kalerkantho


যেখানে ভোর হলো

গুটেনবার্গের শহর

জার্মানির মাইনজ। রাইনের তীরঘেঁষা শহরটিতে জন্মেছিলেন গুটেনবার্গ। তিনি পৃথিবীকে মুদ্রণযন্ত্র দিয়ে গেছেন। বিবিসির মাধবী রমানি মে মাসে গিয়েছিলেন মাইনজ। নজর রেখেছিলেন আরিবা রেজা

১৩ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



গুটেনবার্গের শহর

শিল্পীর আঁকা গুটেনবার্গ ছাপাখানা

বাজারের বার। সেন্ট মার্টিনস ক্যাথেড্রাল চত্বরে লোকের ভিড়। উল্টো দিকেই গুটেনবার্গ জাদুঘর। মানুষটার পুরো নাম জোহানেস গুটেনবার্গ। স্বর্ণকার ছিলেন। পাথর কাটার কাজও জানতেন। ১৩৯৯ সালে তাঁর জন্ম। মারা গিয়েছিলেন আজ থেকে ৫৫০ বছর আগে ১৪৬৮ সালে। গুটেনবার্গের অনেক আগে কাঠের ব্লকে ছাপানোর উপায় বের করেছিলেন চীনারা। উত্তর-পশ্চিম চীনের একটি গুহায় ৮৬৮ সালে ছাপা হওয়া একটি পুরো বই মিলেছে কিছুকাল আগে।

যাই হোক, গুটেনবার্গ তামার হরফ (মেটাল টাইপ) তৈরি করেছিলেন। সারা ইউরোপে জনপ্রিয় হতে সময়ও নেননি বেশি। কেউ বলে, গুটেনবার্গ তাঁর ছাপাখানায় প্রথম ছেপেছিলেন একটি জার্মান কবিতা। কেউ বলে, একটি ক্যালেন্ডার। তবে জনপ্রিয় হয়েছিলেন বাইবেল ছাপিয়ে। ১৮০ কপি ছাপিয়েছিলেন প্রথমবার। এটি গুটেনবার্গ বাইবেল নামেই বেশি চেনা।

পোপ দ্বিতীয় পায়াস কার্ডিনাল কার্ভাহালকে লিখেছিলেন, এটি (গুটেনবার্গ বাইবেল) বেশ পরিচ্ছন্ন ও সহজ পাঠ্য। আপনি সহজেই চশমা ছাড়া এটি পড়তে পারবেন।

 

ঘটনাটা নাকি এমন ছিল

১৪৩৯ সালে গুটেনবার্গ স্ট্র্যাসবুর্গের আচেন শহরে ছিলেন। সেখানে ফিবছর অনেক মানুষ তীর্থ করতে আসতেন। তীর্থযাত্রীরা আচেনে এসে অনেক আয়না কিনতেন। পবিত্র জিনিসগুলোর ওপর আয়না দিয়ে আলো ফেলতেন। তারপর সে আয়না বাড়ি নিয়ে যেতেন। তাই প্রচুর আয়না বিক্রি হতো। ভাগ্য ফেরাতে চেয়ে গুটেনবার্গও এক ধনীর কাছ থেকে টাকা নিয়ে প্রচুর আয়না বানান; কিন্তু ওই বছরই ব্যাপক বন্যা হয়। প্লেগ ছড়িয়ে পড়ে। পোপ আচেনে বছরজুড়ে তীর্থযাত্রা নিষিদ্ধ করেন। ফলে গুটেনবার্গের আয়না আর বিক্রি হয়নি। বিরাট লোকসান। কী করবেন গুটেনবার্গ? অনেক বুদ্ধি আসতে থাকে মাথায়। এরই কোনো একপর্যায়ে নাকি ছাপার হরফ আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন। সাল ধরা হয় ১৪৪১।

 

