kalerkantho


মন্টুর বাতি

শহরে বড়জোড় বাদামওয়ালার কাছে এখন কুপিবাতি দেখার সুযোগ মিলতে পারে। একদিন তো বাড়ি বাড়ি কুপিবাতি রাখার আলাদা জায়গাই থাকত। নাজমুল হক মন্টু মনে রেখেছেন। সংগ্রহ করে বেড়াচ্ছেন কুপিবাতি। বিনয় দত্ত তাঁর দেখা পেয়েছিলেন

২১ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



মন্টুর বাতি

মন্টু হারিয়েছেন অনেক কিছু। ভাড়াবাসায় থাকতেন। বাসা বদলের সময় এটা বেশি ঘটত। কুপি ছাড়াও আরো অনেক কিছুরই সংগ্রহ ছিল তাঁর। যা হোক, এখন মিরপুরে নিজেদের বাড়ি। বাড়িটিতেই মন্টুর সংগ্রহশালা।

 

একটা অভিযান

সংগ্রহের ঝোঁক মন্টুর ছোটবেলা থেকেই। স্কুলের বার্ষিক প্রদর্শনীতেও দুর্লভ জিনিস প্রদর্শন করতেন। একবার পুরস্কারও জিতেছিলেন। সংগ্রহ করতেন নানা কিছুু। শেষে কুপির দিকেই নজর দিলেন বেশি। মন্টুদের গ্রামের বাড়ি পাবনায়। প্রতিবারই কোরবানির ঈদে যান। গেছেন সেবারও। কোরবানির গরু কেনা হয়ে গেছে। হাতে সময় আছে কিছু। ঘুরতে ঘুরতে পুরনো মাটির হাঁড়ি-পাতিলের দোকানে গেলেন। গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, মাটির কুপিবাতি আছে? দোকানি বেশি আগ্রহ দেখালেন না। বললেন, ওই দিকটায় খুঁজে দেখুন। পেতেও পারেন।

মন্টু মাটির জিনিসের স্তূপটির দিকে এগিয়ে গেলেন। অনেকক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর পেয়েও গেলেন একটি কুপিবাতি। এত খুশি হলেন যেন তিনি কলম্বাস, ডাঙ্গা পেয়েছেন দীর্ঘ জলযাত্রা শেষে। এমন ঘটনা তাঁর জীবনে অনেক।

 

একজন বিশেষ

ইয়ার মোহাম্মদ সানি। পুরান ঢাকার মানুষ। কাঁসা-পিতলের ব্যবসা করেন। মন্টু তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ। সানি যখনই বিশেষ কিছুর সন্ধান পান, মন্টুকে খবর পাঠান। কুপিবাতির খবর পেলে তো কথাই নেই। দেরি সয় না মন্টুরও। খবর পেলেই ছোটেন। মন্টুর সখ্য আছে আরো এমন কয়েকজনের সঙ্গে। কুপি দেখলে তাঁরা মন্টুকে খবর পাঠান বা লোক মারফত পৌঁছে দেন।

কুপির রকমফের

একেক সময়ের কুপি একেক রকম। আবার ঘরে ব্যবহারের এবং নৌকায় ব্যবহারের কুপি আলাদা। কুপির ধরনি, গলা বা মাথায় পরিবর্তনটা বেশি চোখে পড়ে। অনেক সময় পুরোটাই ভিন্ন। গৃহস্থালি কুপিরও আবার নানা রকম হয়। শোয়ার ঘর আর রান্নাঘরের কুপি যেমন আলাদা। মন্টু দাবি করেন, ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত প্রায় সব রকম কুপি তাঁর সংগ্রহে আছে। সংখ্যাটা দুই শ ছাড়াবে। গৃহস্থালি, নৌকা থেকে শুরু করে দোকানের কুপি, বিচার-সালিসের কুপি, শৌখিন কুপিও আছে তাঁর সংগ্রহে। ভিন্নতা আছে কুপি তৈরির উপকরণেও। কিছু যেমন মাটির। এ ছাড়াও আছে পিতলের, টিনের, তামার, জার্মান সিলভারের, ব্রোঞ্জ ও কাচের তৈরি কুপি। তবে তামা, জার্মান সিলভার, ব্রোঞ্জ ও কাচের তৈরি কুপি দেখতে সুন্দর হয় বেশি। কুপির নকশাও দেখার মতো। অনেক রকম নকশা হয়—বিমানমতো, স্টিমারমতো, কামরাঙা আকৃতির, বাল্বমতো বা চায়ের কেটলির মতো। জগ আকৃতির, মাছ আকৃতির কুপিও দেখবেন মন্টুর কাছে। এসব কুপি সাধারণত শৌখিন লোকে ব্যবহার করত। কুপির সলতেয় কাপড় বা দড়ি ব্যবহার করা হয়। কুপির জ্বালানি হিসেবে প্রাণীর চর্বি, কেরোসিন তেল ব্যবহার করা হতো। মজার ব্যাপার হলো, কুপির সলতেতেও অনেক রকম নকশা লক্ষ করা যায়।

 

