kalerkantho


মা তোমায় সালাম

সীমা এক মায়ের নাম

৬ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



সীমা এক মায়ের নাম

ছেলেকে পরীক্ষার হলে নিয়ে যাচ্ছেন সীমা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তোলা এই ছবিটি ভাইরাল হয়েছিল।

দুই পায়ে হৃদয়ের শক্তি নেই। মা কোলে চড়িয়ে তাকে নিয়ে এসেছেন বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত। মাঝখানে স্কুল, কলেজ পার করেছেন। হৃদয়ের মা সীমা সরকারকে সম্মান জানিয়েছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

২৩ অক্টোবর, ২০০০। নেত্রকোনার একটি ক্লিনিকে সীমার কোল আলো করে এলো ফুটফুটে এক পুত্রসন্তান। কিন্তু জন্মের দুই ঘণ্টা পরও শিশুটি কেঁদে উঠল না। শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে তার কষ্ট হচ্ছিল। অক্সিজেন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে সীমা জেনেছেন অক্সিজেনের মেয়াদ ছিল না।

একসময় শিশুটিকে নিয়ে বাড়ি এলেন সীমা। একদিন বয়স দুই বছরও পার হলো; কিন্তু হৃদয় স্বাভাবিক নড়াচড়া করতে পারছিল না অন্য শিশুদের মতো। মায়ের কপালে চিন্তার রেখা। এখানে-ওখানে দেখিয়ে একসময় ভারতেও নিয়ে গেলেন। চিকিৎসকরা জানালেন, জন্মের সময় মস্তিষ্কে আঘাত পাওয়ায় সমস্যা হয়েছে। হাত-পায়ে শক্তি পাবে না হৃদয়। কথা বলতে বা লোকজন চিনতেও সমস্যা হতে পারে। এ সমস্যা দীর্ঘদিন চলতে পারে, হয়তো সারা জীবন। সীমা হাল ছাড়ার পাত্রী নন। ওষুধের পাশাপাশি নিয়মিত ব্যায়ামও চালিয়ে গেলেন।

 

হৃদয় বসতে শিখল

মায়ের পরিশ্রম একেবারে বৃথা যায়নি। তিন বছর বয়সে প্রথম বসতে পারল হৃদয়। এবার দাঁড় করানোর চেষ্টা। ঘর থেকে উঠান পর্যন্ত একটা বাঁশ বেঁধে দিলেন সীমা সরকার। এটা ধরে হৃদয়কে দাঁড় করানোর ও হাঁটানোর প্র্যাকটিস করাতে থাকলেন। একসময় শুধু বাঁশটা ধরিয়ে দিলেই হতো। হৃদয় উঠান পর্যন্ত পৌঁছে যেত।

কখনোই কোলছাড়া করেননি

হলি চাইল্ড একাডেমি। হৃদয়ের প্রথম স্কুল। বাসা থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে। হৃদয়কে কোলে নিয়ে বড় রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াতেন সীমা। রিকশায় করে যেতেন বাকি পথ। কোনো কোনো দিন হৃদয়ের ক্লাস হতো তিন বা চারতলায়। সীমা ছেলেকে কোলে করেই তুলতেন ওপরে। হৃদয়কে ক্লাসরুমে বসিয়ে বারান্দায় অপেক্ষা করতেন। মাঝেমধ্যে গিয়ে দেখেও আসতেন। ক্লাস শেষ হলে আবার কোলে করে হৃদয়কে ফিরিয়ে আনতেন। ঝড়-বৃষ্টিতেও থামতেন না। পিএসসিতে প্রথম বিভাগে পাস করে হৃদয় (পরের বছর থেকে পিএসসিতে জিপিএ সিস্টেম চালু হয়)। তারপর আঞ্জুমান আদর্শ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো হলো তাকে। এসএসসিতে মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ ৪.০৬ পেয়েছিল হৃদয়। এরপর ভর্তি হয় আবু আব্বাস ডিগ্রি কলেজে। সেখান থেকে জিপিএ ৪.৫০ পেয়ে এইচএসসি পাস করে। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিতে শুরু করে হৃদয়।

 

