kalerkantho


সরেজমিন

একটা আর্জেন্টাইন রাত

৩০ জুন, ২০১৮ ০০:০০



একটা আর্জেন্টাইন রাত

দারুণ দুশ্চিন্তায় ২৬ তারিখটা কেটেছে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের। তবে জিতেছিল আর্জেন্টিনা, মেসিও গোল পেয়েছেন। মোহাম্মদপুর বিহারি ক্যাম্পে খেলাটা দেখতে গিয়েছিলেন মীর হুযাইফা আল মাহমূদ

 

আগেভাগেই বেরিয়েছিলাম, যেন পুরো খেলাটাই ক্যাম্পে দেখতে পারি। আগের দিন কবিবন্ধু হাসান রোবায়েত ক্যাম্পের একজনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। তাই সহজ হয়েছিল। আমি অবশ্য ক্যাম্পে আগেও কয়েকবার গেছি। মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট পেরিয়ে আরেকটু এগোলাম। দেখলাম কয়েকজন একটি দোকানে বসে আছেন। জিজ্ঞেস করলাম,

এখানে বড় পর্দা লাগাইছে কোথায় ভাই?

—মার্কেটের পেছনে গেলে পাইবেন।

কৃষি মার্কেটের পেছনে একটু গেলে বাঁয়ে একটি গলি, সেখানে বেশ বড় একটি পর্দা। তখনো খেলা শুরু হয়নি। গান বাজছিল। অনেক মানুষ। দাঁড়িয়েই আছে বেশির ভাগ। কয়েকজন নাচছে, কয়েকজন চিল্লাচ্ছে। কেউ আবার একলা। বেশির ভাগের গায়ে আর্জেন্টিনার জার্সি। এরা কম বয়সী। ২০-২৫ এর মধ্যে হবে বয়স। তবে মাঝ বয়সী কয়েকজনকে দেখলাম রাস্তার এক ধারে চৌকি পেতে বসেছেন। বোঝা যাচ্ছে আরাম করে খেলা দেখবেন।

 

আরো গেলাম

জেনেভা ক্যাম্পে গেলাম। ফোন করলাম সাজিদকে। মোহাম্মদ সাজিদ। বয়স বললেন, তিরিশ। ঢাকা কলেজ থেকে ম্যানেজমেন্টে মাস্টার্স করেছেন। এখন কিছু করছেন না। কারণ বললেন, ‘ছোটকাল থেকেই অনেক চাপ নিছি। এখন আর নিতে ইচ্ছা করে না। দু-তিনটা টিউশনি করি। তাতেই চলে যায়।’ অনেক ভাই-বোনের সংসারে এখন সাজিদের সঙ্গে শুধু মা-ই আছেন। বাকিরা নিজের মতো সংসার গুছিয়েছেন।

সাজিদ বললেন, ‘মোহাম্মদপুরে মোট ছয়টি ক্যাম্প আছে। টাউন হলে তিনটি, আর কৃষি মার্কেটের পর থেকে কলেজগেট পর্যন্ত আরো তিনটি। যেখানে পর্দায় খেলা হচ্ছে, সেটা মার্কেট ক্যাম্প। তারপর আছে সেন্টার কমিউনিটি ক্যাম্প, আর তার পরই জেনেভা ক্যাম্প। তিনটি ক্যাম্প গায়ে গা লাগানো। জেনেভা ক্যাম্পটিই সবচেয়ে বড়।’

ক্যাম্পের লোক খেলা দ্যাখে কেমন? জানতে চাইলাম।

‘আমরা যখন ছোট ছিলাম, খেলা একটা ব্যাপারই ছিল। এখন কেমুন জানি ঝিম ধরছে। পছন্দের টিমগুলারে বারবার হারতে দেখলে কার ভালো লাগে? তাই বোলচাল কমায় দিছে। আগে ক্যাম্পের পোলাপান বেশি জরির কাজ করত। এখন এদিক-ওদিক নানান ধান্ধা। দৌড়ের ওপরে থাকে। এখন যত পতাকা দেখতাছেন তার ডাবল উড়ত আগে,’ সাজিদ বললেন।

 

ক্যাম্পের ৭ নম্বর সেক্টর

দুজনে মিলেই গেলাম জেনেভা ক্যাম্পের ৭ নম্বর সেক্টরে। একটি দোকানের শাটার বন্ধ, সামনে একটি টুলের ওপর একটি টিভি। ২১ ইঞ্চিই তো হবে! জমায়েত মোটামুটি। কম বয়সীরা লাফাচ্ছিল। দুটি ভ্যানগাড়ি একটু দূরে। তার ওপর সাত-আটজন করে লোক বসা। একটি চকিও আছে ধারে। আরাম করে শুয়ে আছেন একজন। একটি বাসার বারান্দায়ও দেখলাম ৮-১০ জন মাঝ বয়সী বসে আছেন। চকিটার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। ভদ্রলোক শুয়ে শুয়ে খেলা দেখছেন আর পান চিবোচ্ছেন। মাঝেমধ্যে আঙুলের ডগা থেকে আয়েশ করে চুন মুখে পুরছেন। জিজ্ঞেস করলাম, ‘চাচা, কোন দলের সাপোর্টার।’

—মেক্সিকো।

—আগে থেকেই মেক্সিকো, নাকি নতুন কইরা?

