kalerkantho


ইতিকথা

ছন্দ হারিয়ে গেল

২৩ জুন, ২০১৮ ০০:০০



ছন্দ হারিয়ে গেল

ছবি তোলা মাসুম সায়ীদের শখ। ফটো স্টুডিও দেখলে না থেমে পারেন না। সেদিন দুপুর অলস ছিল। ছন্দ স্টুডিওতে বসে গল্প জুড়েছিলেন

 

পাড়ায় একটি ফটো স্টুডিও ছিল। নাম ‘স্মৃতিটুকু থাক’। বন্ধু স্বপন কাজ করত স্টুডিওটিতে। মালিক ঝিন্টু ভাইও ছিল পাড়ার বড় ভাই। কলেজে পড়ার সময় নেপালের আড্ডা ওই স্টুডিওতেই। 

পড়ালেখায় ইস্তফা

কলেজ পাস করে অনার্স পড়তে নেপাল গেল জগন্নাথ কলেজে। থাকার জায়গা হলো বাণী ভবনে। দ্বিতীয় বর্ষে পা দিতে না-দিতেই মৃত্যু হলো মায়ের। আরো আগেই স্বর্গীয় হয়েছেন পিতা। পরিবারে ভাই-বোনের দায়িত্ব নিতে হলো তাকেই। তাই পড়ালেখায় ইস্তফা দিয়ে ফিরে এলেন বাড়ি। কিছু একটা তো করা চাই। মাথায় এলো স্টুডিওর কথা। স্বপনকে প্রস্তাবটা দিতেই রাজি হয়ে যায় সে। নাম ঠিক হলো ‘ছন্দ স্টুডিও’। শব্দটার মধ্যে একটা দোলা আছে বলেই নামটা। এই হলো সাভার নামাবাজার মোড়ের ছন্দ স্টুডিও প্রতিষ্ঠার ইতিহাস। সেটা ১৯৮৫ সালের কথা।

 

দুটি ক্যামেরা

ইয়াসিকা ম্যাট ১২৪-জি মডেলের একটি টুইন লেন্স রিফ্লেক্স ক্যামেরা,  ছয় বলের একটি লাইট স্ট্যান্ড, হাতে আঁকা ব্যাক স্ক্রিন আর একটি এক্সপোজার মেশিন নিয়ে যাত্রা শুরু হলো। যন্ত্রপাতি যা-ই থাক, তখনকার দিনে গলায় ক্যামেরা নিয়ে ছবি তুলতে যাওয়া একটা চমক লাগানো কাজ। আর স্টুডিওর ব্যবসাটাও বলার মতো একটা পেশা। পরে এলো এসএলআর ক্যামেরা ইয়াসিকা এফএক্স থ্রি। সাদাকালো পাসপোর্ট সাইজ ছবির চার্জ সাড়ে সাত টাকা। বছর দুই পর স্বপন গিয়ে স্টুডিও খুলল আশুগঞ্জে। আশুগঞ্জে সার কারখানাসহ আরো নানা রকম কলকারখানা। স্টুডিও ব্যবসার জন্য ভালো জায়গা। নেপাল চন্দ্র আগে-পিছে থেকে আশুগঞ্জে বসিয়ে দিয়ে এলেন স্বপনকে। আর ছন্দ রইল তার নিজের।

 

বড় একটি কাজ

দেখতে দেখতে চলে গেল পাঁচটি বছর। এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেল উপসাগরীয় যুদ্ধ। জাতিসংঘের বহুজাতিক বাহিনীতে ডাক পড়ল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর। তাদের পাসপোর্ট আর নিবন্ধনের জন্য দরকার ছবির। সাভার ক্যান্টনমেন্টে ডাকও পড়ল। নেপাল চন্দ্র পুরো ক্যামেরা সেটআপ নিয়ে হাজির হলেন। তারপর পালা করে তুলতে থাকলেন সৈনিকদের ছবি। সে যাত্রায় সাড়ে তিন হাজার ছবি তুলেছিলেন এক টানা।

 

