kalerkantho


ফেসবুক থেকে পাওয়া

৩০ জুন, ২০১৮ ০০:০০



ফেসবুক থেকে পাওয়া

হারানো ঈদ

ঘটনাটা শৈশবের। তখন আব্বু-আম্মুর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রোজা রাখতাম। তবে প্রথম প্রথম বুঝতামই না সাহরি কী। একদিন তো আম্মুকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ভাত তো ভাত। সাহরিটা আবার কী?’ রমজানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ঈদের কেনাকাটা, ছোট বলে একবার অথবা দুবারই সুযোগ হতো মার্কেটে যাওয়ার। আব্বু, আম্মু, মামা, মামি আর বোনদের সঙ্গে কেনাকাটা করতে যেতাম। জামা-জুতা কেনার পরেই শুরু হতো ঈদের তীব্র প্রতীক্ষা। চাঁদরাতের দিন আব্বু, আম্মু আর বোনদের সঙ্গে গ্রামের বাড়ি যাওয়াটা রোমাঞ্চকর অনুভূতি। সন্ধ্যায় ইফতারি শেষে চাঁদ দেখা নিয়ে সবাই ছোটাছুটি দেখতাম, কিন্তু আমার ছোট্ট মাথায় বিষয়টি কেন যেন জটিল লাগত। তবে এটুকু বুঝে গিয়েছিলাম, টিভিতে ‘রমজানের ওই রোজার শেষে’ গান শুরু হলেই পরদিন ঈদ। ঈদ মানে খুব ভোরে পুকুরে গোসল, নতুন জামা-জুতা পরে বেড়ানো আর সবচেয়ে বিশেষ ব্যাপার ছিল সালামি। দুই, চার, ১০ টাকা যা পেতাম ছোট্ট ব্যাগে পুরতাম আর একটু পর পর গুনে দেখতাম, নতুন টাকার গন্ধ শুঁকতাম। এই টাকা নিয়েই বিকেলে পাড়ার দোকানে আচার, চকোলেট কেনার জন্য ছুটতাম। সন্ধ্যা হলেই মন খারাপ হতো, ঈদ শেষ। জীবনে অনেক ঈদ এসেছে, হয়তো আরো অনেক ঈদ আসবে, তবে শৈশবের ঈদের সেই আমেজ আর ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়।

—নুরশাদ সাবরিনা

চট্টগ্রাম কলেজ।

 

সেদিনও বৃষ্টি ছিল

ছোটবেলা থেকে আমি ছিলাম কল্পনাপ্রবণ। প্রথম স্কুলে ভর্তির পর বার্ষিক পরীক্ষার ফল ভালো করলাম। কিন্তু রেজাল্ট হাতে বাসায় ফিরে এসে দেখি অ্যাম্বুল্যান্স। সেই থেকে কষ্টের স্মৃতি আমাকে আজও তাড়া করে। হঠাৎ করেই আম্মু প্রচণ্ড জ্বরে আক্রান্ত হলেন। অনেক ভোগার পর সুস্থও হলেন। তবে শারীরিক কিছু প্রতিবন্ধকতা দেখা দিল। তবু আমাদের মধ্যে স্বস্তি ফিরল—মা, বেঁচে তো আছেন। আম্মু আমাদের উচ্ছলতার প্রতীক ছিলেন। ঘোরাঘুরি করতে পছন্দ করতেন। ছবিঘরে ভালো ছায়াছবি মুক্তি পেলেই পরিবারের সবাইকে নিয়ে দেখতে যেতেন। এ ছাড়া ঈদের পর গ্রামের বাড়ি (ময়মনসিংহ, ঈশ্বরগঞ্জ) বেড়াতে যাওয়া যেন বাধ্যতামূলক ছিল। আব্বু সে সময় সরকারি চিকিৎসক ছিলেন। ফলে তাঁর অফিসের গাড়ি আমাদের পারিবারিক ভ্রমণের আনন্দ আরো বাড়িয়ে দিত। মাঝপথে অকস্মাৎ আম্মুর অসুস্থতায় মন খারাপ হলো। লেখাপড়া, খাওয়াদাওয়া সব কিছুতে অনীহা দেখা দিল। কিন্তু পরিবারের সবার ছোট ও আদরের মেয়ে। তাই খুব তাড়াতাড়ি সামলে উঠলাম সবার মমতা ও আদরে। এখন বিবাহিত ও এক সন্তানের জননী। প্রথমবারের মতো মা হওয়ার সময় আবারও পড়ালেখায় বাধা এলো। কিন্তু বাবা ও শ্বশুরের অনুপ্রেরণা ছিল। তাই একটু দেরি করে হলেও স্নাতকোত্তর উের গেলাম। চিকিৎসক হলেও বাবা ছিলেন সংস্কৃতিমনা। তাই আরো পড়াশোনার পাশাপাশি লেখালেখি ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সম্পৃক্ত থাকার পরামর্শ দিলেন।

