kalerkantho


অন্য রকম

সুবিমলের চোখ

৩০ জুন, ২০১৮ ০০:০০



সুবিমলের চোখ

জন্তুর মুখের অবয়ব : বটবৃক্ষ। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে দিল্লির লোদি বোটানিক্যাল গার্ডেন থেকে তোলা

তিন যুগের বেশি সময় ধরে ছবি তুলছেন। তার মধ্যে ১৭ বছর গাছের। অদ্ভুত সব আকার-আকৃতি খুঁজে পান গাছের শরীরে। তাঁকে নিয়ে বলছেন মনিরুজ্জামান

 

একজন সুবিমল

পৈতৃক বাড়ি চাঁদপুরের মতলবে হলেও জন্ম সিলেটের নবীগঞ্জে, ১৯৫৫ সালে। বাবা ছিলেন মহকুমা কৃষি কর্মকর্তা। তাই বেশি দিন এক জায়গায় থাকতে পারেননি। প্রাথমিক শিক্ষা নবীগঞ্জে, আর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে। নরসিংদীতে তাঁর মামাবাড়ি। ১৯৭৩ সালে মামাদের উৎসাহেই ফটোগ্রাফিকে পেশা হিসেবে নেন। স্থায়ী বসবাস শুরু করেন নরসিংদীতেই।

 

আদি মানব : পাহাড়ি গাছ। ছবিটি ২০০২ সালে কলকাতার বোটানিক্যাল গার্ডেন থেকে তোলা।

ছবি দেখে বেড়াতেন

আলোকচিত্র প্রদর্শনীর খবর পেলে সুবিমল আর বসে থাকতেন না। সেটা দেশের দূরপ্রান্তে হলেও। বলা ভালো, প্রদর্শনীর ছবি দেখে দেখেই ছবি তোলা শিখেছেন সুবিমল। ১৯৮৬ সালে কর্মরত মানুষ শিরোনামের তাঁর একটি ছবি শিল্পকলা একাডেমিতে প্রদর্শিত হয়। ১৯৯২ সালে সার্ক আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে দিল্লি গিয়েছিল তাঁর মাছ ধরা ছবিটি। বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটির সভ্য হন ১৯৯৮ সালে।

 

সুবিমল দাস

চোখ গেল গাছে

গাছের সঙ্গে তাঁর বন্ধুতা ১৭ বছর ধরে। অবসর পেলেই ছোটেন। হাঁটেন মাইলের পর মাইল। আম, কাঁঠাল, নারকেল, তেঁতুল, তমাল, অর্জুন, কড়ই, গর্জন, চন্দন, গাব, অশোক, মহুয়ার ছবি তোলেন। নাম না-জানা পাহাড়ি গাছের ছবিও তুলেছেন। বলেন, ‘গাছের প্রাণ আছে। গাছও সাজে। অনেক রূপ ধরে। কখনো মানুষের, কখনো বন্য প্রাণীর। গাছ দেখে আমি ক্লান্ত হইনি; বরং বৈচিত্র্য খুঁজে পাই অনেক।’

 

নাম দিয়ে পরিচয়

২০০২ সালে কলকাতা বোটানিক্যাল গার্ডেনে তুলেছিলেন একটি নাম না-জানা গাছের ছবি। নাম দিয়েছেন আদি মানব। ২০০৪ সালে সিঙ্গাপুরের বার্ড পার্কে তুলেছেন একটি একাশিয়া গাছের ছবি। ছবির নাম, রঙের বিন্যাস। ২০০৮ সালে কলকাতার গঙ্গার তীরে একটি বটগাছের ছবি তুলেছেন। নাম, আলিঙ্গন। ২০১৭ সালে দিল্লির লোদি গার্ডেনেও বটগাছের ছবি তুলেছেন। নাম জন্তুর মুখের অবয়ব। ২০০২ সালে নরসিংদীর মনোহরদীতে তুলেছেন নিমগাছের ছবি। নাম ধাবমান হরিণ। ২০১৭ সালে আগ্রায় তাজমহলের সামনে একটি কড়ইগাছের ছবি তুলেছিলেন। ছবিটির নাম হিংস্র প্রাণীর অবয়ব।

 

কাইয়ুম চৌধুরী লিখেছিলেন

২০০৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি নরসিংদী পৌর মিলনায়তনে ‘জীবন ও প্রকৃতি’ নামে পাঁচ দিনের এক প্রদর্শনী করেছিলেন সুবিমল। শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী তাঁর বৃক্ষচিত্র দেখে লিখেছিলেন, ‘আজকের প্রদর্শনীতে আলোকচিত্রী সুবিমল দাস স্বপনের সৃষ্টির মুখোমুখি আমরা। তার কাজে রয়েছে নবসৃষ্টির নতুন প্রেক্ষিত। শিল্পীর সৃষ্টির বৈচিত্র্য আমাকে ব্যাপক মুগ্ধ করেছে।’

 

এখন সুবিমল

এখন তিনি ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফি করছেন বেশি। একটি সিরিজের নাম গুনারী একটি গ্রামের নাম। আরেকটির নাম শিবসা নদীর পারে। সিটি কলেজের অধ্যক্ষ ড. মশিউর রহমান মৃধা সুবিমলকে নিয়ে বললেন, ‘স্বপনদার তোলা গাছের ছবিগুলো শুধু ছবি নয়, কবিতাও। অনেক রহস্য লুকিয়ে থাকে। আমার মনে হয় তিনি ক্যামেরা দিয়ে ছবি আঁকেন।’ সুবিমল বললেন, ‘তখন দুঃসময় ছিল। ক্যামেরা হয়ে উঠেছিল জীবিকার উপায়। পরে বুঝলাম আমি এটি ভালোওবাসি। প্রকৃতি অনেক কিছু লুকিয়ে রাখে। খুঁজলে কিন্তু ধরা দেয়। আমি গাছের ছবি তুলেছি চট্টগ্রামে, কলকাতা, দিল্লি বা সিঙ্গাপুরের বার্ড পার্কে। নরসিংদীতে তো প্রতিদিনই তুলি। যেখানে যাই ছবি তুলি। গাছের ছবিই বেশি। বাকি জীবন এভাবেই কাটাতে চাই।’

 

অর্জন

২০০০ সালে জাপানে অনুষ্ঠিত এশিয়া প্যাসিফিক কালচারাল সেন্টার ফর ইউনেসকো আয়োজিত লিভিং ইন হারমনি প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ফুজি ফিল্ম প্রাইজ ফর এক্সিলেন্স পুরস্কার পেয়েছেন। ২০০৩ সালে অষ্টম জাতীয় আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে তিনি দুটি পুরস্কার পান। ২০০৪ সালে ভারতের কলকাতায় সত্যজিৎ রায় ফিল্ম ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত সপ্তম আন্তর্জাতিক ফটোগ্রাফিক কনফারেন্সে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি মোট ১১ বার বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি পুরস্কার লাভ করেছেন। ২০০৪ সালে বিশ্ব নাট্য দিবস উপলক্ষে নরসিংদী গ্রুপ থিয়েটার তাঁকে গুণীজন সম্মাননা দেয়।

 



মন্তব্য