kalerkantho


বিশাল বাংলা

খাঁটি দুধের হাট

এলাকার মানুষ যাতে বিশুদ্ধ দুধ পেতে পারে, সে জন্য চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসন ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের উদ্যোগে শহরের পুরনো জেলখানা এলাকায় চালু হয়েছে গরুর খাঁটি দুধের হাট। দেখে এসেছেন মানিক আকবর

১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



খাঁটি দুধের হাট

দুধের হাট উদ্বোধন করছেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) জসিম উদ্দীন

চুয়াডাঙ্গা শহরের কোর্টপাড়ার বাসিন্দা তানভীর জামান সুমন। মেয়ে সূচীর জন্য প্রায়ই বাজার থেকে দুধ কিনে আনতেন। কিন্তু সন্তুষ্ট হতে পারেননি। দুধে মেশানো পানিও বিশুদ্ধ কি না সে চিন্তায় থাকতে হতো। ওদিকে ডাক্তার বলেছেন, শিশুর দৈহিক ও মানসিক বিকাশে দুধের তুলনা নেই। একসময় নিজেই গাভি লালন-পালন শুরু করেন। এখন সেটা সূচী ডেইরি ফার্মে রূপ নিয়েছে। সুমন ফার্ম থেকে বিশুদ্ধ দুধ বিক্রি শুরু করেন। অনেকে আধা লিটার, এক লিটার করে কেনেন। দু-একজন আসেন, যাঁরা তাঁর কাছ থেকে দুধ নিয়ে শহরের বাড়ি বাড়ি ফেরি করেন। কিন্তু এভাবে ভালো দাম পাচ্ছিলেন না সুমন। আবার কোনো কোনো দিন কয়েক লিটার দুধ অবিক্রীতও থেকে যেত। ভাবলেন একটা হাট হলে ভালো হতো। একদিন সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এ এইচ এম শামিমুজ্জামান সুমনকে ডেকে পাঠালেন। বললেন, আমাদের এখানে তো বিশুদ্ধ দুধের কোনো হাট নেই। জেলা প্রশাসক মহোদয় বিশুদ্ধ দুধের হাট বসাতে চান। যাঁদের খামার আছে, তাঁদের সঙ্গে আলাপ করো। সুমন দেখেছেন অনেক শহরে বড় বড় দুধের হাট আছে। কিন্তু চুয়াডাঙ্গায় সে রকম কোনো হাট না থাকায় ক্রেতা-খামার মালিক উভয়েরই সমস্যা। কোনো দিন খামারে বেশি ক্রেতা আসে। আবার কোনো কোনো দিন বলতে গেলে ক্রেতাশূন্য অবস্থা। দুধ থেকে যায় অবিক্রীত। হাট হলে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েরই সুবিধা। ফলে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কথা শুনে আশায় বুক বাঁধলেন সুমন। অন্য খামার মালিকদের সঙ্গেও যোগাযোগ করলেন। সবাই ইতিবাচক সাড়া দিলেন।

 

চালু হলো বিশুদ্ধ দুধের হাট

৭ মার্চ বিকেলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভেতরে একটি ফাঁকা স্থানে প্রথমবারের মতো অস্থায়ী দুধের হাট বসল। উদ্বোধন করলেন জেলা প্রশাসক জিয়াউদ্দীন আহমেদ। তখন তিনি বলেছিলেন, ‘আপনারা হাটে দুধ আনবেন। বিক্রি না হলে আমি নিজে কিনে নেব। প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে হাট বসবে। নির্ভেজাল দুধ আনতে হবে। একেক কেজি ৬০ টাকা দরে বিক্রি হবে।’ খামার মালিকরাও সম্মত হন। এভাবে দুধ বিক্রি শুরু হয়। তবে ক্রেতা কম। কারণ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভেতরে বলে অনেকে সেখানে যেতে চাইতেন না। এরপর খামার মালিকরা বললেন, প্রধান সড়কের পাশে হলে হাট জমে উঠতে সময় লাগবে না। গত ১৩ আগস্ট থেকে সেই হাটটি চুয়াডাঙ্গা শহরের পুরনো কারাগারের পাশের রাস্তাসংলগ্ন একটি ফাঁকা স্থানে স্থানান্তর করা হয়েছে। এটি উদ্বোধনের সময় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) জসিম উদ্দীন জানিয়েছেন, এখানে প্রতিদিন দুপুর ৩টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত নিয়মিত ৬০ টাকা লিটার দরে খাঁটি দুধ বিক্রি করা হবে। এখানে কোনো অবস্থায়ই পানি মেশানো দুধ বিক্রি করতে দেওয়া হবে না। এত দিন সঠিক বাজার ব্যবস্থাপনা না থাকায় এই এলাকায় দুধ উৎপাদনে সেভাবে আগ্রহ তৈরি হয়নি। এখন সেটা বাড়বে।

 

দুধের হাটে একদিন

দুধের হাটে গিয়ে দেখা গেল, বোতল কিংবা জগে ভর্তি দুধ সাজিয়ে বসে আছেন অনেকে। ক্রেতারা এসে পরিমাণমতো কিনে নিয়ে যাচ্ছে। দাম নিয়ে কোনো বাতচিত নেই। সদর উপজেলার বুজরুকগড়গড়ি গ্রামের হাফিজুর রহমান দুধ কিনতে এসেছিলেন। তিনি জানান, নাতির জন্য দুধ লাগে। আগে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভেতর থেকে কিনেছিলাম। এখন এখান থেকে কিনি। দাম একটু বেশি হলেও ভেজালমুক্ত দুধ পাওয়া যায়।’ নূরনগর গ্রাম থেকে দুধ নিয়ে এসেছেন রাকিবুল ইসলাম। জানালেন, আগে এক ব্যবসায়ীর কাছে ৪০ টাকা কেজি দরে দুধ বিক্রি করে দিতাম। হাট হওয়ায় ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে। সেখান থেকে গেলাম চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এ এইচ এম শামিমুজ্জামানের কাছে। তিনি বলেন, বিক্রেতাদের বলা হয়েছে, দুধে কোনো ভেজাল মেশানো যাবে না। প্রয়োজনে হাটে আনা দুধ পরীক্ষা করা হবে। ক্রেতারা যাতে নির্ভেজাল খাঁটি দুধ পায়, তার নিশ্চয়তা আছে দুধের হাটে।

 

জেলা প্রশাসক বললেন

চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক জিয়াউদ্দীন আহমেদ বলেন, অনেক শহরে দুধের হাট আছে। কিন্তু চুয়াডাঙ্গায় ছিল না। এই অঞ্চলের বেশির ভাগ মানুষের নিয়মিত ফলফলাদি, মাছ-মাংস খাওয়ার সামর্থ্য নেই, সেহেতু অন্তত শিশুদের জন্য বিশুদ্ধ দুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতেই স্থানীয় খামার মালিকদের নিয়ে বিশুদ্ধ দুধের হাট। কারণ দুধ আদর্শ খাবার। এতে সব ধরনের খাদ্যপ্রাণ আছে। দুধের হাটের পাশাপাশি পুষ্টিকর খাবার ও ফলমূল বিক্রির নির্দিষ্ট স্থান করার পরিকল্পনা আছে। সেখানে পুষ্টিহাট হবে। দুধের হাটটিও চলে যাবে পুষ্টিহাটে।



মন্তব্য