kalerkantho


এখানে জীবন যেমন

তাঁতগাঁও

২ জুন, ২০১৮ ০০:০০



তাঁতগাঁও

আম, হিজল আর কদম গাছের ছায়ায় বড় বড় টিনের ঘর। দৈর্ঘ্য-প্রস্থে প্রায় সমান। ঘরের ভেতর থেকে শব্দ আসে অবিরাম। তাঁতের মাকুর টাকুর-টুকুর-টুক, টাকুর-টুকুর-টুক। সেই সকাল থেকে মধ্য রাত। গ্রামের নাম বল্লা। উপজেলা কালিহাতী। জেলা টাঙ্গাইল। ঘুরে এসেছেন মাসুম সায়ীদ

 

সিএনজি স্টেশনটি সিঙ্গাইর গ্রামে। সেখান থেকে পাঁচ মিনিট হাঁটলে বল্লাবাজার। তারপর ইট বিছানো পথ ধরে আরো উত্তরে হেঁটে গেলাম। পুকুরপাড়ে বাঁশের আড়ে সুতা রোদে দেওয়া। বুনো গাছগাছড়ার ভিড়ে একটি গামারিগাছ। গাছটার ওপর সুতার জঞ্জাল। লাল-নীল-সবুজ হরেক রকম। পুকুরটা পার হতেই একটি তাঁতঘর। ভেতরের দিকে লম্বা অনেক। কম করেও ৫০-৬০টি তাঁত। হাতে টানার তাঁতগুলো বাঁশ আর কাঠ দিয়ে পুরো দেশীয় উপকরণ ও প্রযুক্তিতে তৈরি। গায়ের জোরে চালাতে হয়। এখন অবশ্য বল্লায় কিছু বিদ্যুত্চালিত তাঁতও বসেছে।

 

থাকা-খাওয়া একই জায়গায়

দেখতে দেখতেই বাকি তাঁতগুলোও বন্ধ হয়ে গেল। তাঁত ঘরের পূর্ব পাশে খাবার ঘর। সেদিকে পা বাড়াতে গিয়ে সুতা গোটানোর চরকা দেখলাম। এটা আগে ঘুরত হাতে। এখন চলে মোটরে। একজন নারী সেটা তদারকি করছিলেন। বাঁশের ঝাকায় রংবেরঙের ববিন। বারান্দায় দেখলাম রঙিন সুতার স্তূপ। এক পাঁজা নতুন শাড়িও চোখে পড়ল। সদ্যই বোনা। ইচ্ছা হলো কিনতে। এসব পেরিয়ে খাবারের ঘর। ঘরের সামনে উত্তর দিকে কলতলা। শানবাঁধানো। কলতলার পশ্চিম পাশে রঙের ঘর। দুজন রং করছে সুতায়। খাবারের ঘরটা জানালাবিহীন লম্বা একটি দোচালা। ভেতরে সারি সারি চৌকি পাতা। এটি কর্মীদের থাকার ঘর। বেড়ার সঙ্গে মশারি আর চৌকির ওপর এলোমেলো বিছানা।

 

ফের নামলাম পথে

ইট বিছানো লাল পথ। দুই ধারের বাড়িঘরগুলো রাস্তা থেকে বেশ দূরে এখানে। বাড়ির সামনের ফাঁকা জায়গায় বাঁশের আড় পাতা। কোনোটা খালি, কোনোটায় ঝুলছে সুতো আর কোনোটাতে সদ্য বুনানো শাড়ি। খানিকটা এগিয়ে যেতেই রাস্তা নিয়েছে বাঁক। মোড় ফিরতেই দেখি এক বয়স্ক লোক। তাঁর সামনে ১০-১২ ইঞ্চি প্রস্থের ফুট কয়েক লম্বা মইয়ের মতো একটি লোহার ফ্রেম। সুতা জড়াচ্ছেন তাতে। একবার বাঁ থেকে ডানে আবার ডান থেকে বাঁয়ে। এর মধ্যে চলে এলেন কারখানার মালিক দেলোয়ার হোসেন। বেশ হাসিখুশি মানুষ। তিনিই খুলে বললেন ব্যাপারটা। ‘একে আমরা বলি বও। আর পাবনার কারিগররা বলে বোয়া। হ্যান্ডলুম আর তাঁতের শানায় ব্যবহার হয়। বওয়ার সুতার সংখ্যার ওপরই নির্ভর করে শাড়ির গুণগত মান। এ সংখ্যাটি ৮০ থেকে ১২০ পর্যন্ত হয়। সুতার সংখ্যা যত বেশি, কাপড় তত ভালো।’