—বহুদিন ধইরা আমি এই টিম সাপোর্ট করি।

—ক্যান, মেক্সিকো কেন, মানে কী দেইখা মেক্সিকোর সাপোর্ট করেন?

—১২-১৩ বছর আগের ঘটনা। পুলিশ রেইড দিছিল ক্যাম্পে। আমি সেসুম মেক্সিকোর পতাকা বানাইতেছিলাম। দারোগা সাব জিগাইলেন, কোন দলের সাপোর্টার। পতাকা দেখায়া বললাম, মেক্সিকো। দারোগা বললেন, শাবাশ। আমি বাইচা গেলাম। সেই থেইকা এই দল করি।

চাচা দুই ছেলেসমেত থাকেন ক্যাম্পে। স্ত্রী মারা গেছেন। রিকশা চালান। শওকত নাম তাঁর। আগে কারখানা ছিল; কিন্তু প্রতিবেশীরা টিকতে দেয়নি। বড় ছেলেটাকে বিয়ে দেবেন শিগগিরই। তারপর নিজের জন্য একটি বুড়ি খুঁজবেন। নইলে বুড়ো বয়সে কে দেখবে?

 

আবার এগোলাম

সরু চিপা গলি। সবাই জেগে আছে। এ সময়েই জোর চিৎকার শুনলাম। দৌড়ে গিয়ে দেখি, গোল হয়ে গেছে একটি। মেসির গোল।

‘আবে মেসি নে গোল দিয়া শালে। আবে ও শালে কাহা, আও না’—বলতে বলতে ৩০ কী ৩২ বছর বয়সী একটি ছেলে চোখ মুছছে। তাঁর খুশিতে আমারও কান্না পেয়ে গেল। তারপর একটি জায়গায় দেখি দুটি দোকান পাশাপাশি—একটি মুদি দোকান, অন্যটি কাবাবের। দুটিতেই খেলা দেখছিলেন অনেকে। একজন বলে উঠলেন, ‘আরে মাঠ মে জো হ্যায় ও সামাঝ সাকতে হ্যায় সিচুয়েশন কিয়া হ্যায়, হাম লোগ তো অ্যায়সে হি কাহা যাতা হু, ইয়ু কারো, অ্যায়সে কায়ে নাহি কিয়া (মাঠে যারা আছে, তারাই অবস্থা বোঝে শুধু। আমরা তো এমনেই বলে যাই, এমন করে খেলো, এমন করে কেন খেলল না)।’

তারপর আমি আবার বড় পর্দার কাছে গেলাম। বিদায় নিলাম সাজিদের কাছ থেকে। বৃষ্টি হচ্ছিল তখন। শ পাঁচেক লোক খেলা দেখছে বড় পর্দায়। কয়েকজনের হাতে দেখলাম ভুভুজেলা। প্যা-পো বাজাচ্ছে।

একটি রিকশাওয়ালা দেখলাম, রুটি-কলা খাচ্ছে। নাম বলল, সেলিম। ব্রাজিলের সাপোর্টার। খেলা দেখেন নিয়মিতই। নাইজেরিয়া পেনাল্টি থেকে গোল পেলে সে সঙ্গী আর্জেন্টাইন সমর্থকদের খেপাচ্ছিল। যা হোক আর্জেন্টিনা দ্বিতীয় গোল পেল। এবার উচ্ছ্বাস সীমা ছাড়াল। দেখলাম সেলিমও খুশি। বলল, ‘আর্জেন্টিনা না থাকলে কাইজ্যা করুম কার লগে?’ একজন বলে উঠল, ‘পুরা মোহাম্মদপুরে মিলাদ দিমু।’ খেলা শেষ হওয়ার পর মেসি মেসি বলে আনন্দ মিছিল হলো।

বাসার দিকে ফিরছিলাম। সামনে থেকে একজন বলে উঠল, ‘ওই, জলদি আয় না বেডা!’ পেছনে তাকিয়ে দেখি একটি ছেলে মোবাইলের স্ক্রিনে তাকিয়ে তাকিয়ে হাঁটছে। বলল, ‘আরে বেটা, ইশটেটাস কী দিমু ভাবতাছি।’

জিজ্ঞেস করলাম, ‘ভেবে পেলেন কিছু?’

—হ্যাঁ ভাই, পাইছি।

দিমু, আর্জেন্টিনা = ২ আর ব্রাজিলের সমর্থক+রেফারি+নাইজেরিয়া = ১!

     ছবি : মোহাম্মদ আসাদ ও সংগ্রহ

 



মন্তব্য