তখন ২০১৪ সাল। আমার কন্যার বয়স মাত্র তিন বছর। আব্বু পরিবারের সবাইকে নিয়ে আবারও গ্রামের বাড়ি যাবেন বলে ঠিক করলেন। কিন্তু বিধিবাম। পারেননি। প্রবল একাকিত্ব ও বার্ধক্যের কাছে পরাজয় বরণ করেন তিনি। ধীরে ধীরে আম্মু, বড় চাচা, চাচি, ফুফুসহ একেক করে প্রিয়জনদের চলে যাওয়া তাকে ক্রমেই অসহায় করে তোলে। একসময় আমার শ্বশুরবাড়িতে খবর এলো, বাবা খুব অসুস্থ, হাসপাতালে। মনটা হাহাকারে কেঁদে উঠল। দেরি করিনি। কিন্তু লাভ হয়নি। তাই আমাদের আর গ্রামেরবাড়ি যাওয়া হলো না। প্রায় দুই মাস হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়লেন তিনি। তারপর মায়ের মতো তিনিও চলে গেলেন না-ফেরার দেশে। এখন মা-বাবার শোবার ঘরে সযতনে দেয়ালে টানানো ছবিগুলো চেয়ে রয়। পারিবারিক আনন্দমুখর পরিবেশে কত না হাস্যোজ্জ্বল মুখ তাঁদের সেই ছবিতে। স্মৃতি শুধু কথা কয়।

মিরপুরে বাবার বাড়ির করিডর ধরে দাঁড়িয়ে দেখি আকাশ থেকেও ঝরছে অবিরাম সেই বৃষ্টি, কত না করুণ সুরে! মনে পড়ে এই একই বৃষ্টি ঝরছিল যখন হাসপাতালের বিছানায় মুমূর্ষু অবস্থায় আব্বু শায়িত ছিলেন, পাঞ্জা লড়ছিলেন মৃত্যুর সঙ্গে। যেদিন আম্মু মারা যান, সেদিনও কী তুমুল বৃষ্টি! তবে কী প্রিয়জনের চিরতরে চলে যাওয়ায় বৃষ্টির কোনো যোগসাজশ রয়েছে? দুচোখ বেয়ে ফোয়ারা নামে অঝোর ধারায়, আসছে এই শ্রাবণে হঠাৎ করেই।

—হাসিনা সাঈদ মুক্তা

গৃহিণী, পশ্চিম শ্যাওড়াপাড়া, মিরপুর।

 