উৎসবের দিন

ঈদ আর দুর্গাপূজায় স্টুডিও জমজমাট হয়ে উঠত। আগে থেকেই প্রস্তুতি থাকত তার জন্য। ঈদের দিন আগেভাগেই চলে আসতেন স্টুডিওতে। বেলা বাড়ার সঙ্গে বাড়তে থাকত ভিড়। কখনো কখনো পড়ে যেত লাইন। কার ছবি আগে তোলা হবে—এর জন্য চলত আবদার। সাদাকালো ছবি ওয়াস হতো স্টুডিওতেই। রঙিন ছবির রোল নিয়ে ছুটতে হতো ঢাকায়। এর জন্য কাস্টমারকে অপেক্ষা করতে হতো কয়েক দিন। কোনো কোনো সময় পুরো সপ্তাহ। ঈদের আমেজ থাকত দুই-তিন দিন। আর দুর্গাপূজার আমেজ প্রায় সপ্তাহজুড়ে। পঞ্চমী থেকে দশমী পর্যন্ত। উৎসব ছাড়াও নতুন পোশাক পরে সেজেগুজে বেড়াতে বের হয়ে কেউ কেউ ছবি তুলে যেত স্মৃতিটা ধরে রাখার জন্য। বিয়েশাদি আর জন্মদিন তো ছিলই। পরিবারের সবাই একসঙ্গে হলে কোনো কোনো পরিবার থেকে ডাক পড়ত ছবি তোলার। কিংবা পুরো পরিবারটাই চলে আসত স্টুডিওতে।

 

থাকত অনিশ্চয়তা

ছবির রেজাল্ট সব সময় ভালো হতো না। কখনো কখনো পুরো রোল বাদ হয়ে যেত। এটা হতো আউট ডোরেই বেশি। হয়তো ক্যামেরার রোলটা ভরা হয়নি ঠিকমতো। কিংবা শাটার স্পিডের হেরফেরে সিনক্রোনাইজ হয়নি ফ্লাশের। কখনো আবার ডেভেলপ করতে গিয়ে ঝামেলা হতো ল্যাবে। ইচ্ছা-অনিচ্ছায় কাস্টমারদেরও মেনে নিতে হতো ব্যাপারটা। দশ-বারো সাইজের সাদাকালো ছবিতে করতে হতো পেনসিল টাচ। এটা আবার সবার কর্ম নয়। প্রচ্ছদশিল্পীর মতো এর জন্য ছিল স্পেশাল লোক। ছবি প্রতি তাদের চার্জ ছিল দশ টাকা।

 

বদলে গেল দিন

একদিন শেষ হয়ে গেল ফিল্মের যুগ। ডিজিটাল যুগের শুরু। তীব্র লাইট আর ব্যাক স্ক্রিনের দরকার গেল ফুরিয়ে। রঙিন ছবির সুবাদে এক্সপোজার মেশিনের বদলে ল্যাব প্রিন্টারের প্রচলন ঘটেছিল আগেই। এবার এলো ডিজিটাল ক্যামেরা। সঙ্গে কম্পিউটার। পেনসিল টাচের পরিবর্তে ফটোশপ। অগত্যা তুলে রাখতেই হলো পুরাতন যন্ত্রপাতি। এলো ডিজিটাল ক্যামেরা আর কম্পিউটারও। পারমাণবিক কমিশনের একজন কম্পিউটার বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে নেপাল কম্পিউটারের প্রশিক্ষণ নিলেন। ছন্দ স্টুডিও হয়ে গেল ছন্দ ডিজিটাল স্টুডিও।

 

হোল্ডারের বদলে ফোল্ডার

ফিল্ম ডেভেলপ করার ঝামেলা যেমন থাকল না, কাজের রেজাল্ট নিয়েও অনিশ্চয়তা নেই। ক্লিক করেই মনিটরে দেখা যায় রেজাল্ট। ল্যাবের পাশাপাশি এলো লেজার প্রিন্টার। বেশি জরুরি হলে সঙ্গে সঙ্গেই প্রিন্ট। নেগেটিভ হোল্ডারের স্তূপ জমে যায় না আর। হোল্ডারের জায়গা নিল কম্পিউটারে ফোল্ডার। নেগেটিভ খুঁজতে ঘাঁটতে হয় না হোল্ডারের কেবিনেট। 

 

তবু সুদিন থাকল না

ক্যামেরাসহ মোবাইল ফোনের প্রচলন ফটো স্টুডিওর ব্যবসায় নিয়ে এলো প্রলয়। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামের মতো সামাজিক মাধ্যম দখল নিল ফটো এলবামের স্থান। পুরনো অ্যালবামের বিবর্ণ ছবির কথা এখন আর কারো মনেও পড়ে না। বুঝি দরকারও হয় না। জমজমাট স্টুডিও এখন মরা নদীর ঘাসে ছাওয়া পরিত্যক্ত বন্দর। এখন কালেভদ্রে পাসপোর্ট-ভিসা, স্কুল-কলেজে ভর্তি আর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট কিংবা জমির দলিলের প্রয়োজনে স্টুডিওর খোঁজ পড়ে। ছন্দর দুই কর্মচারী গোবিন্দ আর তন্ময়কে নিয়ে বেশির ভাগই অলস সময় কাটান নেপাল চন্দ্র।

ছবি : লেখক



মন্তব্য