আঙুর রসের ভাণ্ডার মাইনজ

মধ্য যুগের মাইনজ হোলি রোমান সাম্রাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্যাথেড্রাল (যে চার্চে বিশপের আসন থাকে) শহর ছিল। বিশপ ছিলেন শহরের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি। বাইবেল তখন হাতে লেখা হতো। চার্চের সন্ন্যাসীরা লিখতেন; কিন্তু কাজটি সহজ ছিল না, আর সময়ও লাগত অনেক। ভার্জিনিয়ার রাডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বিল কোভারিক হিসাব করে জানিয়েছেন, সারা দিন খেটেখুটে একজন সন্ন্যাসী সাকল্যে এক পৃষ্ঠা লিখতে পারতেন। সেখানে গুটেনবার্গ প্রেস সন্ন্যাসীর থেকে ২০০ গুণ বেশি কাজ করতে পারত। আঙুরের রস থেকে সুরা তৈরিতেও বিখ্যাত মাইনজ। রোমানরা মাইনজবাসীকে সুরা তৈরির উপায় শিখিয়েছিল। বলা হয়ে থাকে, ওয়াইন প্রেস গুটেনবার্গকে অনুপ্রাণিত করেছিল। গুটেনবার্গ জাদুঘরে বাইবেলের নমুনা পৃষ্ঠাও আছে। তখন যে রকমে (ক্যালিগ্রাফি) হরফ লেখা হতো তাকে বলা হয় গথিক টেকসচুরা। পশ্চিম ইউরোপে গথিক টেকসচুরা জনপ্রিয় ছিল ১১৫০ থেকে সপ্তদশ শতক পর্যন্ত। এ ধরনের ডেনিশ ভাষা লেখা হয়েছে ১৮৭৫ সাল পর্যন্ত। জার্মানি আর লাটভিয়ায় চলছিল বিশ শতক পর্যন্ত। লেখা আবিষ্কারকে আদান-প্রদান বা যোগাযোগের প্রথম বিপ্লব ধরা হয় আর গুটেনবার্গ ছাপাখানাকে দেখা হয় গণযোগাযোগের বিপ্লব হিসেবে। গুটেনবার্গ বাইবেল ছেপেছিলেন ১৪৫৫ সালে। কোভারিক বলছিলেন, ‘গুটেনবার্গের অক্ষরগুলো অসাধারণ। তাঁর মধ্যে ধর্মের প্রতি গভীর অনুরাগ ছিল বলেই মনে হয়। তিনি একজন শিল্পী। এমন কিছু করতে চাইছিলেন, যা দিয়ে ধর্মের সেবা হয়।’  

গুটেনবার্গ বাইবেলের ৪৮টি কপি এখনো টিকে আছে পৃথিবীতে। চার্চ বাইবেল ছাপার ব্যাপারটিতে উৎসাহ জুগিয়েছিল। ১৪৭০ সালের মধ্যেই দেখা গেল ইউরোপের সব গুরুত্বপূর্ণ শহরেই ছাপাখানা বসে গেছে। ৪০ লাখ বই ছাপা ও বিক্রি হয়ে গিয়েছিল ১৫০০ অব্দের মধ্যে।    

গুটেনবার্গের মুদ্রণযন্ত্র

সরেজমিন

গুটেনবার্গের বাড়িটি অনেক দিন আগেই হারিয়ে গেছে। এখন একটা নতুন ভবন হয়েছে। একটি ফার্মেসি আছে ভবনটিতে। সাধু ক্রিস্টফের চার্চের কাছে একটা জায়গা চিহ্নিত করা আছে। সম্ভবত তিনি সেখানে ব্যাপটাইজ (দীক্ষিত) হয়েছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় চার্চটিতে বোমা পড়েছিল। তবে ব্যাপটাইজ হওয়ার জায়গাটি বলতে গেলে অক্ষতই আছে।  গুটেনবার্গের সমাধিটি বাঁধাই করা। সাধারণত গুটেনবার্গকে দাড়িসমেত দেখা যায়; কিন্তু ট্যুর গাইড জোহানা হেইন এ ব্যাপারে সন্দিহান। কারণ ওই সময়ে তীর্থযাত্রী ও ইহুদিরাই শুধু দাড়ি রাখত।

 

মানুষটি একটু বোকা ছিলেন

আসলে গুটেনবার্গের ব্যাবসায়িক বুদ্ধি বেশি ছিল না। তাঁর আবিষ্কার থেকে অনেকে ফায়দা লুটেছে; কিন্তু তিনি সেভাবে লাভবান হননি। ছাপাখানার জন্য তিনি ধার নিয়েছিলেন ধনী ব্যক্তি ফাস্ট শফারের কাছ থেকে। ফাস্টকে পার্টনারও করেছিলেন। ফাস্ট একসময় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেন। আদালত ফাস্টকে ছাপাখানার পুরো মালিকানা দিয়ে দেন। ফাস্ট ছাপা বইয়ে নিজের নাম প্রচার করতে থাকেন। সেখানে গুটেনবার্গের কোনো উল্লেখই ছিল না। আদালতের রায় মেনে নিয়ে গুটেনবার্গ আরেকটি ছোটমোটো ছাপাখানা খোলেন; কিন্তু সেটি দাঙ্গার কবলে পড়ে ধ্বংস হয়ে যায়। বিশপ ভন নাসাউ অনেক কষ্টে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন। তার পরই তিনি গুটেনবার্গের কথা জানতে পারেন। বিশপের চেষ্টায় আদালত তাঁকে (গুটেনবার্গকে) জেন্টলম্যান অব দ্য কোর্ট উপাধি দেন। তাঁর জন্য মাসিক ভাতা চালু করেন। তত দিনে অবশ্য বুড়ো হয়ে গিয়েছিলেন মানুষটি। ১৪৬৮ সালে মারা যান গুটেনবার্গ। তাঁর মৃত্যুর ১০০ বছর পরে তাঁর একটি ছবি আঁকা হয়। অনেকেই সন্দেহ করেন, এটি মানুষটির প্রকৃত চেহারা নয়। তাঁকে সম্মান জানিয়ে নাসা একটি গ্রহাণুর নাম রেখেছে ৭৭৭ গুটেমবার্গা। 

কৃতজ্ঞতা : রোরডটবাংলা



মন্তব্য