kalerkantho


স্মৃতির পাতা

আমি যুদ্ধ দেখেছি

আব্দুর রহিম কালু একাত্তরে ম্যাট্রিক পরীক্ষার্থী ছিলেন। ভগ্নিপতির ফটো দোকানেও কাজ করতেন। ৭ এপ্রিল যাত্রা করেছিলেন ভারত। তাঁর যুদ্ধদিনের গল্প শুনেছেন ফখরে আলম

৮ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



আমি যুদ্ধ দেখেছি

যশোর শহরের রেল রোডে আমার ভগ্নিপতি মো. সফির ফটোর দোকান—ফটো ফোকাস। সন্ধ্যার পর সেখানে আসতেন আওয়ামী লীগের নেতারা। তাঁরা দেশের পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতেন। এর মধ্যে ৩ মার্চ পাকিস্তানি সেনারা এসে টিঅ্যান্ডটি অফিসের সামনে গুলি চালায়। হানাদারদের গুলিতে যশোরে প্রথম শহীদ হন চারুবালা কর। জনতা চারুবালার লাশ নিয়ে মিছিল বের করে। সফি ভাই মিছিলের ছবি তোলেন। সঙ্গে আমিও ছিলাম। ২৩ মার্চ আমাদের বড় ভাইয়েরা কালেক্টরেট ভবনের সামনে নিয়াজ পার্কে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। ২৫ মার্চ রাতে আমি ফটো ফোকাসেই ছিলাম। আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য মোশাররফ হোসেন এসে সফি ভাইকে বলেন, ‘কারফিউ জারি করা হয়েছে। আর্মি নেমেছে। দোকান বন্ধ করে বাড়ি চলে যা।’ আমি দোকান কর্মচারী আন্দ্রিওকে এগিয়ে দেওয়ার জন্য পুরান কসবা খ্রিস্টানপাড়ায় যাই। ফেরার সময় দেখি, এসপি অফিসের সামনে মিলিটারিরা টেলিফোনের তার টানাচ্ছে। আমি ঝুমঝুমপুরে সফি ভাইয়ের বাড়ি গিয়ে তাঁকে খবরটা দিলাম।

 

মার্চের ২৮ তারিখ

নড়াইল থেকে ঢাল-সড়কি, দা-বল্লম, লাঠিসোঁটা নিয়ে বেশ কিছু লোক আসে। তাদের মুখে ছিল ‘জয় বাংলা’ স্লোগান। ঝুমঝুমপুর এলাকার বিহারিদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। আমি সফি ভাইয়ের বাড়ি গিয়ে আশ্রয় নিই। পরদিন সকালে দেখি লাশ আর লাশ। আমরা বুঝতে পারি যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।

 

ভারত যাত্রা

আমি, সফি ভাই আর আমার ভাগ্নে তারা। আমরা তিনজন ৭ এপ্রিল হেঁটে ভারত রওনা হই। সফি ভাইয়ের হাতে রাইফেল, কাঁধে ক্যামেরা। ঝুমঝুমপুর থেকে সীতারামপুর হয়ে রাজারহাট গিয়ে ছোট ডিঙি নৌকায় ভৈরব নদ পার হই। হরিণার বিলের ভেতর দিয়ে হেঁটে যশোর রোডের মালঞ্চি আসি। দেখি অনেক শরণার্থী। শত শত আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা বাক্স পেটরা হাতে নিয়ে সীমান্তের দিকে যাচ্ছে। সঙ্গে গরু, ছাগলও। নারী ও শিশুরা আতঙ্কে যশোর রোড ধরে দৌড়াচ্ছে। আমরাও এক রকম দৌড়ে ঝিকরগাছায় আসি। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। কী করব, কোথায় থাকব বুঝতে পারি না। একপর্যায়ে ঝিকরগাছার আওয়ামী লীগের নেতারা আমাদের যশোর রোডের পাশেই ঝিকরগাছা কলেজে রাত যাপনের ব্যবস্থা করে দেন। স্থানীয় লোকেরা আমাদের জন্য ডাব, মুড়ি, চিঁড়া, গুড় ও রুটি বানিয়ে নিয়ে আসে। একটি বেঞ্চের ওপর শুয়ে রাত কাটিয়ে দিই। পরদিন সকালে হৈ-হট্টগোলে জেগে উঠি। জানতে পারি, পাকিস্তানি আর্মিরা ঝিকরগাছার দিকে এগিয়ে আসছে। আমরা সবাই মিলে তাদের প্রতিরোধের চেষ্টা করি। কিন্তু একপর্যায়ে আমরা পিছু হটতে বাধ্য হই।

যশোরের বেনাপোল এলাকায় সেক্টর কমান্ডার আবু ওসমানকে (গাড়িতে বসা) মুক্তিযুদ্ধের পরিস্থিতি জানাচ্ছেন এক মুক্তিযোদ্ধা। ছবিটি রহিম কালুর তোলা

