kalerkantho


এক পাতা প্রেম

বই ও বৃক্ষের জন্য ভালোবাসা

২৬ মে, ২০১৮ ০০:০০



বই ও বৃক্ষের জন্য ভালোবাসা

মাহমুদুল ইসলাম মামুন

পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় মামুনদের বাড়িটা মোটামুটি বড়। আব্বাকে বাড়িতে গাছ লাগাতে দেখেছেন। আম্মাকেও বলতে শুনেছেন, গাছ পরম আশ্রয়। মাহমুদুল ইসলাম মামুন তাই চেনা, কম চেনা বা অচেনা সবাইকেই গাছ উপহার দেন। ভালোবাসেন বই উপহার দিতেও।  বলছেন নিজের আরো অনেক কথা

 

 বই দিচ্ছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে

বইয়ের প্রতি টানও তৈরি হয়েছে আম্মার কারণেই। তারপর আমাদের আজিজনগরে  ব্র্যাকের কিশোরী পাঠাগার হলো। সেখান থেকে রবিঠাকুর, কবি নজরুলসহ অনেকের বই পড়ারই সুযোগ পেলাম। যত বড় হলাম তত মনে হতে থাকল বই আর বৃক্ষ সমাজকে সুন্দর করতে পারে।

 

চলার পথে বলা হয়ে যায়

আমাকে রাস্তায় পেলে শিশু হোক বা বৃদ্ধ—কথা বলে বই, নয় তো গাছ নিয়ে। অনেকে বই বদলেও নেয়। বলে, তুমি যে গাছটা দিয়েছ তাতে ফুল ধরেছে, ফল এসেছে। আমার মনটা ভালোলাগায় ভরে যায়। আমি জানতে চাই, নতুন আর কী গাছ লাগালে? যাদের গাছের প্রতি মায়া কিন্তু বই পড়ার উৎসাহ কম, তাদের আমি কপট রাগে বলি, বই না পড়লে গাছ দেব না। আবার বইপ্রেমীদের বলি উল্টোটা। বই পড়ার ক্ষেত্রে আমি কিছু নিয়ম বের করেছি। বলি, একটা বই দুদিন ধরে টানা কেন পড়বেন? অন্য কাজের তো ক্ষতি হবে। ১৫ দিন বা এক মাস ধরে টুকটুক করে পড়বেন। একই সঙ্গে বলি একাধিক লেখকের বই পড়বেন। ভিন্ন ভিন্ন লেখক আপনাকে জীবনের ভিন্ন ভিন্ন দিক দেখাবে। আজিজনগরের গৃহিণী, দোকানি, শিক্ষক বা ছাত্র—সবাই এখন বই পড়ে, গাছও লাগায়।

 

আমার এক সহায় আছেন

কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের অনেক বই আমি পড়েছি। একদিন ঢাকায় গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করি। তিনি খুশি হন জেনে যে আমি হাঁস-মুরগি পালি ও তা থেকে যা আয় হয় সেটা দিয়ে গাছ লাগাই আর বই বিলাই। তিনি একজন দেশপ্রেমী। মানুষের জন্য কাজ করেন। আমি তাঁকে গাছ উপহার দিই। তিনি আমাকে সন্তানের মতো আদর করেন। আমিও তাঁকে মা বলেই ডাকি।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের সঙ্গে

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গিয়েছি

বিশ্ববিদ্যালয় পড়ার জায়গা। সেখানে হানাহানি, দলাদলি হলে আমার কষ্ট লাগে। আমি ভাবলাম, ভালো বই ছাত্রদের পড়ার তালিকায় রাখলে সংঘাত কমবে। সে ভাবনা থেকে আমি এ পর্যন্ত চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করেছি। বলেছি, সব বিভাগের পাঠ্যসূচিতেই সাহিত্যের বই রাখলে ভালো হবে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মীজানুর রহমান আমার কথা শুনে খুশিও হয়েছেন। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য  ড. কলিমুল্লাহ স্যার খুব বন্ধুসুলভ ব্যবহার করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আরেফিন সিদ্দিক স্যারেরও স্নেহ পেয়েছি। ভাবছি, এবার মেডিক্যাল কলেজ আর প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও যাব।

 

বিয়েবাড়িতে বই ও বৃক্ষ

বিয়েবাড়ি, আকিকা বা জন্মদিন—যে অনুষ্ঠানেই দাওয়াত পাই, বই ও বৃক্ষ নিয়ে হাজির হই। এখন আর আজিজনগরের কেউ অবাক হয় না; বরং অন্য কিছু নিয়ে গেলেই অবাক। দূরে কোথাও গেলে অবশ্য বই ও বৃক্ষের সঙ্গে গৃহস্থালি উপকরণ উপহার হিসেবে নিয়ে যাই। আমি মুক্তিযোদ্ধাদেরও গাছ উপহার দিয়ে সম্মান জানাই। পারলে দেশবরেণ্য নেতাদেরও দিতাম। বলতাম, প্রত্যেকেরই পরিবেশের যত্ন নেওয়া দরকার।

 

 কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনকে গাছের চারা দিচ্ছেন মামুনের মা

কিছু ভালো অভিজ্ঞতা

একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নতুন বাগান করা হচ্ছিল। আমি বাগানের জন্য বেশ কিছু গাছ দিয়েছিলাম। পরে আমার জন্মদিনে স্কুলের প্রধান শিক্ষক আমার দেওয়া গাছের ছবি বাঁধাই করে উপহার দিয়েছিলেন। আরেকবার এক মৃত্যুপথযাত্রীকে দেখতে গিয়েছিলাম। আমাকে দেখে বললেন, একটি লটকনগাছ দিয়ো। আমি তাড়াতাড়ি দূরের এক নার্সারিতে চলে যাই গাছ আনতে। ভয় পাচ্ছিলাম, গাছটি দেওয়ার আগেই না তিনি দুনিয়া ছেড়ে চলে যান। যা হোক আমি সময়মতো পৌঁছাতে পেরেছিলাম।

 

 সাইকেলে চেপে গাছের চারা ও বই বিলি করেন

বন্ধুরা কিন্তু উৎসাহ দেয় 

অনেকেই টিপ্পনী কাটলেও বন্ধুরা কিন্তু বলে, তুই আমাদের গর্ব। তেঁতুলিয়ার ইউপি চেয়ারম্যান কাজী আনিছুর রহমান বলেন, মামুন আমাদের জন্য উদাহরণ। তিনি একবার কিছু পেয়ারার চারা দিয়ে বলেছিলেন, এগুলো তুমিই লাগাইয়ো। তারপর এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আলমগীর আলম বলেন, বই পড়ানো আর পরিবেশ রক্ষার মতো দারুণ কাজ করছে মামুন। আমাদের উচিত তাঁকে সাহায্য করা।

 

 

 

 



মন্তব্য