kalerkantho


আমাদের ভার্চুয়াল সার্জন

৬ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



আমাদের ভার্চুয়াল সার্জন

গুগল গ্লাসের মাধ্যমে ৩৬০ ডিগ্রিতে সরাসরি অপারেশন প্রদর্শনের জন্য দুনিয়াজুড়ে খ্যাতি তাঁর। বিশ্বের সর্বাধিক মানুষের দেখা সরাসরি অপারেশনকারী সার্জন তিনি। বলিভিয়ায় তাঁর নামে বিশ্ববিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সিলেটের বিয়ানীবাজারের মোল্লাগাঁওয়ের ছেলে ডা. শাফি আহমেদ। রয়াল লন্ডন হসপিটালে তাঁর সঙ্গে দেখা করে এসেছেন জুয়েল রাজ

বেশ কয়েকবার ফোনে এসএমএস বিনিময় হয়েছিল। বলেছিলাম, একটি ইন্টারভিউ করতে চাই; কিন্তু সময় বের করতে পারছিলেন না। হঠাৎ করেই এক দুপুরে বললেন—আজকে একটু ফ্রি আছি। চাইলে আসতে পারেন। হাসপাতালের রিসিপশনে গিয়ে ফোন দিলাম। বললাম, কোন ফ্লোরে আসব? বললেন, দুই মিনিট অপেক্ষা করুন। মিনিট দুয়েক পরে দেখি নিজেই হাজির। হাসিমুখে কুশল জিজ্ঞেস করতে করতে চেম্বারে নিয়ে গেলেন।

 

আপনে বাংলায় কউকা, আমি ইংলিশে কই

ইংরেজিতে, না বাংলায় চলবে আলাপ? সিলেটি উচ্চারণে বললেন, ‘আমার বাংলা অতো ভালা নায়, বাট বুঝি সবতা। ভালা অইব, আপনে বাংলায় কউকা, আমি ইংলিশে কই (আমার বাংলা খুব ভালো না, কিন্তু সব বুঝি।’ ভালো হবে আপনি বাংলায় বলুন, আমি ইংরেজিতে)। ইংরেজি-বাংলা মিলিয়েই চলে আলাপ।

চার বছর বয়সে লন্ডনে

সিলেটে বিয়ানীবাজার উপজেলার মোল্লাপুরে জন্ম। বাবা মিম্বর আলী ও মা সুফিয়া খানম দম্পতির তিন ছেলে-এক মেয়ের মধ্যে তৃতীয় শাফি। মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকারের সম্মাননা পেয়েছিলেন মিম্বর আলী।

১৯৭৩ সালে শাফি সবে চারে পড়ছেন। সেই সময় মা-বাবার হাত ধরে লন্ডনে আসেন। পূর্ব লন্ডনের বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় পড়ালেখা করেছেন। ছোটবেলায় ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু সেটা আর হয়ে ওঠেনি। ব্রিটেনে তখন বাঙালিদের বাঁকাচোখে দেখা হতো। উগ্রবর্ণবাদী হামলা ছিল সে সময়কার নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। তাই পড়ালেখা করে বড় কিছু হবেন—এমনটি অনেকের ভাবনার মধ্যেও ছিল না। তখন মূলত গার্মেন্টে কাজ করা, রেস্টুরেন্ট ব্যবসা—এসবই বাঙালিদের পেশা। তাঁর বাবাও ধরে নিয়েছিলেন পড়ালেখা করে হয়তো রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় হাত লাগাবে শাফি; কিন্তু মা ছিলেন একটু আলাদা। মা বারবার বুঝিয়েছেন—যা-ই করো, পড়ালেখাটা আগে।

তুখোড় ছাত্র ছিলেন

১৯৯৩ সালে কিংস কলেজ হাসপাতাল থেকে এমবিবিএস, ২০০৬ সালে রয়াল কলেজ অব সার্জন থেকে এফআরসিএস, ২০১০ সালে কুইন ম্যারি ইউনিভার্সিটি থেকে কোলন ক্যান্সারের ওপর পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন ডা. শাফি।

১৯৮৯-৯০ সালে কিংস কলেজে মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল সোসাইটির নির্বাচিত সভাপতি ছিলেন। সেই সময় কলেজের শিক্ষা কার্যক্রমে মেডিক্যালে ইথিক্স বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে ভূমিকা রাখেন। একাডেমিক ফলাফল ও সহশিক্ষা কার্যক্রমে কৃতিত্বপূর্ণ ফলের জন্য ১৯৯০ সালে কিংস কলেজ থেকে জেইএলএফ এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। 

