kalerkantho


উদ্যমী বাংলাদেশ

রিকশা ছবির নয়া দুনিয়া

বান্দরবানের মেয়ে ড চিং চিং মারমা। রিকশাচিত্র ব্যবহার করছেন শাড়িতে, বোতলে, হারিকেনে বা টি-পটে। তৈরি করছেন রিকশা ছবির নয়া দুনিয়া। পিন্টু রঞ্জন অর্ক জেনে এসেছেন পেছনের গল্প

১১ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



রিকশা ছবির নয়া দুনিয়া

নিজের নকশা করা শাড়িতে ড চিং চিং

ইডেন কলেজের ইতিহাসের ছাত্রী ছিলেন ড চিং চিং। স্নাতক হয়েছেন ২০১১ সালে। স্নাতকোত্তর হতে আরো দুই বছর লেগে যায়। তারপর চাকরি খোঁজা শুরু করেন। কয়েক জায়গায় সাক্ষাৎকারও দিয়েছেন। কিন্তু চাকরি যেন সোনার হরিণ। এদিকে আবেদন ফি জমা দিতে দিতে পকেট গড়ের মাঠ। তাই একসময় রণেভঙ্গ দিলেন। ভাবলেন নিজেই একটা কিছু করবেন। প্রথম প্রথম পেপার কেটে শোপিস বানাতে লাগলেন। সেই সঙ্গে বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি থেকে আদিবাসী-গয়না জোগাড় করে সেগুলোর নকশা ভালো করে খেয়াল করলেন। তারপর নতুনরূপে (ফিউশন) গড়তে থাকলেন। ছবি তুলে পোস্ট দিতে থাকলেন নিজের ফেসবুক পাতায়। বন্ধুবান্ধবরা কিনত, উৎসাহও দিত।

 

রংতুলি সঙ্গী অনেক দিন

চাকরির ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে অফিসগুলোতে দেখেছেন কর্মকর্তারা পানি খেতে কাচের বোতলই বেশি ব্যবহার করেন। ভাবলেন, বোতলগুলোকে সাজিয়ে দিলে বেশ হয়। রিকশাচিত্র হতে পারে তার ভালো উপায়। তাই রাস্তায় রিকশাচিত্র দেখলেই মোবাইলে ছবি তুলে রাখতেন। ঘরে ফিরে খাতায়ও তুলতেন। বোতল কিনতেন নিমতলীর ভাঙ্গারির দোকান থেকে। শুরুতে হতে হতে তালগোল পাকিয়ে যেত। ড চিং চিং বললেন, ‘কাচের বোতলে লেগে থাকে এমন রঙের খোঁজ পাচ্ছিলাম না। পরিচিতরা যেগুলোর খবর দিয়েছিল সেগুলোয় ঠিক কাজটি হচ্ছিল না। দেখা যাচ্ছিল রং শেষ হয়ে যাচ্ছে; কিন্তু বোতল রেডি হচ্ছে না।

শেষমেশ রিকশা পেইন্টারদের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। তাঁরা পরামর্শ দিলেন অ্যানামেল পেইন্ট ব্যবহার করার।’ সেটা ২০১৫ সালের কথা। প্রথমবার নিমতলী থেকে ৫০টি বোতল এনেছিলেন। একেকটি বোতলের দাম পড়েছিল ৭০ টাকা। ২০টি বোতলে এঁকে পোস্ট দিয়েছিলেন ফেসবুক পাতায়। প্রথম দিনই ১০টি বিক্রি হয়ে যায়। একেকটি বোতল আড়াই শ টাকা করে। উল্লেখ্য, ছবি আঁকাটা আয়ত্তে এসেছিল তাঁর ছোটবেলায়ই। রংতুলি বলতে গেলে তাঁর সব বয়সের সঙ্গী।

পাইকপাড়ায় থাকতেন তখন

২০১৬ সালের ২৩ মে। মধ্য পাইকপাড়ায় থাকতেন ড চিং চিং। মিরপুর ১ নম্বরে একঘরের একটি ঘর ভাড়া নিলেন। দুজন কর্মচারীও নিলেন। এত দিন নিজের ফেসবুক পাতায় পোস্ট দিতেন; এবার ফিনারী (ঋরহবৎু) নামের একটি আলাদা পাতা খুললেন। এ পর্যায়ে কাচের বোতল ছাড়াও তাঁর ক্যানভাস হলো টি-পট, ট্রে, পানদান ইত্যাদি। পর্যায়ক্রমে কাপ-পিরিচ, গ্লাস, ফুলদানি, কলমদানি, ট্রাংক, গয়নার বাক্স, অফিস ফাইল, কুপি ইত্যাদিও সাজাতে থাকলেন। ভালো সাড়াও পেতে থাকলেন। কেউ কেউ বাড়িতে পুরনো ট্রাংক দিয়ে যেতে থাকল। টাকা-পয়সা রফা করে সেগুলোও সাজিয়ে দিলেন।

