kalerkantho


সেকাল-একাল

নাজিরপুর পোস্ট অফিস

ছোটবেলায় আহমেদ উল হক পত্রমিতালি করতেন। দেশের মধ্যে যেমন, দেশের বাইরেও তাঁর পত্রমিতা ছিল। পোস্ট অফিসের স্মৃতি তাঁর অনেক। কয়েক দিন আগে গিয়েছিলেন নাজিরপুর পোস্ট অফিসে

১৩ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



নাজিরপুর পোস্ট অফিস

‘জমি বেচে, দালাল ধরে অনেক চেষ্টার পরে ২৫ বছর আগে ছেলেকে মালয়েশিয়ায় পাঠিয়েছিলাম। ছেলে বিদেশ যাওয়ার পর চিন্তা হতো। দুই মাসের মাথায় সে জানাল তার একটা চাকরি জুটেছে। আর তার প্রায় এক মাসের মাথায় এক দিন পিয়ন এসে জানাল, টাকা এসেছে বিদেশ থেকে। ছেলের পাঠানো টাকা তুলতে গেলাম পোস্ট অফিসে। তৃপ্তি আর শান্তি পেলাম।’ প্রায় ২৫ বছর আগের কথা বলছিলেন নাজিরপুর ইউনিয়নের বারইপাড়া গ্রামের আবুল হোসেন। তাঁর বয়স ৭৬ বছর।

বারইপাড়ারই আরেক বৃদ্ধ মোতালেব বিশ্বাস। চিঠি মারফত পেয়েছিলেন বাল্যবন্ধু সাত্তার বিশ্বাসের মৃত্যু সংবাদ। বহু আগে বন্ধুটি তাঁর গ্রাম থেকে ঢাকায় চলে গিয়েছিল।

পাবনা শহর থেকে সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার দূরে বিপি নাজিরপুর পোস্ট অফিস। 

এই সময়

তথ্য-প্রযুক্তির এই সময়ে চিঠিপত্রের আদান-প্রদান কমেই গেছে। হয় না বলাও চলে। তবু নাজিরপুরে গড়ে প্রতিদিন সাত থেকে ১০টি চিঠি আসে। জানালেন কামরুন্নাহার। তাঁর পদবি ইডিএ (এক্সট্রা ডিপার্টমেন্ট এজেন্ট)। তাঁর কাছেই জানা গেল, ভিপি পার্সেল, মানি অর্ডার আসে বেশি। কামরুন্নাহার বললেন, ‘২০১৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর এখানে আমি যোগ দিই। তখন অফিসটি আরেক জায়গায় ছিল। যে জমির ওপর অফিসটি ছিল, সেই জমির মালিক আপত্তি তুললে ২০১৬ সালের মাঝামাঝি আমার শ্বশুরবাড়ির আঙিনায় ছাপরা ঘর তুলে কাজ চালাচ্ছি। তিন মাস পর পর পরিদর্শকরা এসে অফিসটি দেখে যান। এখন পর্যন্ত বড় কোনো সমস্যা দেখা দেয়নি। তবে একটা অফিস ঘর পেলে ভালো হয়।’ কামরুন্নাহারের সহকারী তরিকুল ইসলাম। বললেন, ‘১৯৯৫ সাল থেকে আছি এই অফিসেই। দুপুর ১২টার মধ্যে পাবনা হেড পোস্ট অফিস থেকে রানার এখানকার চিঠিগুলো দিয়ে যায়। চিঠিগুলো পাওয়ার পর প্রাপকের নাম-ঠিকানা অনুযায়ী বিলির ব্যবস্থা করি।  মাস শেষে বেতন পাই দুই হাজার ৪৬০ টাকা। ইডিএও একই বেতন পান। এটা ঠিক বেতন না, সম্মানী ভাতা। তবে ইডিএ মাসিক ভাতার সঙ্গে ২৫ টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ পান কলম কেনার জন্য।’

তরিকুল বলতে থাকলেন, ‘২০ বছর আগেও অনেক চিঠি আসত। ছেলে বাবার কাছে চিঠি দিত, মা সন্তানকে চিঠি লিখতেন, চিঠি আসত আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুদের। গ্রামের অনেকে লেখাপড়া জানতেন না। তাঁদের চিঠি আমাকেই লিখে দিতে হতো। গ্রামের যুবক ছেলেদের অনেকেই তখন বান্ধবীদের সঙ্গে চিঠিতে যোগাযোগ রাখত। মা-বাবাকে লুকিয়ে সেই চিঠি পাওয়ার জন্য তারা অফিসে এসে বসে থাকত। এখন চিঠি বলতে আসে চাকরির ইন্টারভিউ কার্ড, মানি অর্ডার এসব। মোবাইল ফোন আসার পরে চিঠিপত্রের যোগাযোগ একেবারেই কমে গেছে।’

 

বেশির ভাগেরই ভবন নেই

বারইপাড়ার আবুল হোসেন বললেন, ‘ছোটবেলা থেকেই  পোস্ট অফিসটি দেখে আসছি। বাবার সঙ্গে ৬৫-৭০ বছর আগে প্রথম পোস্ট অফিসে আসি। রহমত প্রামাণিক নামের এক পোস্টমাস্টার ছিলেন। অফিসটি ছিল প্রামাণিকের বাড়ির বাইরের এক ঘরে। এর পর থেকে যখন তিনি পোস্টমাস্টার হয়েছেন তাঁর বাড়িতে চলে গেছে অফিসটি।’ পাবনা হেড পোস্ট অফিসের মোস্তফা কামাল শরীফ বললেন, ‘‘এ ধরনের পোস্ট অফিসগুলোকে ‘অবিভাগীয় শাখা ডাকঘর’ বলা হয়। এর জন্য সরকারি জমির বরাদ্দ থাকে না। তবে যদি দুই শতক জায়গাও স্থানীয়রা জোগাড় করে দেয়, তবে সরকারি খরচে ভবন তৈরির ব্যবস্থা নেওয়া হয়। নাজিরপুর পোস্ট অফিসটির জন্য কোনো জায়গা না পাওয়ায় আজ পর্যন্ত ভবন তৈরি হয়নি।’’

ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেল আব্দুল হান্নানের কাছে জানলাম, পাবনা জেলায় অবিভাগীয় শাখা ডাকঘরের সংখ্যা মোট ১৩৩টি। এর মধ্যে ৮৬টিরই নিজস্ব কোনো ভবন নেই।



মন্তব্য