খেলাধুলা ভুলে যাননি

মেডিক্যালে পড়াশোনার অনেক চাপ। তার মধ্যেও খেলাধুলা ভুলে যাননি ডা. শাফি। ১৯৮৮ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত ইউনাইটেড হাসপাতাল টিমের মূল দলের হয়ে ফুটবল খেলেছেন। আবার ১৯৯১ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত ক্রিকেট দলের অধিনায়কের দায়িত্বও পালন করেছেন। 

বলিভিয়ায় তাঁর নামে বিশ্ববিদ্যালয়

ডা. শাফি ২০০৭ সালে ল্যাপারোস্কপি অ্যান্ড কলোরেক্টাল সার্জন কনসালট্যান্ট জেনারেল হিসেবে যোগ দেন রয়েল লন্ডন হাসপাতালে। সেখানে মিনিমালি ইনভেসিভ কলোরেক্টাল সার্জারি একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন। ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত তিনি বার্টস হেলথ ট্রাস্টের প্রধান ছিলেন। ২০১৩ সালে রয়েল কলেজ অব সার্জন অব ইংল্যান্ডের কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছিলেন। বলিভিয়া, কলম্বিয়া, পেরু ও স্পেন থেকেও সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি পেয়েছেন। তিনি ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের ২০টির বেশি দেশে আমন্ত্রিত হয়েছেন মূল বক্তা হিসেবে। ব্রিটেনের মেডিক্যাল কলেজগুলোতে তাঁর প্রবর্তিত ডিজিটাল হেলথ বিষয়টি পড়ানো হয়।

বলিভিয়া সরকার ডা. শাফির নামে শাফি আহমেদ-মার্টিন ডকওয়েলার বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছে। ২০১৯ সাল থেকে সেখানে চিকিৎসাসেবা চালু হবে। তিনি হাসপাতালটির সিইও। পাশাপাশি লন্ডন কুইন ম্যারি ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতাও করছেন তিনি। এখন সারা বিশ্বে সার্জিক্যাল শিক্ষায় সক্ষমতা বাড়াতে কাজ করছেন। ডা. শাফি ও স্টিভ ড্যান মিলে গড়ে তুলেছেন মেডিক্যাল রিয়ালিটিস অ্যান্ড ভার্চুয়াল মেডিকস নামের প্রতিষ্ঠান। সম্প্রতি তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানে গ্লোবাল সার্জিক্যাল কারিকুলামও প্রকাশ করেছেন।

 

ডা. শাফির অপারেশন দেখেছে বিশ্ব

২৩ মে ২০১৪। প্রথমবারের মতো গুগল গ্লাস ব্যবহার করে উইচ্যাটের মাধ্যমে অস্ত্রোপচার সরাসরি সম্প্রচার করে বিশ্বব্যাপী হৈচৈ ফেলে দিয়েছিলেন ডা. শাফি। বিশ্বের ১৩২টি দেশের চিকিৎসক ও চিকিৎসাশাস্ত্রের শিক্ষার্থীরা সরাসরি দেখেছিল সেই সম্প্রচার। ওই অপারেশনের মাধ্যমে একজন ক্যান্সার রোগীর যকৃৎ ও অন্ত্র থেকে টিউমার অপসারণ করা হয়।

২০১৬ সালের ১৪ এপ্রিল বার্টস হেলথের সহযোগিতায় বিশ্বের প্রথম ভার্চুয়াল রিয়ালিটি অপারেশন ৩৬০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে সম্প্রচার করেন। বিশ্বের ১৪০টি দেশের চার হাজার শহরে ৫৫ হাজার মানুষ সেটি প্রত্যক্ষ করেন। ৪৬ লাখ মানুষ টুইটারে সংযুক্ত হয়েছিলেন। বিশ্বের ৪০০-এর বেশি সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হয় ডা. শাফির এই কৃতিত্ব। একই বছরের ৯ ডিসেম্বর স্ন্যাপচ্যাটের মাধ্যমে প্রথম লাইভ অপারেশনের মাধ্যমে বিশ্বের ২০০ মেডিক্যাল শিক্ষার্থী ও সার্জিক্যাল প্রশিক্ষণার্থীকে প্রশিক্ষণ দেন তিনি। এই অপারেশন লক্ষাধিক মানুষ দেখেছে।

ওই ঘটনার এক বছরের মধ্যেই সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্রিটিশ-বাংলাদেশির স্বীকৃতি পেলেন ডা. শাফি আহমেদ। ব্রিটিশ-বাংলাদেশি পাওয়ার অ্যান্ড ইন্সপায়ারেশন (বিবিপিআই) ফাউন্ডেশন তাঁকে এ সম্মাননা দেয়। উদ্ভাবক ও প্রযুক্তিগত উদ্যোক্তা হিসেবে তিনি এ সম্মাননা পান। চিকিৎসক শাফির ওই সম্প্রচারকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ভার্চুয়াল রিয়ালিটির ক্ষেত্রে পথিকৃৎ বলে বর্ণনা করেছে বিবিপিআই।

