kalerkantho


সুখবর বাংলাদেশ

এবার বায়ান্নয়

১৮ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



এবার বায়ান্নয়

লাল-সবুজের পতাকা হাতে নিয়েই মঞ্চে উঠেছিলেন

তখন ২০১৫ সাল। উনপঞ্চাশ ছিল মাহছুদুর রহমান মাসুদের বয়স। দেশকে ব্রোঞ্জ এনে দিয়েছিলেন। এবার বয়স বায়ান্ন। দেশকে সিলভার এনে দিলেন। ন্যাচারাল বডিবিল্ডিং অ্যান্ড ফিটনেস সিঙ্গাপুর ইন্টারন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপে সিলভার জিতেছেন মাসুদ। গল্পটি শুনে এসেছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

আমি শুরুই করেছি বিয়াল্লিশের পরে। শখেই বলতে পারেন। এমন বয়সে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া তো দূরের কথা ফিটনেস ধরে রাখাই কঠিন। কিন্তু আমার ইচ্ছা ছিল প্রবল। জাতীয় বডিবিল্ডিং প্রতিযোগিতায় নাম লিখিয়ে ফেললাম। ২০০৯ সালের কথা। পঞ্চম হয়েছিলাম। এর পর থেকে বডিবিল্ডিং কম্পিটিশন নিয়ে খোঁজখবর রাখতে থাকি নিয়মিত। দেশের বাইরেও নানা প্রতিযোগিতায় নাম লেখাতে থাকি।

 

খবর পেয়েছিলাম জুনে

ইন্টারনেট থেকে সিঙ্গাপুরের বডিবিল্ডিং কম্পিটিশনের কথা জানতে পেরেছিলাম জুন মাসে। সিঙ্গাপুরের ন্যাচারাল বডিবিল্ডিং অ্যান্ড ফিটনেস অ্যাসোসিয়েশন এটি আয়োজন করে। ১৫টি ক্যাটাগরিতে (বিভাগ) প্রতিযোগিতা হয়। পঞ্চাশের বেশি যাঁদের বয়স, তাঁদের জন্য গ্র্যান্ড মাস্টারস ক্যাটাগরি। আমার যেহেতু বায়ান্ন বছর বয়স, তাই গ্র্যান্ড মাস্টার ক্যাটাগরিতেই আবেদন করলাম। আরো কিছু তথ্য চেয়ে কর্তৃপক্ষ ফিরতি মেইল করল অল্প দিনের মধ্যেই। সেগুলো যথাসময়ে পাঠিয়ে দিলাম। তারপর আরেকটা মেইলে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ পেলাম। আগস্টের ৪ তারিখ ফাইনাল। হাতে সময় দুই মাসের বেশি ছিল না। ভালো প্রস্তুতি নিতে দুই মাস আসলেই কম সময়। তার মধ্যে অফিস আছে। আছে পারিবারিক নানা কাজকর্ম। যা হোক প্রতিদিন ভোরে ব্যায়াম করতাম। সন্ধ্যায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা জিমে (ব্যায়ামাগারে) ঘাম ঝরাতে লাগলাম। দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর পর কিছু না কিছু খেতাম। তবে ওই দুই মাস ভাত বেশি খাইনি। বরং আঁশজাতীয় খাবার খেয়েছি বেশি। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ছিল—১৫টি ডিমের সাদা অংশ, এক কেজি মুরগি, ২৫০ গ্রাম টুনা ফিশ, কোরাল ফিশ, রূপচাঁদা, ওটস, শাকসবজি, ফলমূল আর কম করেও ৫ লিটার পানি। শেষদিকে অবশ্য পানি এবং ডিমের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছিলাম। ওজন ৭৯ কেজি থেকে নামিয়ে ৭৬ কেজিতে এনেছিলাম।

 

