kalerkantho


আরো জীবন

লঞ্চ সারেং

১৪ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



লঞ্চ সারেং

মাঝবয়সী লঞ্চ সারেং হুমায়ুন কবির। নরসিংদী লঞ্চঘাটে তাঁর সঙ্গে গল্প করে এসেছেন রায়হান রাশেদ

 

হুমায়ুন কবিরের জন্ম পটুয়াখালীর বাহুবল থানার ঘুরচাকাঠি গ্রামে। গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে গিয়েছিলেন কিছুদিন। সংসারের অভাব তাঁকে বেশি পড়তে দিল না। লঞ্চে করে ঢাকায় গেলেন। লঞ্চটা তাঁর মনে ধরে গেল। ভাবলেন, লঞ্চ চালানো শিখবেন। চাচাতো ভাইকে বললেন ইচ্ছার কথা। ভাই তাঁকে সুনামগঞ্জ নিয়ে গেলেন। সেখানে লঞ্চে একটা কাজ পাইয়ে দিলেন। হেল্পার হলেন হুমায়ুন। বেতন বেশি না। কাজ হলো জেটিতে কাছি (মোটা রশি) বাঁধা ও খোলা। কয়েক বছর এভাবে গেল। তাঁর বয়স তখন আঠারোর ধারে-কাছে। ওস্তাদ পেলেন সুনামগঞ্জেরই আব্দুল মান্নান মাস্টারকে। মাস্টার তাঁকে স্নেহ করতেন। যত্ন করেই লঞ্চ চালানো শিখিয়েছেন হুমায়ুনকে। বেশি দিন লাগেনি সবটা শিখে উঠতে। ২০০৩ সাল থেকে হুমায়ুন লঞ্চের সারেং বা চালক। সুরমা নদীতে চালানো শুরু। লঞ্চ নিয়ে মোহনগঞ্জ, মধ্যনগর বা ছাতক ঘুরতেন।

 

নরসিংদীতে হুমায়ুন

২০০৫ সালে আসেন নরসিংদী এক বন্ধুর মারফত লঞ্চ চালানোর কাজ নিয়েই। মাইনে বেশি। রুটের (চলাচল পথ) নাম ছলিমগঞ্জ টু নরসিংদী। প্রতিদিন ডাবল ট্রিপ—একবার যাওয়া, একবার আসা। এখানকার মেঘনা মোটামুটি বড়। পানি টলটল করে। হুমায়ুন বললেন, ‘আগে লঞ্চের কাজ ভালোই ছিল। অনেক রকম লোকের চলাচল ছিল লঞ্চে—গৃহবধূ, শিক্ষক, মজুর, ভিক্ষুক, বীমাকর্মী, বড়লোক, মানে অনেক রকম লোক। অনেক কথাবার্তা, চেনা-জানা। এখন এই রুটে স্পিড বোট চলে। অনেকে বোটেই চলে যায়। তাই ঘাটে লোক আগের মতো অপেক্ষা করে না। আগে ভাড়াও উঠত বেশি।’

 

এমএ অগ্রদূত

সারা দিন পানির ওপরই কাটে হুমায়ুনের। লঞ্চেই শোবার ছোট্ট ঘর। খাবারও রান্না হয় লঞ্চে। নামাজের আলাদা জায়গা আছে। মাঝেমধ্যে চা খেতে বাজারে যাওয়া পড়ে। ছুটিও বেশি মেলে না। হুমায়ুন যে লঞ্চটি চালান তার নাম এমএ অগ্রদূত। লঞ্চটি দোতলা। দোতলায় ভাড়া বেশি। নিচতলায় কম। দোতলায় নরসিংদী থেকে ছলিমগঞ্জের ভাড়া ৭৫ টাকা। অগ্রদূতে স্টাফ কেবিন আছে তিনটি। পুরুষ, মহিলা ও স্টাফদের আলাদা তিনটি বাথরুম আছে। চা, বিস্কুট, চিপস, ঝালমুড়ির ফেরিওয়ালা প্রায় সময়ই লঞ্চে পাওয়া যায়।

 

মাঝেমধ্যে মন ছোটে

১৮ বছর ধরে সারেং হুমায়ুন কবির। আগের মতো সম্মান নেই। বলছিলেন, ‘ডেকে কেউ কথাও বলে না, চা খাওয়ানো তো পরের কথা। মাঝেমধ্যে ইচ্ছা হয় চাকরি ছাড়ি। কিন্তু অন্য কাজ তো জানি না। যদিও অনেকটা পথ খাল ধরে চলতে হয়, তবু ঝড়ের সময় ভয় করে। খালগুলোতে কচুরিপানারও ভিড়। ওসব জায়গায় লঞ্চ চালাতে কষ্ট হয়। তখন বসার উপায় নেই। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হুইল ঘোরাতে হয়। কোমরে ব্যথা ধরে।’

 

বাড়িফেরা

হুমায়ুন নরসিংদী আছেন ১৩ বছর হয়। তিন মাস পর পর বাড়ি যাওয়ার সুযোগ পান। তখন খুব আনন্দ হয়। ছেলে-মেয়ে, মা-বাবার জন্য কিছু না কিছু নিয়ে যান। তবে ঈদে ছুটি পান না। তখন টাকা পাঠিয়ে দেন। কবির বলেন, ‘ঈদে বাড়ি যেতে মন চায়। বউ-বাচ্চা ফোন দিয়ে কাঁদে। আমার লঞ্চে করেই তো ছলিমগঞ্জের লোক ঈদ করতে যায়। তখন আমার মনে হয়, সব ছেড়েছুড়ে বাড়ি চলে যাই। কিন্তু ছুটি পাই না। ঈদে যাত্রী হয় অনেক। মালিকের লাভ হয়। ঈদ শেষ হওয়ার ১০-১২ দিন পর ছুটি মেলে।’

                                    ছবি: লেখক

 



মন্তব্য