 

গুগল গ্লাস যেভাবে কাজ করে

এটি ইন্টারনেটযুক্ত চশমা, যা একযোগে ভিডিও ক্যামেরা, কম্পিউটার ও স্ক্রিনের কাজ করে। তবে চিকিৎসাক্ষেত্রে এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে এর মাধ্যমে সার্জন তাঁর সহকর্মীদের সঙ্গে মতামত শেয়ার করতে পারেন। সাধারণ চশমার মতোই এটি পরা যায়। যখন কোনো কিছু শেখাতে হয় কিংবা কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে অনেকের সঙ্গে আলাপ করে নিতে হয়, তখনো এ চশমা উপযোগী। খুব জটিল কোনো অপারেশনের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞদের কাছ থেকে মতামতও নেওয়া সম্ভব এই চশমার মাধ্যমে। সে জন্য ওই বিশেষজ্ঞের সশরীরে অপারেশন থিয়েটারে না থাকলেও চলে। পৃথিবীর যেকোনো স্থান থেকে এই পরামর্শ দেওয়া-নেওয়া সম্ভব। ভার্চুয়াল রিয়ালিটি প্রযুক্তি শত শত বছর ধরে চলে আসা সার্জারি প্রশিক্ষণে বিপ্লব নিয়ে এসেছে। অপারেশনের সময় আগে যেখানে প্রশিক্ষণার্থীকে সার্জন ও তাঁর সহকারীর পেছনে দাঁড়িয়ে অপারেশন দেখতে হতো। নতুন এ প্রযুক্তি ব্যবহারে সেটি আরো সহজ করে দিয়েছে। ভার্চুয়াল রিয়ালিটি প্রযুক্তিতে দর্শক সার্জিক্যাল টিমের অংশ হিসেবে নিজেই অপারেশন থিয়েটারের সব দৃশ্য দেখতে পারেন।

 

ব্যক্তিগত শাফি

স্ত্রী ফারজানা হোসাইনও পেশায় চিকিৎসক। দুই সন্তান—ওসমান ও জরিনা। বড় ভাই শামিম আহমেদ এভিয়েশন ইঞ্জিনিয়ার। বড় বোন স্বপ্নারা খাতুন ব্রিটেনের প্রথম এশিয়ান নারী বিচারক। ছোট ভাই জামি আহামেদ পাতাল রেলের চালক।

 

ভবিষ্যতের ভাবনা

শাফি বললেন, শিক্ষকতা এবং অন্যের জন্য উদাহরণ তৈরির চেষ্টা করে যাচ্ছি। প্রযুক্তি ব্যবহারে আমি শুধু অন্যদের উদ্বুদ্ধ করতে চাই না, বরং বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য খাতের উন্নতিতেও অবদান রাখতে চাই। বাংলাদেশে আসবেন কি না জানতে চাইলে ডা. শাফি বলেন, যেখানেই যাই না কেন, নিজের জাতিসত্তাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আমার ছেলে-মেয়ের বয়স ১৪ ও ১৫। কিন্তু এখনো দেশে নিয়ে যাওয়া হয়নি। তাদের নিয়ে দেশে যাওয়ার ইচ্ছা আছে। শিকড়ের সঙ্গে ওদের বন্ধনটা গড়ে দিতে চাই।

বৃক্ষ যেমন ফলের ভারে নুয়ে পড়ে, মানুষও নাকি জ্ঞানের ভারে বিনয়ী হয়ে ওঠে—ডা. শাফির সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে সে কথাই মনে হলো। শুরুতে যেমন নিজের চেম্বারে নিয়ে গেলেন, ফেরার পথেও লিফট পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন।

 

ডা. শাফির উল্লেখযোগ্য কিছু পুরস্কার

►    ২০০৪ সাল। ব্রিটিশ জার্নাল অব সার্জারি প্রাইজ।

►    ২০১৩ ও ২০১৭ সালে দুইবার বার্টস হেলথ হিরো।

►    ২০১৫ সালে সিলভার স্কালপের প্রাইজ।

►    ২০১৭ সালে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি পারসন অব দ্য ইয়ার। একই বছর টপ এশিয়ান ইন ইউকে টেক পুরস্কার, ডিজিটাল লিডার অ্যাওয়ার্ড এবং ইসলামিক সোসাইটি অব ব্রিটেন থেকে ব্রিটিশ টেলিকম ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ড।

►    ২০১৮ সালে ব্রিটেনের মর্যাদাপূর্ণ ওয়েস্ট মিনিস্টার ফিউচার হেলথ অ্যাওয়ার্ড।

 

 



মন্তব্য