দেখান।

মুক্তিযোদ্ধার চাওয়া

গিয়াস বলেন, এখন এ জাদুঘরটি রাজবাড়ীসহ আশপাশের জেলার মানুষের কাছে পরিচিত। স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবসসহ ছুটির দিনগুলোতে জাদুঘরে দর্শনার্থীদের সমাগম ঘটে। এখন এটি বড় করার সময় এসেছে। টিনের বেড়া দিয়ে তৈরি জাদুঘরটি তেমন শক্তপোক্তও নয়। একটি দ্বিতল ভবন তৈরি করা গেলে ভালো হয়। স্মৃতিচিহ্নগুলো প্রদর্শন ব্যবস্থারও উন্নয়ন ঘটানো দরকার। এ জন্য সরকারি বা বেসরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন। জাদুঘরটি আগামী প্রজন্মকে উপকৃত করছে। ইতিহাস বিকৃতিও ঠেকাচ্ছে। সহযোগিতা পেলে আরো এগিয়ে যাবে এ জাদুঘর।                      

ছবি: লেখক



মন্তব্য