kalerkantho

বিস্ময় বাংলা

অবাক বকর

১৪ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



অবাক বকর

মায়ায় পড়ে গেছেন আবু বকর ছিদ্দিক। নিজের শরীরের ওম দিয়ে পাখির বাচ্চা ফোটান। বিশেষ করে কুড়া পাখির বাচ্চা। এই পাখিটা ডিম দিয়েই পালায়, বাচ্চা ফোটানোর দায় নেয় না। তিন যুগ ধরে এ কাজ করছেন আবু বকর। এটি তাঁর আয়েরও উপায়। দেখে এসেছেন আলম ফরাজী

 

আবু বকরের বাড়ি ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার আচাগাঁও ইউনিয়নের ধরগাঁও গ্রামে। বয়স পঞ্চাশ ছাড়াবে। তাঁর দুই ছেলে দুই মেয়ে। বড় ছেলে কাঠমিস্ত্রি আর ছোটটি রাজমিস্ত্রি। মেয়ে দুজনকেই বিয়ে দিয়েছেন। তাঁর বাবা ইয়াকুব আলী মারা গেছেন চার বছর আগে। বাবারও পাখির নেশা ছিল।

 

এক বৈশাখ মাস ছিল

বাড়ি থেকে অল্প দূরেই বিল। মাছ ধরতে গিয়েছিলেন আবু বকর। আধা কাটা একটা ধানক্ষেতে সাদা একটি ডিম পড়ে থাকতে দেখেন। ডিমের চিড় ধরেছিল। একটা বাচ্চা বেরোনোর চেষ্টায় ছিল। কিন্তু বাচ্চাটি পুষ্ট ছিল না। তিনি সঙ্গে সঙ্গে ডিমটি নিয়ে বাড়ি আসেন। বালিশ থেকে তুলা বের করে তার ওপর ডিমটি রাখেন। তারপর তুলাসমেত ডিমটি রাখেন নিজের পেটের ওপর। একদিন বাদেই পরিপূর্ণ বাচ্চা বের হয়ে আসে। এরপর সেটিকে লালনপালন করতে থাকেন আবু বকর। একদিন সেটি প্রাপ্তবয়স্ক হয়। সেটি একটি জলমোরগ। কুড়া নামেই ডাকে বেশি লোকে। আবু বকর জানতে পারেন, পাখিটি বিলুপ্ত প্রায়। 

 

তারপর থেকে

বিলে, ধানক্ষেতে ডিম খুঁজে বেড়ান আবু বকর। অন্য লোক কুড়িয়ে পেলে তাঁর কাছ থেকে কিনেও আনেন। তারপর নিজের শরীরের তাপ দিয়ে বাচ্চা ফোটাতে শুরু করেন। খুব সহজ-সরল মানুষ আবু বকর। গাঁয়ের লোকের তাকে নিয়ে কৌতূহলের শেষ নেই। কিন্তু তাঁর কোনো হেলদোল নেই। অনেকে বাচ্চা ফোটানোর কৌশল শিখতেও এসেছিল। কিন্তু আবু বকর নিজেই তো জানেন না কিভাবে কী হয়। বলেন, ‘আমি ডিমগুলোর যত্ন করি। পাখিগুলো যত্ন করি। বাপ-দাদারও পাখির নেশা ছিল।’ তিনি জানান, কুড়ার ডিম এক হালি হাজার থেকে পনেরো শ টাকা দাম হয়।

 

যেভাবে পেটে ধরেন

নারকেলের আচির ভেতর শিমুলের তুলা সেট করেন প্রথমে। তারপর ডিম রাখেন। পরে একটি নতুন গামছায় আচিটি মুড়িয়ে নিজের পেটে বাঁধেন। শুধু গোসল করার সময় খুলে রাখেন। রাতে ঘুমানোর সময়ও ডিম তাকে পেটে বহন করতে হয়। ৯ থেকে ২১ দিন রাখার পর কুড়া পাখি জন্ম নেয়। তিনি বলেন, এক হালি ডিম থেকে বড়জোড় ২টা বাচ্চা পাই।’  মাছ, ধান বা জলজ পোকা খেয়ে বাঁচে কুড়া। বর্ষায় দেখা যায় ধানক্ষেতের ধারে। এটা তাদের প্রজনন মৌসুম। ধানক্ষেতে লতাপাতা দিয়ে বাসা বোনে। বছরে একবার ডিম দেয় জলমোরগ। আকারে বেশি বড় না হলেও এদের ডাক শোনা যায় অনেক দূর থেকেও। টুবটুব ডাকে। দীর্ঘক্ষণ একটানা। তবে মানুষের আনাগোনা টের পেলেই ডাক বন্ধ করে দেয়। দ্রুত পালায়। এদের শরীর ছাই রঙা। পা দুটি বেশ লম্বা হয়, রং হয় হলুদ। ঠোঁটেও হলুদ দেখা যায়। মাথার ওপর লাল ঝুঁটি আছে।

 

আবু বকরের স্ত্রী

রহিমা বেগম আবু বকরের স্ত্রী। পেটে পাখির বাচ্চা তা দেওয়া তাঁর পছন্দ নয়। বলেন, এইটা তারার (বাপ-দাদা, আবু বকর) নেশা। ঘরের প্রতি তাগের মায়া নাই কিন্তুক পাখির লাগি মায়া। বলুক তো নিজের সন্তানরে এভাবে পালছেনি?’  না, আবু বকরকে এই কাজ থেকে ফেরানো যায়নি। সকাল হলেই পাখিদের খাবার জোগাড় করতে বিলে চলে যান একটা ছোট জাল নিয়ে। ছোট ছোট মাছ বাড়িতে এনে নিজেই খুঁটে খুঁটে পাখিদের খাওয়ান।

 

এলাকার লোক

এলাকার লোক বলে, আবু বকর সোজা মানুষ। কোনো দিন কারুর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেনি। তাঁর বাবাকে সবাই চিনত পক্ষী ইয়াকুব নামে। এখন তাঁদের বাড়ির নামটিই হয়ে গেছে পক্ষীবাড়ি। বকর বলেন, মায়ায় পইড়া এই কাজ করতাছি। এই পক্ষীডা (কুড়া পাখি) একসময় সব জায়গায় দেহা যাইত। অহন আর চোখে পড়ে না। মাঝেমধ্যে বিলের পাড়ে ও ধানক্ষেতের মধ্যে দেহা যায়। পরে খোঁজ নিলে দুই-চারটা ডিম পাওয়া যায়। হেই ডিমগুলো টুহাইয়্যা আইন্যা আমার শইলও তাও (তাপ) দেই। পরে বাচ্চা অইলে তারে সন্তানের মতন পালি (লালন পালন)। বড় অইলে এইডা ময়ূরের মতন দেহা যায়। খুব সৌন্দর্য লাগে। এই সন্দর দেইখ্যা অনেকেই কিইন্যা নেয়।’

 



মন্তব্য