kalerkantho

সুজলা সুফলা বাংলাদেশ

আনারস

১৪ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



আনারস

টাঙ্গাইলের মধুপুর আনারসের রাজধানী।  মধুপুর উপজেলার বেশির ভাগ জমিতেই আনারসের আবাদ হয়। মধুপুর আর আনারস—একটির নাম উঠলেই অন্যটির কথা মনে পড়ে। অরণ্য ইমতিয়াজ ব্যাপারটিতে নজর দিয়েছেন

 

জলছত্র টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ সড়কে। মধুপুরের আনারসের বড় বাজার জলছত্র। গারোবাজার ও বড়বাজার তবে জলছত্রের মতো নয়। উপজেলার অরণখোলা, আউশনাড়া, ষোলাকুড়ি বা পঁচিশ মাইল থেকে জলছত্রে আনারস আসে। কেউ বাইসাইকেলে ঝুলিয়ে নিয়ে আসে, কেউ আনে ঘোড়ার গাড়ি করে। পিকআপ-ইজিবাইক আর ভ্যানে করে তো আসেই। সড়কের দুই ধারে বসে বাজার। শুক্র ও মঙ্গলবার হাট বসে। কেনাবেচা অবশ্য প্রতিদিনই চলে। সারা দেশ থেকেই ক্রেতা আসে। ওদিকে গারোবাজারে হাট হয় রবি আর বুধবার। 

 

ইতিহাস

মধুপুরে আনারস আবাদের ইতিহাস খুব বেশি পুরনো নয়। গড় (উঁচু) এলাকার আউশনারা ইউনিয়নের ভেরেনা সাংমা ষাটের দশকের শেষ দিকে গিয়েছিলেন ভারতের মেঘালয়ে। সেখানে প্রচুর আনারস হয়। তিনি কয়েকটি জায়ান্টকিউ জাতের আনারসের চারা নিয়ে আসেন। মধুপুর গড়ে নিয়ে এসে রোপণ করেন। প্রথমবারেই ভালো ফলন হয়। খেতেও সুস্বাদু ছিল। পরে আরো বেশি জমিতে আনারস আবাদ করেন। তাঁর দেখাদেখি অন্যরাও আনারসের আবাদ করতে থাকে। একদিন দেখা গেল মধুপুরের সব দিকে আনারস। মূলত জায়ান্টকিউই আবাদ হতো, তবে গত কয়েক বছর জলডুগিও হচ্ছে। পাবর্ত্য অঞ্চলের আনারস জলডুগি। এ বছর জলডুগির আবাদ অনেক বেড়েছে। জায়ান্ট মানে দৈত্য। জায়ান্টকিউ আকারে সত্যিই বড়। জলডুগি খেতে মিষ্টি তবে আকারে ছোট।   

 

জমির হিসাব

এবার মধুপুরের ছয় হাজার ৩৯৮ হেক্টর জমিতে আনারস আবাদ হয়েছে। উৎপাদন হয়েছে দুই লাখ ১১ হাজার ১৩৪ মেট্রিকটন। সংখ্যার দিক থেকে ১১ কোটি ৯৯ লাখ ৬২ হাজার ৫০০টি। মধুপুরে আনারস চাষির সংখ্যা হচ্ছে ১৩ হাজার ৭৫০ জন। তবে ব্যক্তি উদ্যোগে বাড়ির আঙিনায় ও আশপাশে আরো অনেকে আনারস চাষ করে থাকেন।

 

আনারসের মৌসুম

সাধারণত আষাঢ়ের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে মধুপুরের বাজারে আনারস উঠতে থাকে। শ্রাবণের শেষ পর্যন্ত আনারস পাকার ভরা মৌসুম। তবে অন্য সময়ও অল্পস্বল্প আনারস মধুপুরে পাওয়া যায়।

 

আবাদ

আনারসের চারা রোপণ থেকে শুরু করে বাজারজাত করা পর্যন্ত শ্রমিকদের ভাগ ভাগ হয়ে (কয়েকটি দলে) কাজ করতে হয়। চারা রোপণ করে এক দল, চারা পরিচর্যা করে এক দল, ফল সংগ্রহ করে এক দল, বাজারে নিয়ে যায় এক দল, ট্রাকে তোলে এক দল এবং আরেক দল মোকাম করে।

 

মহিলা শ্রমিক

পুরুষের পাশাপাশি আনারস চাষে মহিলাদেরও অংশগ্রহণ রয়েছে। বেশির ভাগ জমিতে আনারস পরিচর্যা করে মহিলারা। মধুপুরে প্রায় পাঁচ হাজার মহিলা শ্রমিক রয়েছে বলে জানান আনারস চাষি ও ব্যবসায়ীরা।

 

বিদেশিদের আনারসপ্রীতি

গারোবাজারের আনারস চাষি ও ব্যবসায়ী ছানোয়ার হোসেন জানান, গতবার দুজন জাপানি এসেছিলেন। তিনি তাঁদের জলডুগি খেতে দিয়েছিলেন। খেয়ে তাঁরা ভীষণ খুশি হয়েছিলেন। মধুপুর জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদে মাঝেমধ্যে বিভিন্ন দেশ থেকে অতিথি আসেন। হাঙ্গেরি, ডেনমার্ক বা আমেরিকা থেকে।  তাঁদের  আনারস খেতে দেওয়া হয়। কিছু দিন আগেও ইংল্যান্ড থেকে একটি  দল এসেছিল। তারাও আনারস খেয়ে প্রশংসা করেছে।

 

আপ্যায়নে

আষাঢ়-শ্রাবণে কারো বাড়িতে অতিথি এলে তাঁকে আপ্যায়ন করতে মেনু তালিকায় আনারস থাকেই। মৌসুমি ফলের মধ্যে এটি উল্লেখযোগ্য একটি রসালো ফল। এ মৌসুমে জামাই বাড়ি এলে তাকে যেমন আনারস খেতে দিতে হবে, আবার জামাই শ্বশুরবাড়ি গেলে তার সঙ্গেও আনারস থাকবে—এটা অনেকটাই প্রচলিত হয়ে গেছে। আনারসের খ্যাতি ও খেতে সুস্বাদু হওয়ার কারণেই এটি হয়েছে।

ছবি : লেখক

 



মন্তব্য