kalerkantho


আজ অতীত

টিভি অ্যান্টেনা

১৪ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



টিভি অ্যান্টেনা

বেশি দিন নয়, দুই-আড়াই দশক আগের কথা। লম্বা একটি বাঁশের মাথায় বাঁধা থাকত টিভি অ্যান্টেনা। স্মৃতির ঝাঁপি খুলেছেন মাসুম সায়ীদ

 

অ্যান্টেনা কাণ্ড ১: মোল্লাবাড়ি

১৯৯০ সাল। জুন কী জুলাই মাস। রাত পৌনে ১২টা। গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি। দক্ষিণ পাথালিয়ার মোল্লাবাড়ির আঙিনা লোকে লোকারণ্য। সারা গাঁয়ের ছেলে, বুড়ো, জোয়ান—বৃষ্টি মাথায় করেই হাজির। আর্জেন্টিনার খেলা। ম্যারাডোনা আজ খেলবেন। জাদু দেখার অপেক্ষায় সবাই। গাঁয়ে একটিমাত্র টিভি। তাও সাদা-কালো। একে তো আবহাওয়া খারাপ। তাও আবার অ্যান্টেনাটা পুরনো। ঝিরিঝিরি টিভি স্ক্রিনে ছবি কখনো আসে কখনো আবার আসে না। অগত্যা টিভির মালিক তোফাজ্জল হোসেন আদেশ দিলেন বাঁশ তুলে অ্যান্টেনা নামাতে। সঙ্গে সঙ্গে নেমে পড়ল কয়েকজন। লম্বা ভারী বাঁশটা নেমে গেল হাতে হাতেই। দুজন দৌড়ে গেল বাড়ির ভেতর। নিয়ে এলো একটি অ্যালুমিনিয়াম পাত্র। অ্যান্টেনায় জুড়ে দেওয়া হলো গুণা দিয়ে। তারের মাথাটাও খুলে লাগানো হলো ভালো করে। বাঁশ আবার খাড়া হলো। অ্যান্টেনা উঠে গেল গাছগাছালির ওপর। চালু করা হলো টিভি। একঝলক ছবি এসেই মিলিয়ে গেল আবার। আবার ঝিরঝির। দুজন গিয়ে বাঁশটাকে একটু ডানে-বাঁয়ে ঘোরাতেই চলে এলো ছবি। খেলা শুরু হয়ে গেছে ততক্ষণে। উল্লাসে চিৎকার করে উঠল সবাই। সহসা আবার দেখা দিল বিভ্রাট—টিভি ঝিরঝির করছে আবারও। অ্যান্টেনার বাঁশের কাছে ছুটে গেল দুজন। একটু এদিক-ওদিক করতেই আবার স্পষ্ট হয়ে গেল। কিন্তু বাঁশটা ছেড়ে দিলেই ঘটে বিঘ্ন। অগত্যা জনতার রায়—বাঁশ ধরে বসে থাকার। যুবক দুটি বিনা বাক্য ব্যয়ে পালন করল নির্দেশ।

 

অ্যান্টেনা কাণ্ড ২: মধ্যবাড়ি

মধ্যবাড়ির জামশেদ ধনী লোক। ধানের গোলায় কয়েক শ মণ ধান। সবচেয়ে বড় তাদের গোয়ালঘর। বড় ছেলে শামছুর ঝোঁক চাপল টিভি কেনার। পরের দিন ছিল হাটবার। বাড়ির পাঁচজন কামলা ধানের বস্তা মাথায় হাটে গেল বারকয়েক। পরের দিন বেলাবেলিই চলে এলো টিভি। কামলারা ব্যস্ত হয়ে ছুটে গেল বাঁশঝাড়ে। সবচেয়ে লম্বা আর তীরের মতো সোজা একটা বাঁশ নিয়ে এলো কেটে। শামছুর চাচাতো ভাই সাঈদ বেশ করিৎকর্মা। সে এরই মধ্যে জুড়ে ফেলেছে অ্যান্টেনা। বাক্সের গায়ে ছবি দেখে দেখে। তারপর ধরাধরি করে সবাই খাড়া করে দিল বাঁশটা। দুয়ারের এক পাশে। এরই মধ্যে জড়ো হয়েছে সারা গাঁয়ের লোক। সেন্টার খোলে নাই এখনো। টিভির একটা ছবি উঠে আছে স্ক্রিনে। আর পো পো শব্দ। ছবির আশায় লোকেরা ঘাড় কাত করে বারবার তাকায় বাঁশের ডগায় অ্যান্টেনাটার দিকে।

 