 

শূন্য খা খা বাজার

হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম বল্লাবাজারে। তখন মধ্য দুপুর। তা আবার শুক্রবার। জুমার নামাজের পর লোকজন চলে গেছে বাড়ি। বেশির ভাগ দোকান বন্ধ। তাতানো রোদে খা খা করছে বাজার। দু-একটি চায়ের স্টল খোলা; কিন্তু লোকজন নেই বললেই চলে। আমি আবার পা বাড়ালাম।

 

সুতার মিল

খানিকটা যেতেই ফাইভ স্টার টেক্সটাইল মিল। অনেক জায়গাজুড়ে উঁচু টিনশেডের ঘর। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে শত শত ববিন। বড় বড় রোল থেকে ছোট-বড়, মাঝারি ববিনে মাপমতো সুতা গোছানো হচ্ছে। আবার সেই সুতা ববিন থেকে ছাড়িয়ে তৈরি করা হচ্ছে নাছি বা গোছা। তারপর করা হচ্ছে রং। লাল, নীল, হলুদ, বেগুনি—অনেক রং। এগুলোর ব্যবহার শাড়ির পাড়ে। হাজি চাঁন মাহমুদ পাকী কারখানার মালিক। তিনি আবার এলাকার চেয়ারম্যানও। একসময়ের বিখ্যাত সুফিয়া শাড়ি বুনতেন। এখন অবশ্য শাড়ি ছেড়ে সুতার কারবারই করছেন।

 

নকশা ঘর

ফাইভ স্টার ছাড়িয়ে দক্ষিণে একটি সিনেমা হল। তারপর আরো দক্ষিণে একটি মোড়। রাস্তাটা বাঁক নিয়ে চলে গেছে পূর্ব দিকে। আরো একটু গিয়ে তাঁর দেখা পেলাম। মেঝেতে মাদুর পেতে পদ্মাসনে বসে হাতুড়ি আর ছেনি দিয়ে কার্ডবোর্ড ফুটো করছেন। এই ছিদ্রগুলোর কারণেই শাড়ির পাড়, আঁচল আর জমিনে নকশা ফুটে ওঠে। বুঝলাম এটি একটি নকশা ঘর। ঘরের দক্ষিণ-পশ্চিম কোনায় একটি কম্পিউটার টেবিল। কম্পিউটারে নকশা যিনি করেন, তিনিই আসল কারিগর। তাঁকে ডাকা হয় ডিজাইন মাস্টার। আজ তিনি বাড়ি নেই।

 

রঙের আর সুতার দোকান

বেলা পড়ে আসছিল। রোদের তেজ তাই কম। এরই মধ্যে বাজারের দোকানগুলো খোলার কথা। আমি পা বাড়ালাম। বাজারের মাঝখানে একটি অশ্বত্থগাছ। দুপুরবেলায় জায়গাটা ছিল নীরব। আর এখন কোলহলে সরগরম। আমি এগিয়ে গেলাম আরো উত্তরে। বাজারের পুরনো অংশে। একটি গলিতে সারি সারি টিনের দোতলা ঘর। রঙিন সুতার দোকান। সঙ্গে বিক্রি হয় ববিন, নলিসহ তাঁতসংক্রান্ত খুচরা যন্ত্রাংশ।

 

শনিবারে বসে হাট

এখানে শনিবারে হাট বসে। শাড়ি তো বটেই, হাঁটের দিন বসে তাঁতপণ্যের মেলাও। তাঁতশিল্পের গ্রাম বলে কৃষিকাজের সঙ্গে কেউ নেই আর। পেঁয়াজ, রসুন, আলু, পটোল—সবই আসে বাইরে থেকে। ঘরকন্নার বাজার সওদাটা মালিক-শ্রমিক সবাই হাট থেকেই কেনে। হাটবার বলে শ্রমিকদের সাপ্তাহিক মজুরিটাও দেওয়া হয় শনিবারে।

 

বসে থাকার সময় কই

শিল্পের গ্রাম বলে কেউ এখানে বসে থাকে না। নারী-পুরুষ, ছেলে-বুড়ো—সবাই হাত লাগায় কাজে। অলস শুয়ে-বসে কেউ পার করে না সময়। লোকেরা হয় মালিক, না হয় শ্রমিক, না হয় বড় ব্যবসায়ী বা মহাজন। নিদেনপক্ষে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। সবাই এখানে ব্যস্ত। এমনটা দেশের খুব বেশি গ্রামে দেখা যায় না।

     ছবি : লেখক



মন্তব্য