ভর্তি পরীক্ষার দিন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘খ’ ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষা ছিল ২১ সেপ্টেম্বর। ১৮ সেপ্টেম্বর হৃদয়কে নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন সীমা রানী। শ্যামলীতে এক আত্মীয়ের বাসায় উঠেছিলেন। ভর্তি পরীক্ষার দিন রাত ৩টায় ঘুম ভেঙে যায় তাঁর। তারপর আর দুই চোখের পাতা এক করতে পারেননি। হৃদয়কে আঁধার থাকতেই ডেকে তোলেন। গোসল করিয়ে দই-চিঁড়া খাইয়ে দেন। সকাল ৭টায় বিশ্ববিদ্যালয়ে রওনা হলেন। ৮টার মধ্যে পৌঁছে যান। বিজয় একাত্তর হলের গেস্টরুমে অপেক্ষা করেন ৯টা পর্যন্ত। এরপর রওনা হন পরীক্ষার হলের দিকে। হৃদয়ের সিট পড়েছিল কলাভবনের পাঁচতলায়। লিফট থেকে নেমে কোলে করে ছেলেকে নিয়ে এগোতে থাকেন সীমা সরকার। সাহায্য করার জন্য দু-একজন এগিয়ে এসেছিল। সীমা বলেছিলেন, ‘ধন্যবাদ। আমার ছেলেকে আমি বসিয়ে রেখে আসব।’ ছেলেকে কোলে করে পরীক্ষার হলে নেওয়ার দৃশ্য ফ্রেমবন্দি করে রেখেছিল কেউ। পরে ফেসবুকে সেটি ভাইরাল হয়ে যায়। সীমা বললেন, ‘পরীক্ষার হলে গিয়ে নির্দিষ্ট আসনে হৃদয়কে বসালাম। ছেলেকে বললাম, বাবা ভালো করে পরীক্ষা দিয়ো। ভয় পেয়ো না।’ হৃদয়কে বসিয়ে বারান্দায় অপেক্ষা করতে লাগলেন সীমা। এক ঘণ্টার পরীক্ষা শেষে একইভাবে ছেলেকে নিয়ে ফিরেছিলেন।

 

মা আমি পাস করেছি

২৫ সেপ্টেম্বর দুপুরে ‘খ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার ফল বের হয়। সীমা তখন রান্না করছিলেন। অনলাইনে রেজাল্ট দেখে হৃদয় উচ্ছ্বাসভরা কণ্ঠে মাকে ডাকলেন। বললেন, ‘মা আমি পাস করে ফেলেছি।’ খুশিতে মায়ের চোখে জল চলে আসে। জড়িয়ে ধরে ছেলের কপালে চুমু খান। বললেন, ‘তোর বাবাকে ফোন কর।’ উল্লেখ্য, হৃদয়ের এখনো মৌখিক পরীক্ষা বাকি।

 

সীমা সরকারের একদিন

এসএসসি পাস করার আগেই বিয়ে হয়ে যায় সীমার। স্বামী সমীরণ সরকার ইটের ভাটায় কাজ করেন। বিয়ের বছর দুয়েকের মাথায় হৃদয়ের জন্ম। এখন তাঁদের দুই সন্তান—হৃদয় ও অন্তর। অন্তর পড়ে ক্লাস সেভেনে। ভোরের আলো ফোটার আগেই ঘুম ভাঙে সীমার। ঘরদোর পরিষ্কার করে সকালের নাশতা রেডি করেন। এরপর হৃদয়কে ঘুম থেকে ডেকে তোলেন। বাথরুমে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে দিয়ে আসেন। তারপর এনে পড়ার টেবিলে বসান। ৮টা নাগাদ সবাই মিলে নাশতা খেতে বসেন। এর মধ্যে অন্তরের স্কুলের সময় হয়ে যায়। হৃদয়কে বিছানায়, নয়তো বারান্দায় বসিয়ে দুপুরের রান্নার আয়োজন করেন। এক ফাঁকে হৃদয়কে স্নান করান। দুপুরে খাওয়ার পর তাকে আবার বিছানায় দিয়ে আসেন। বিকেলে আবার পড়তে বসে হৃদয়। পড়াশোনা শেষে রাতে কিছুক্ষণ টেলিভিশন দেখে। রাতের খাবার শেষে বিছানায় নিয়ে আবার ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে আসেন মা।

 

আমি তো চিরকাল থাকব না

হৃদয় পড়াশোনা করে স্বাবলম্বী হোক—এটাই সীমা সরকারের চাওয়া। বললেন, ‘আমি তো আর চিরকাল থাকব না। ও যেন ভালো থাকে, সুখে থাকে এটাই আমার চাওয়া।’ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলে কোথায় কিভাবে থাকবে—এটাই এখন মায়ের চিন্তার ব্যাপার। তিনি ছেলেকে একলা ছাড়তে চান না। ঢাকায় ছোটমোটো একটা বাসা নিতে চান। কিন্তু খরচ জোগাড় হবে কিভাবে জানেন না। বললেন, ‘কেউ যদি এগিয়ে আসতেন ভালো হতো। স্বয়ংক্রিয় একটা হুইলচেয়ার পাওয়া গেলে হৃদয়ের চলাফেরায়ও কিছুটা সুবিধা হতো।’

 

ছবি : মিজানুর রহমান নান্নু ও সংগ্রহ

 

 



মন্তব্য