মন্টু কিছু বললেন

বৈচিত্র্য বেশি দেখি ধরনিতে (কুপি ধরার জায়গায়)। চাবির রিঙের মতো গোল ধরনি হয় বেশি। এগুলোর কোনোটি এক আঙুল দিয়ে ধরার মতো গোল। কোনোটির ভেতর আবার দুই আঙুলও ঢোকানো যায়। ইংরেজি এস অক্ষরের মতো ধরনিও আছে। কিছু কুপির ধরনি দেখি চামচের মতো। কিছুু কুপিতে আবার ধরনিই নেই। অনেক কুপিতে নাম খোদাই করা থাকত। পিতলের কুপিগুলোতেই এটা বেশি দেখি। এর ফলে হারিয়ে যাওয়া ঠেকানো যেত।

 

ছেলেরাও আগ্রহী

পেশায় ব্যবসা। স্ত্রী সাদেকা খাতুন এবং দুই সন্তান তাহমিদ মুশফিক ও তানজীম সালেহ। ছেলেরা আর স্ত্রীও তাঁর সংগ্রহের প্রতি খেয়াল রাখে। ছেলেরা পালা করে কুপিগুলো পরিষ্কার করে, যত্ন নেয়। মন্টুর স্বপ্ন, পাবনায় একটি জাদুঘর করবেন। কুপির জাদুঘর।

ছবি: লেখক

 

 

 

একজন নাজমুল হক মন্টু

পাবনার নয়নামতি গ্রামে জন্ম ও বেড়ে ওঠা। ছয় বছর বয়সে মাকে হারিয়েছেন। মামির কাছে বড় হয়েছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি ছবিও আঁকতেন। মাটির খেলনাও বানাতেন। স্কুলে স্কাউট ও রেডক্রস সোসাইটির সদস্য ছিলেন।

 


নতুন প্রজন্মের জন্য ভেবেছি  

নাজমুল হক মন্টু

কুপির প্রতি আগ্রহ তৈরি হলো কিভাবে?

ছেলেবেলায় কুপির আলোয় পড়তাম। শিল্পীদের দাদাবাড়ি, নানাবাড়ি মিলিয়ে বেশ কয়েক রকম কুপি দেখা হয়ে গিয়েছিল। টিনের কুপি দেখেছি বেশি, কাচের কুপিও দেখেছি। কুপির নকশাও আমাকে আকৃষ্ট করত। পরে বড় হয়ে দেখলাম এগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। ভাবলাম, নতুন প্রজন্মের জন্য সংগ্রহ করে রাখি।

 

প্রথম কুপিবাতিটি ঠিক কবে সংগ্রহ করেছিলেন?

২০০১ সালে প্রথম বাতিটি সংগ্রহ করি। সেটি ছিল পিতলের তৈরি। অনেক সুন্দর দেখতে। সম্ভবত ব্রিটিশ আমলে তৈরি।

 

কুপিবাতির ইতিহাস কিছু জানাতে পারেন

প্রাচীন মিসর ও গ্রিসে কুপিবাতির ব্যবহার ছিল। জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হতো পশুর চর্বি। কুপি ব্যবহার করত রোমানরাও।   পরের দিকের ইউরোপে এক ধরনের বাতির চল হলো, যেগুলোকে লোকে বলত তেলের বাতি। আকারে বেশ বড় হতো। এ বাতি আমার সংগ্রহেও আছে।

 

টিনের, কাচের, তামা বা পিতলের কুপি কি আলাদা সময়ের?

মোগল আমলের শেষ দিকে পিতলের কুপিবাতির ব্যবহার ছিল বলে জেনেছি। তামার কুপিও ব্যবহৃত হতো সে সময়। তবে বেশি ছিল পেটানো পিতলের কুপির ব্যবহার। মোগল আমলে যেসব ব্যবসায়ী বা পর্যটক এসেছিল তাদের কাছে কুপিও ছিল। জার্মান সিলভারের কুপি হয়তো তারা এনে থাকবে। পঞ্চাশ বা ষাটের দশকে ভারতবর্ষে গ্লাস প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কাচের কুপি তৈরি করেছিল। শৌখিন লোকজন অবশ্য আগে থেকেই বিলাতি কাচের কুপি ব্যবহার করত। ষাট ও সত্তরের দশকে টিনের কুপিতে সয়লাব ছিল বাজার। এগুলো অল্প পয়সায় মিলত। মাটির কুপির ব্যবহার অবশ্য বেশ পুরনো।  মহাস্থান আর পাহাড়পুরের প্রত্নখননেও মাটির কুপি পাওয়া গেছে।

 

কুপি, পিদিম আর পিলসুজ কি আলাদা?

কুপি আর পিদিম কাছাকাছি। পিলসুজ হলো প্রদীপ রাখার জায়গা। লম্বা হয়। একে গাছাও বলা হয়। কুপি জ্বালানো হয় কেরোসিন তেল দিয়ে। পিদিম বা প্রদীপ জ্বালানো হয় সরিষার তেল বা ঘি দিয়ে।



মন্তব্য