 

বিশ্বকাপ উপলক্ষ

গেল ফুটবল বিশ্বকাপ উপলক্ষে ড চিং চিং বোতলের গায়ে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের পতাকা ফুটিয়ে তুলেছিলেন। এ ছাড়া তাঁর আছে রাজা-রানি সিরিজ। বললেন, ‘এত দিন রিকশাচিত্রটা ছিল শুধু রিকশার পেছনে। আমি এই শিল্পকে সামনে নিয়ে এসেছি। মানুষের হাতে বা অফিস ডেস্কে এখন রিকশাচিত্র শোভা পাচ্ছে। এটাই আমার বড় প্রাপ্তি। এখানেই আমার আনন্দ।’ ঈদকে সামনে রেখে রিকশাচিত্র ফুটিয়ে তুলেছিলেন শাড়িতেও। বললেন, ‘এবারই প্রথম সুতি শাড়িতে হ্যান্ডপেইন্টের মাধ্যমে রিকশাচিত্র ফুটিয়ে তুললাম।’

 

আরো ড চিং চিং

আড়াই বছর বয়সী একটি মেয়ে আছে তাঁর। স্বামী-সন্তান সামলে বাকি সময়টা ফিনারীকেই দেন। একসময় চাকরির পেছনে ছুটেছেন, এখন নিজেই চাকরি দেন। তাঁর অধীনে কাজ করেন ১৫ জন। মিরপুর ১ নম্বরে একটি কারখানাও করেছেন। মাসে গড়ে ২০০ অর্ডার পান। অফিস ভাড়া, কর্মচারী বেতন সামলে হাতেও থাকে কিছু। বললেন, ‘আমার ব্যবসা মূলত অনলাইননির্ভর। নিমতলী থেকে পাইকারিতে বোতল কিনি। আর পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে আদিবাসী গয়না সংগ্রহ করি। এখান আমার সংগ্রহে ৩০টি আদিবাসী নকশা আছে।’

ফেসবুকে : finerydhaka/

 

হারিয়ে যেতে দিব না

ড চিং চিং মারমা

 

কিভাবে ব্যবসায় এলেন?

চাকরির পেছনে ছুটতে ছুটতে হয়রান হয়ে গিয়েছিলাম। ব্যাংক ড্রাফট থেকে শুরু করে সব কিছুতেই টাকা যাচ্ছিল অনেক। এক মাসে যদি দুটি চাকরির আবেদন করে থাকি তাতেও তিন হাজার টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছিল। আবার ঘুষটুষের ব্যাপার আছে। তাই নিজেই কিছু করতে চাইলাম।

 

শুরুতে পুঁজি কেমন ছিল?

শুরুতে হাতে বেশি টাকা ছিল না। মাত্র ৩০ হাজার টাকা দিয়ে শুরু করেছি।

 

পরিবার থেকে সাপোর্ট পেয়েছেন?

আমার স্বামী সব কিছুতেই আমাকে সাহায্য করেছে। এখন শ্বশুরবাড়ির অন্যরাও সহযোগিতা দেয়।

 

কোনো সমস্যায় পড়েছিলেন?

আমরা মারমা। শুরুতে ভাবনা ছিল আমাদের বিলুপ্তপ্রায় গয়নাগুলো সংরক্ষণ করার। এ জন্য জাদুঘরেও গিয়েছিলাম। চেয়েছিলাম সেখানে রাখা গয়নাগুলোর নকশা তুলে আনতে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ অনুমতি দেয়নি। চোখের দেখাটা দেখতে পেরেছি শুধু। তারপর বান্দরবানের কারিগরদের দিয়ে বানানোর চেষ্টা করেছি। ব্যাপারটি কঠিন ছিল।

 

আপনার ভবিষ্যৎ?

ব্যবসাটাকে ভালোমতো দাঁড় করাতে চাই। একটি ওয়েবসাইট করব। আমি চাই রিকশা পেইন্টিং, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর গয়না ইত্যাদি ধরে রাখতে। হারিয়ে যেতে দিতে চাই না। নব নবরূপে সেগুলো তুলে ধরতে চাই।

দেশে ও বিদেশে।



মন্তব্য