kalerkantho


ফেসবুক থেকে পাওয়া

কেন্দ্রীয় চরিত্র

২১ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



সেদিন পত্রিকায় আমার একটি ছোটগল্প প্রকাশিত হয়েছিল। গল্পের নারী চরিত্রের নাম ইরানী। এই নামে আমার এক সহপাঠী আছে। কিন্তু গল্পটিতে ইরানীর চরিত্রটি খুব একটা ফুটে ওঠেনি। গল্পটি ফেসবুকে শেয়ার করলাম। ইরানীকেও ইনবক্সে পাঠালাম। সঙ্গে সঙ্গে ওপাশ থেকে উত্তর এলো—

: এসব তুমি কী লিখেছ, হ্যাঁ?

: কেন, পছন্দ হয়নি তোমার?

: আমার কথা তো বেশি লেখোনি, তাই বলছি?

: ও আচ্ছা। আমি তো ভালো লিখতে পারি না। তাহলে আজ একটা গল্প লিখব কি? কেন্দ্রীয় চরিত্র তোমাকে দেব?

: হুম, লেখো। আমি আপলোড দেব ফেসবুকে। সবাই আমার কথা জানবে। আচ্ছা, তোমার না কালকে পরীক্ষা আছে?

: ও থাকুক পরীক্ষা, রাতে গল্প না লিখলে আমার পরীক্ষা ভালোই হবে না!

 সেদিন কথা আর এগোয়নি। চ্যাটিং বন্ধ করে ইরানীকে নিয়ে সত্যি সত্যি একটি গল্প লেখার চেষ্টা করি। কিন্তু কিছুতেই লিখতে পারছিলাম না। পরীক্ষার চিন্তা মাথায় ঢোকার কারণে অন্য কিছু ভাবতে বড় কষ্ট হচ্ছিল।

পরের দিন ক্যাম্পাসে যেতে যেতে ভাবলাম, ইরানীর সঙ্গে দেখা হলে কী বলব? ওকে নিয়ে আমি তো গল্প লিখতে পারিনি। পরীক্ষার হলে গেলাম। কিন্তু ইরানী তখনো এসে পৌঁছায়নি। ১২টা ৩০ মিনিট বাজতেই পরীক্ষা শুরু। কিন্তু ইরানী আসেনি। আমার এক বেঞ্চ পরের বেঞ্চটা এখনো ফাঁকা। সবাই লিখছে আর ওই বেঞ্চটার দিকে তাকাচ্ছে। আর আমি ভাবছি, ‘ইরানী এখনো এলো না কেন?’

পরীক্ষা শেষ করে অনেকেই ইরানীর অনুপস্থিতির বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে থাকে। ওর সঙ্গে যার যখন চ্যাটিং হয়েছে, সবাই তা বলাবলি করতে থাকে। আমার চ্যাটিংয়ের বিষয়টি আর বলা হয় না কাউকে। ইরানীকে নিয়ে গল্প লেখার প্রসঙ্গটি ভুলে তখন ভাবতে থাকি, ‘ও কেন আজ পরীক্ষা দিল না? এমন হওয়ার কথা ছিল না তো!’

আমাদের পরীক্ষার হল ছিল পাঁচতলায়। সবার আগে লিফট বেয়ে গ্রাউন্ড ফ্লোরে নেমে যাই। কাছে একটা ভিড় দেখলাম। এগিয়ে গিয়ে দেখলাম, একটা লাশ পড়ে আছে। পা দুটি শুধু দেখা যাচ্ছে। মুখটা দেখা যাচ্ছিল না। তারপর কয়েকজনকে অনুরোধ করে সামনে এগিয়ে গেলাম। তারপর যেন মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। দেখলাম, সমগ্র শরীরে ছোপ ছোপ রক্ত। রক্তে চুলগুলো ভিজে গেছে। সুঠাম দেহ যেন কুমড়ো পাতার মতো নুয়ে পড়েছে। হাতে এখনো এডমিট কার্ডের ফাইলটি রয়েছে। তিনটি কলম, একটি পেনসিল, স্কেল আর কয়েক শ টাকা। সবই আছে শুধু নেই ইরানী!

ঘটনাটি ঘটেছিল ১২টার পরে। দারোয়ান মামা কেঁদে কেঁদে বলছিলেন, ‘মেয়েটি বই পড়তে পড়তে হাঁটছিল। হয়তো পরীক্ষার টেনশন কাজ করছিল। পেছন থেকে দ্রুতগতির মোটরসাইকেল তার গায়ের ওপর চড়িয়ে দেয়। চাকায় পিষে যায় তার কোমল দেহ। ইরানীকে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত সেখানে ছিলাম। বারবার গতরাতের কথাগুলো মনে পড়ছিল। আমার গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র যে এভাবে বিদায় নেবে তা কে জানত?

 

মোহাম্মদ অংকন

কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ,

বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি (বিইউবিটি)।



মন্তব্য