বিমানে চড়লাম

আগস্টের ৩ তারিখে সিঙ্গাপুরগামী বিমানে চড়লাম। সিঙ্গাপুর, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, নেপাল, মালয়েশিয়াসহ ১০টি দেশের প্রতিযোগী ছিলেন আসরে। যেহেতু ন্যাচারাল বডিবিল্ডিং প্রতিযোগিতা, তাই ডোপ টেস্টে অংশ নিতে হয়। এই পর্ব ভালোভাবেই উতরে গেলাম। ৪ তারিখ সকাল ১১টায় শুরু হলো চূড়ান্ত পর্ব। প্রতিযোগীদের মঞ্চে ডাকা হচ্ছিল একে একে। আমার ডাক পড়ল ৩ নম্বরে। এখানে নিয়ম হলো—একেকজন প্রতিযোগীকে সাতবার পোজ (কসরত দেখানো) দিতে হয়। সবার শেষে থাকে ফ্রি পোজিং। সংগীতের তালে তালে প্রতিযোগী ইচ্ছামতো নিজেকে উপস্থাপনের সুযোগ পান এ দফায়। আমি আগেও এমন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছি; তবু মন অস্থির ছিল। সব শেষ হতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। এবার বিজয়ী ঘোষণা ও পুরস্কার প্রদান পর্ব। প্রথমে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিযোগীর নাম বলা হলো, তারপর আমার নাম মানে আমি দ্বিতীয় হয়েছি। স্বর্ণপদক জিতেছে জার্মানির প্রতিযোগী। আমি লাল-সবুজ পতাকা নিয়ে মঞ্চে হাজির হয়েছিলাম।

 

এই আমি

বাড়ি জামালপুর। সাত ভাই-বোনের মধ্যে ৬ নম্বর। ছোটবেলায় মার্শাল আর্ট শিখেছি। এইচএসসি পাস করে ঢাকায় আসি। বাঙলা কলেজ থেকে বিকম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হিসাববিজ্ঞানে এমবিএ করেছি। চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফার্ম কেপিএমজি রহমান অ্যান্ড রহমান হক থেকে সিএ করেছি। তারপর চাকরি-সংসার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ জন্ডিসেও আক্রান্ত হই। কঙ্কালসার অবস্থা। তারপর স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারে মনোযোগী হয়ে ২০০৮ সালে ভর্তি হই গোল্ড জিমে। যে রুমটায় জিম করতাম তার দেয়ালে আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার, রনি কোলম্যান, লি প্রিস্টসহ বিশ্বখ্যাত বডিবিল্ডারদের বড় বড় ছবি টাঙানো ছিল। এসব ছবি দেখেই মূলত বডিবিল্ডিংয়ের প্রেমে পড়ি। শোয়ার্জনেগার আমার হিরো। ইন্টারনেট থেকে তাঁর টিপস জোগাড় করে অনুশীলন চালিয়ে যাই। বডিবিল্ডিংয়ের পাশাপাশি ২০১৬ সাল থেকে গলফ খেলাও শুরু করি। আমি এখন রহিমআফরোজ গ্রুপের জেনারেল ম্যানেজার। স্ত্রী শাহানাজ আক্তার আর দুই মেয়ে সামিহা রহমান এলমা ও নাবিহা রহমান সুহাকে নিয়ে আমার সংসার।

 

১ আগস্ট ২০১৫। অবসরের প্রচ্ছদে মাসুদ

মাসুদের কিছু অর্জন

►    ২০১১ সালে জাতীয় বডিবিল্ডিং প্রতিযোগিতায় প্রথম রানারআপ। একই বছর ঢাকা সিটি বডিবিল্ডিং প্রতিযোগিতায় ‘মিস্টার ঢাকা’।

 

►    ২০১৩ সালে অষ্টম বাংলাদেশ গেমসে মাস্টারস ক্যাটাগরিতে স্বর্ণপদক।

 

►    ২০১৪ সালে জাতীয় বডিবিল্ডিং প্রতিযোগিতায় মাস্টারস ক্যাটাগরিতে প্রথম হয়ে ‘মিস্টার বাংলাদেশ’ খেতাব অর্জন। শ্রীলঙ্কার কলম্বোতে অনুষ্ঠিত ‘এশিয়ান বডিবিল্ডিং অ্যান্ড ফিটনেস চ্যাম্পিয়নশিপ’-এ ৩১টি দেশের ২৮০ প্রতিযোগীর মধ্যে পঞ্চম।

 

►    ২০১৫ সালে এএফবিএফ (এশিয়ান ফেডারেশন অব বডিবিল্ডিং অ্যান্ড ফিটনেস) বডিবিল্ডিং চ্যাম্পিয়নশিপে ২১টি দেশের ২৫০ জন প্রতিযোগীর মধ্যে তৃতীয়।



মন্তব্য