kalerkantho


আরো জীবন

দারুশিল্পী বিবেকানন্দ

কাঠমিস্ত্রি বিবেকানন্দ মণ্ডল আসলে একজন শিল্পী। কাঠের ভাস্কর্য গড়েন। একদিন দেখে এসেছেন প্রসূন মণ্ডল

২১ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



দারুশিল্পী বিবেকানন্দ

বিবেকানন্দ মণ্ডল

দীনেশ চন্দ্র মণ্ডল গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার উজানী ইউনিয়নের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান। রবিবার তাঁর সঙ্গে দেখা হলো শহরে। কথায় কথায় তিনি বিবেকানন্দ মণ্ডলের কথা বললেন। বিবেকানন্দ কাঠ খোদাই শিল্পী। মহাপুরুষ ও দেব-দেবীর ভাস্কর্য তৈরি করেন। পরদিন সকাল-সকাল বেরিয়ে পড়ি। লোকাল বাসে করে সাতপাড় স্ট্যান্ডে গিয়ে নামি। ঘণ্টাখানেক সময় লাগে। তারপর একটি ভাড়ার মোটরসাইকেলে করে যাই উজানীর মাহাটালি গ্রামে। তখন সকাল সাড়ে ৯টা বাজে। গিয়ে দেখি বিবেকানন্দের উঠানে এক মিলনমেলা—কবি-সাহিত্যিক-রাজনীতিক-সমাজসেবী-ধর্মগুরু প্রমুখের। কাঠে দেব-দেবীর প্রতিমাও গড়েন বিবেকানন্দ। তিনি গড়েছেন গৌতম বুদ্ধ, কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব, লোকনাথ ব্রহ্মচারী, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু, স্বামী বিবেকানন্দ বা মাদার তেরেসার প্রতিকৃতি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার প্রতিকৃতিও গড়েছেন। এ ছাড়া শিবঠাকুর, দেবী সরস্বতী, মনসা দেবীর ভাস্কর্যও আছে তাঁর উঠানে।

 

প্রায় ৩০ বছর

স্বপ্ন ছিল লেখাপড়া শিখবেন। বড় একজন মানুষ হবেন। ১৯৭৫ সালে তার বয়স মাত্র ১০ বছর। চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী। বাবা বুদ্ধিমন্ত মণ্ডল পেশায় কৃষক। তাঁর একার পক্ষে পরিবারের খরচ চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। তাই সংসারের হাল ধরতেই কাঠমিস্ত্রির জোগালি (হেলপার) হিসেবে কাজে লেগে যান বিবেকানন্দ। শেখেন আসবাবপত্র তৈরির কাজ। এলাকায় তিনি এখন নামি মিস্ত্রি। তবে স্বপ্নটা পুরা হয়নি। তাই আসবাব গড়ার ফাঁকে কাঠ খুঁড়ে ভাস্কর্য তৈরি করে চলেন। ৩০ বছর হবে প্রায়।

 

বিবেকানন্দের সংসার

গীতা রানী মণ্ডল বিবেকানন্দের স্ত্রী। বলছিলেন, আমাদের পাঁচজনের সংসার। আমরা স্বামী-স্ত্রী আর দুই মেয়ে ও এক ছেলে। ভিটা ছাড়া কোনো জমি নেই। বড় মেয়েকে লেখাপড়া শেখাতে পারিনি। আগেই বিয়ে দিয়ে দিয়েছি। ছেলে বিভাষ মণ্ডল ফরিদপুর পলিটেকনিক থেকে ডিপ্লোমা কোর্সে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েছে। এখন বিএসসি করার জন্য ঢাকায় কোচিং করছে। ছোট মেয়ে গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধু কলেজে ইতিহাসে স্নাতক। তাঁরও বিয়ে হয়ে গেছে।

সংসার আর লেখাপড়ার খরচ জোগাতে তিনি (বিবেকানন্দ) হিমশিম খান। এলাকায় সব সময় কাজ থাকে না। তখন এদিক-ওদিক যান কাজ জোগাড় করতে। রাতেই বেশি মূর্তি (ভাস্কর্য) গড়েন, দিনে তো আর সময় বেশি পান না।

বিবেকানন্দ বললেন, ‘কোনো কোনো দিন তো অন্যের জমিতে কাজ করি। রাতে যখন সময় পাই তখনই এগুলো (ভাস্কর্য) বানাই। এগুলো বিক্রির টাকা থেকেই ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালাই। অভাবের সংসার, মন দিয়ে কাজও করতে পারি না। বঙ্গবন্ধুর একটি ভাস্কর্য তৈরি করেছি। প্রধানমন্ত্রীরও (শেখ হাসিনা) একটি। এগুলো নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বাড়ি গিয়েছিলাম। কিন্তু ঢুকতে পারিনি। ইচ্ছা ছিল, প্রধানমন্ত্রীকে এগুলো দিয়ে অভাব-অনটনের কথা কিছু বলব।’

 

বিবেকানন্দের রথ

বিবেকানন্দের গড়া দেব-দেবীর ভাস্কর্য ভারতের কিছু মন্দিরেও আছে। গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার ফেলারাম পাগলের মন্দিরের তিনি দেড় শ মূর্তি বানিয়েছেন। এখন বানাচ্ছেন নিত্যানন্দ ধামের জন্য একটি রথ। এটি বাগেরহাট জেলার চিতলমারী উপজেলার পিঁপড়ারডাঙ্গা গ্রামে। রথটিতে ২০টি দেব-দেবীর মূর্তি থাকবে।

দীনেশ চন্দ্র মণ্ডল বললেন, এলাকায় তিনি কাঠমিস্ত্রি বলে পরিচিত। কিন্তু তাঁর শিল্পীমন আছে। তাঁর তৈরি ভাস্কর্যগুলো খুব সুন্দর। কিন্তু তাঁর দিন আনি দিন খাই অবস্থা। কর্তাব্যক্তিরা এগিয়ে এলে বিবেকানন্দ বড় কিছু করে দেখাতে পারেন।

গোপালগঞ্জ বিসিক শিল্পনগরীর সহকারী মহাব্যবস্থাপক সরোয়ার হোসেন বললেন, বিবেকানন্দ একজন গুণী কারুশিল্পী। তিনি জাতীয় কারুশিল্প প্রদর্শনীতেও অংশ নিয়েছেন। তাঁকে কিছু প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহযোগিতা দিলে বড় মাপের শিল্পী হয়ে উঠবেন।’ 

 

ছবি : লেখক



মন্তব্য