বন্ধুর ঈদ

রমজানের ঈদে বন্ধু রূপম রাশিয়া থেকে মাতৃভূমি বাংলাদেশে আসে। দুই বছর ধরে এমনটি ঘটছে। গত বছরও ব্যতিক্রম হয়নি। কেন প্রত্যেকবার রমজানের সময় দেশে আসা! কারণ জানতে চাওয়া বোকামি হবে বলে আর জানা হয়নি। বললাম, ‘বন্ধু, দেশে থাকার পুরো সময়টা আমি তোমার সঙ্গী হব।’ রূপম হাসল। বন্ধুর প্রথম দিন কাটাল মা-বাবার কাছে, যে পিতা-মাতা দুই বছর আগে দুই মাসের ব্যবধানে দুই ঈদে জান্নাতবাসী হয়েছেন। বন্ধু কবরের পাশে একান্তে সময় কাটাল। এরপর বৃদ্ধাশ্রম। আগে কখনো বৃদ্ধাশ্রমে যাইনি। এই প্রথম। পুরো বৃদ্ধাশ্রমের এক দিনের খরচ বহন করল রূপম। সন্তান থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন বয়স্ক অজানা-অচেনা পিতা-মাতার জন্য নিয়ে গেল শাড়ি-লুঙ্গিসহ অনেক ঈদ উপহার। বৃদ্ধাশ্রমে এমন আনন্দঘন পরিবেশ সাধারণত দেখা মেলে না! যে আনন্দ সন্তান খুঁজে পায় তার পিতা-মাতাতে আর পিতা-মাতা পান তাঁর সন্তানে। এ আনন্দ শান্তি দেওয়ার, ভালোবাসার। এ আনন্দ কষ্টমাখা মানুষগুলোর মাঝে মা-বাবাকে ফিরে পাওয়ার।

আনন্দ শেষ হওয়ার নয়। বৃদ্ধাশ্রম থেকে সোজা চললাম এতিম শিশুদের একটা হোমে। এতিম শিশুদের মধ্যে ঈদ উপহার সামগ্রী বিতরণ করা হলো। আমরা এতিম শিশুদের সঙ্গে কিছু সময় অতিবাহিত করলাম। বন্ধুর সঙ্গী হয়ে এমন হাসিমাখা মুখগুলোর সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করলাম। গত বছর বন্ধুর শেষ মুহূর্ত—‘বিদায়, আবার দেখা হবে।’

সত্যিই এমন দেখা আমি প্রত্যেক ঈদে করতে চাই। শামিল হতে চাই এমন মহৎ কাজে।

—সাধন সরকার

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

 

তাকে ভুলি কী করে?

সাইকেল চালাচ্ছিলাম। হঠাৎ অটোরিকশার ধাক্কায় রাস্তার মাঝখানে ছিটকে পড়লাম। উঠতে গিয়ে শুনলাম পেছনে রিকশায় বসা এক মেয়ে বলছে, ‘ওহ, মাই গড! ওহ মাই গড! আপনি ঠিক আছেন তো?’

‘হ্যাঁ, ঠিক আছি।’

একজন আমার সাইকেল তুলছিল আর বলছিল, ‘একটু সাবধানে চালাবেন।’ মেয়েটি আবার বলল, ‘না না। ওনার কোনো দোষ নেই।’

সড়কে প্রেস্টিজ পাংচার হলো। সাইকেল থেকে পড়ে লজ্জা পেয়েছিলাম ভীষণ। বেঁকে যাওয়া হ্যান্ডলটা সোজা না করেই তাই আবারও চালাতে শুরু করলাম। ভাবছিলাম, আমার কপাল ভালো। পেছনে অটোরিকশা না থেকে যদি একটা বাস বা ট্রাক থাকত, তাহলে হয়তো মুহূর্তের মধ্যেই পিষ্ট হয়ে যেতাম। ভাবছিলাম সেই মেয়েটির কথা, যে আমার পড়ে যাওয়া দেখে বলেছিল, ‘ওহ! মাই গড।’ কারণ দোষ আমারও ছিল। আমি একটু অসতর্কভাবেই চালাচ্ছিলাম। কিন্তু মেয়েটা সবাইকে বলল, আমার কোনো দোষই নেই। আর সেই সময় মেয়েটি যে আন্তরিকতা দেখিয়েছিল, তাতে তাকে ভুলি কী করে?

—সায়েক সজীব

শরণখোলা, বাগেরহাট।

 



মন্তব্য