বোনের কোলে বাচ্চা ছিল

৯ এপ্রিল সকালে আমরা যশোর রোড দিয়ে সীমান্তের দিকে যেতে থাকি। পথিমধ্যে হাজেরালী, নাভারন এলাকায় মহিলারা আমাদের চিঁড়া, মুড়ি আর পানি খাইয়েছে। বিকেল ৫টার দিকে বেনাপোল পৌঁছাই। যশোরের সংসদ সদস্য মোশাররফ হোসেন বনগাঁয় ছিলেন। তিনি খবর পেয়ে আমাদের সীমান্ত পার করিয়ে বনগাঁ এলাকার মতিগঞ্জে অস্থায়ী আওয়ামী লীগ অফিসে নিয়ে যান। একতলা একটি পুরনো আমলের পাকা দালান বাড়ি।  আাামাদের থাকার ব্যবস্থা হয়। ওই বাড়ির বারান্দায় আমরা প্রায় ৬০ জন শরণার্থী ছিলাম। রুটি-চিঁড়া খেয়ে সাত দিন পার করেছি। এরপর মোশাররফ সাহেব আমাদের টোকেন দেন। সেই টোকেন নিয়ে পাশের আরেকটি ভবনে গিয়ে রাতের খাবার নিয়ে আসি—পুঁইশাক, মিষ্টিকুমড়া, ডাল আর ভাত। আরো কয়েক দিন এখানে থেকে ফের সীমান্ত পার হয়ে মা-বাবা, ভাই-বোনের খোঁজে বাড়ি আসি। কিন্তু দেখি, আমাদের বাড়িটি বিহারিরা পুড়িয়ে দিয়েছে। মা-বাবাকে অনেক খোঁজার পর তালবাড়িয়া স্কুলের আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে তাঁদের সন্ধান পাই। গাওঘরা স্কুলে গিয়ে বোন জামিলা খাতুনের সন্ধান পাই। এই আশ্রয়কেন্দ্রে আমার বোন একটি কন্যাসন্তান প্রসব করে। আমি মা-বাবা, ভাই-বোনকে নিয়ে ফের ভারতের উদ্দেশে রওনা দিই। কপোতাক্ষ নদ পার হয়ে ভারতের বয়রা সীমান্তে পৌঁছাই। রাস্তায় হাঁটু সমান কাদা। আমার বোন পা ফেলতে পারছে না। সে আমাকে বলে, ‘কোলের বাচ্চা কী ফেলে দিয়ে হাঁটব?’ অনেক কষ্ট করে সীমান্ত পার হয়ে  শান্তিপুরে পৌঁছাই। এখানে আমার মা-বাবা, ভাই-বোনের আশ্রয় মেলে। তাদের রেশন কার্ড দেওয়া হয়। এই কার্ডে সপ্তাহে সপ্তাহে আমাদের পরিবার কয়েক কেজি আলু, ডাল আর চাল পেয়েছে। তাই দিয়েই এক বেলার খাবার জোগাড় হয়েছে। আমরা জানতে পারি, ২৪ এপ্রিল পাকিস্তানি মিলিটারি যশোর শহরে হামলা চালিয়েছে। তারা বারান্দিপাড়া কদমতলা থেকে আমার বড় ভাই আব্দুস শুকুরসহ ১৬ জনকে ধরে নিয়ে যায়। তাদের কারো লাশ পাওয়া যায়নি। একপর্যায়ে আমি ফের বনগাঁয় চলে আসি। আবার আমাদের আশ্রয় হয় মতিগঞ্জ আওয়ামী লীগ অফিসে। এখানে থেকে আমি মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সীমান্ত পার হয়ে শত্রুদের অবস্থান সম্পর্কে জেনে খবর দিয়েছি। পরে মুক্তিযোদ্ধারা শত্রু ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে।

 

ডিসেম্বরের কথা বলি

ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে (৬ ডিসেম্বর) যশোর মুক্ত হয়। আমরা এ খবর জানতে পারি। আমরা ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে বয়রা সীমান্ত পার হয়ে চৌগাছা দিয়ে যশোর শহরে চলে আসি। ১১ ডিসেম্বর টাউনহল মাঠে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলাম মিটিং করেন। আমি সেই জনসভায় ছিলাম। ভারত থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নামকরা কয়েকজন সাংবাদিক এসেছিলেন। জনসভায় জহির রায়হান, এম আর আখতার মুকুল, উপেন চক্রবর্তীসহ ভারতের কবি, সাহিত্যিকরাও উপস্থিত ছিলেন। শফি ভাই আমাকে শুরুর দিকেই ভারত থেকে ৩৫ টাকা দিয়ে একটি আগফা ক্যামেরা কিনে দিয়েছিলেন। ১১ ডিসেম্বরের ঐতিহাসিক জনসভায় আমি সেই ক্যামেরায় ছবি তুলেছি। শফি ভাইও ছবি তুলেছেন। পরে শফি ভাইয়ের ছবি ভারতের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। যুদ্ধের পরপরই আমি স্টুডিওর ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হই। এখনো ছবি তুলি। তবে মুক্তিযোদ্ধাদের ছবি তুলতেই আমি বেশি ভালোবাসি।



মন্তব্য