অ্যান্টেনা কাণ্ড ৩ : দাপনাজুরের সৈয়দবাড়ি

সবার মধ্যে আজ অন্য রকম এক উত্তেজনা। বাড়িতে টিভি আসবে। দুপুরের পর ঘাটে নৌকা ভেড়ে। তিনটি বাক্স নামে নৌকা থেকে। দুজন লোকের মাথায় দুটি। আর বাবার হাতে একটি। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছোট্ট লিপি দৌড়ে গিয়ে ধরে বাবার হাত। এরই মধ্যে জড়ো হয়েছে অনেক লোক। বড়টা থেকে বের হলো ২৪ ইঞ্চি ন্যাশনাল সাদাকালো টিভি। মাঝারিটায় ব্যাটারি। আর বাবার হাতের লম্বা বাক্সটায় কতগুলো কাঠি। তাই নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন বড় ভাইয়েরা।  কাঠিগুলো শোলার মতো দেখতে। দুই মাথায় প্লাস্টিকের ছিপি। একটা আবার অন্য রকম। কাঠির মতো খণ্ড নয়। গোল মতো। মেজ আর সেজ ভাই লম্বা কাঠিটার সঙ্গে আড়াআড়ি একটার পর একটা জুড়ে দিতে থাকলেন ছোট কাঠিগুলো। মাঝের দিকে সিঁদুরের কৌটার মতো ঢাকনা ওয়ালা একটা ডিব্বা। সেটার সঙ্গে জুড়ে দিলেন তারের দুই মাথা। তারপর লম্বা একটা তল্লাবাঁশের আগায় বেঁধে কয়েকজন মিলে বাঁশটা দাঁড় করানো হলো। আর বাঁশের গোড়াটা হালকা করে পুঁতে দেওয়া হলো বড় ঘরের কোনায়। সব কাজ শেষ হতে আধ ঘণ্টাও লাগল না। বারান্দায় ছোট একটা টেবিলের ওপর রাখা হয়েছে টিভিটা। তার নিচেই ব্যাটারি। সবাই জায়গা নিয়ে বসে আছে ওটার সামনে। অপেক্ষা বিকেল চারটা বাজার। ছোট্ট লিপি কিন্তু বসে নেই। টিভি নয় লম্বা বাঁশের মাথায় বাঁধা অ্যান্টেনাটাই তাকে টানছে বারবার। সে দেখছে ঘুরেফিরে বারবার আকাশের দিকে মুখ তুলে। সেই দিনের পর থেকে সৈয়দবাড়ি আরেকটু বিশেষ হয়ে উঠল। অ্যান্টেনা দেখে দূর থেকেই লোকে বুঝত—‘এ বাড়িতে টিভি আছে!’ সেই ১৯৮১ সালের কথা। সালটা লিপির মনে আছে একটা ঘটনায়। টিভি কেনার তিন-চার দিন পর রাত সাড়ে ৮টার সংবাদে প্রচারিত হয়েছিল প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের খবর। লিপির আরো মনে পড়ে, ঝড় এলেই অ্যান্টেনা হেলে পড়ত। না হয় ভেঙে পড়ত বাঁশ। বাতাসে দুলে উঠলেও ঝাপসা হয়ে যেত ছবি। নাটক শুরু হয়ে গেছে অথচ ছবি ঝাপসা। কেউ একজন বের হয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ঠিক করছে।

 

অ্যান্টেনা কাণ্ড ৪ : টাঙ্গাইল সদর

১৯৮৪ সালের কথা। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হজরত আলী মুক্তাগাছা থেকে বদলি হয়ে এসেছেন টাঙ্গাইল শহরে। শহরের ব্যাপারিপাড়ায় তিনতলা একটা বিল্ডিংয়ের নিচতলায় নিয়েছেন বাসা। তাঁর দুটি মেয়েই বেশ ছোট। তারা প্রায়ই বায়না ধরে টিভি দেখার। তাই খোঁজ-খবর করে একটা পুরনো সাদাকালো টিভি কিনে আনলেন ঘরে। তবে অ্যান্টেনাটা নতুন। বাজার থেকে একখণ্ড বাঁশও এনেছেন কিনে অ্যান্টেনাটা বাঁধার জন্য। বাঁশ আর তার সমেত অ্যান্টেনা নিয়ে তিনি উঠে গেলেন ছাদে। ঢাকার দিকে লম্বা করে অ্যান্টেনা রেখে বাঁশটা বেঁধে তারটা ফেলে দিলেন ছাদ থেকে। তারপর নেমে এসে ভেন্টিলেটরের ফুটো দিয়ে তারটা নিয়ে এলেন ঘরে। টিভির সঙ্গে জুড়ে দিয়ে অন করলেন সুইচ। না, পরিষ্কার নয়। ঝিরঝির করে ফেটে যাচ্ছে ছবি। তিনি আবার গেলেন ছাদে। নিচে বাসার সামনে জানালার পাশে রইল বেড়াতে আসা ছোট ভাই জলিল। আর স্ত্রী সুফিয়া টিভির সামনে। ওপরে হজরত আলী অ্যান্টেনা ডানে-বামে ঘুরায়। ছবির অবস্থা সুফিয়া বেগম জানায় তার দেবর জলিলকে। আর জলিল মুখ উঁচিয়ে যথাসম্ভব জোরে সে কথা জানিয়ে দেয় ওপরে। অনেক কসরতের পর ঠিক হয় ছবি। নিচে এসে মেয়েদের ডগমগ মুখ দেখে ভরে যায় হজরতের বুক।

ছবি : সংগৃহীত



মন্তব্য