kalerkantho


আরো জীবন

যতীন বিকাশ চাকমা

যতীন বিকাশ চাকমা খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় থাকেন। বাঁশের সঙ্গে জীবন জড়ানো তাঁর। বাঁশ দিয়ে তৈরি করেন কাল্লুং। দেখতে গিয়েছিলেন জাকির হোসেন

২১ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



যতীন বিকাশ চাকমা

যতীনের বয়স এখন ৭০ বছর। গরিব মানুষ যতীন। বাবাকে হারিয়েছেন কিশোরবেলায়। মাকে দেখতেন কাল্লুং (পিঠে বওয়ার ঝুড়ি) বইতে। মা জুম থেকে শাকসবজি বয়ে নিয়ে আসত কাল্লুংয়ে করে। তারপর নিজে যখন একটু বড় হলেন, তখন মায়ের সঙ্গে নিজেও কাল্লুং নিয়ে জুমে যেতেন। শাকসবজি তুলে কাল্লুং পিঠে বাজারে আসতেন। বিক্রি করে যা পেতেন তা দিয়ে লবণ, তেল কিনে ওই কাল্লুংয়ে তুলেই বাড়ি ফিরতেন।

 

লেখাপড়া হয়নি যতীনের

অভাবের সংসার। বাঁশকুড়ুল খেয়ে দিন যেত। সে আমলে ব্যাগ চিনতও না যতীনের পাড়ার লোকেরা। সবাই সকালে কাল্লুং নিয়ে বের হতো, আর ফিরতও সেটা নিয়েই। ছোটবেলায়ই কাল্লুং সঙ্গী হলেও এটি বানানো শেখেন বিয়ের পর।

 

ওস্তাদের নাম স্নেহপতি

তখন বয়স ২৫ বছর। যতীন বিয়ে করেন দীঘিনালার বাচামেরঙের স্নেহপতি চাকমাকে। স্নেহপতি কাল্লুং তো বটেই, বাঁশ দিয়ে ডোলা (ধান রাখার বড় পাত্র), লাই (এটিও এক রকমের ঝুড়ি) ইত্যাদি আরো অনেক কিছু বানাতে পারেন। অভাবের সংসার বলে স্নেহপতির বসে থাকার জো ছিল না। ঘরের কাজ সামলে কাল্লুং, ডোলা ইত্যাদি বানাতে বসতেন। সেগুলো বাজারে নিয়ে বিক্রি করতেন যতীন। এভাবে ১০ বছর যায়। তারপর ১৯৮৬ সালে স্নেহপতি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। সংসার উঠিয়ে নিয়ে সাজেক চলে যান যতীন। অসুস্থ স্ত্রীর কাছে বসে বসে বাঁশ বুনতে শেখেন তিনি। সাজেক থেকে মাঝেমধ্যে দীঘিনালায় নেমে আসতেন কমলা নিয়ে। সেগুলো বিক্রি করে কিছু টাকা-পয়সা পেতেন। লোকে ডাকত সাজেক্যা (সাজেকের লোক) বলে। অভাবের সংসারে তখন আরো অভাব। তারপর কাল্লুং বানানো পুরো আয়ত্তে এলে সেগুলো বিক্রি করে রোজগার করতেন যতীন। দীঘিনালায় পরে আবার ফিরে আসেন শান্তিচুক্তি হলে।

 

তবু যদি মেয়েটা

নিজে লেখাপড়া করতে পারেননি, কিন্তু পড়ালেখার প্রতি তাঁর বিশেষ টান আছে। বড় মেয়ে সাধনাকে বিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু ছোট মেয়ে শান্তিকে পড়াচ্ছেন। দীঘিনালা ডিগ্রি কলেজ থেকে ডিগ্রি পাস করে এখন রাঙামাটি সরকারি কলেজে মাস্টার্স করছে শান্তি।

 

কাল্লুং নিয়ে দু-চার কথা

মারমা, ত্রিপুরারা কাল্লুংকে ভিন্ন ভিন্ন নামে ডাকে। কাল্লুং দুই ধরনের হয়। একটি ঘন করে তৈরি করা, সেটিতে এমনকি ধান, চালও বহন করা যায়। অন্যটি ফাঁকা ফাঁকা খাঁচার আদলে তৈরি হয়। এটিতে জুমে উৎপাদিত ফসল বহন করা যায়। আকার অনুযায়ী ছোট আকারের একটি কাল্লুং বিক্রি হয় ১০০ থেকে ১৫০ টাকায়। বড় আকারের কাল্লুং বিক্রি হয় ৩০০ থেকে সাড়ে ৩০০ টাকায়। মাঝারি আকারের কাল্লুং বিক্রি হয় ২০০ থেকে আড়াই শ টাকায়। পাহাড়ে নারীদেরই বেশি কাল্লুং বইতে দেখা যায়। জুম থেকে তাঁরা কাল্লুংয়ে করে আলু, বেগুন, ক্ষীরা, শসা, আদা, হলুদ নিয়ে আসে। অনেকে বাজারেও নিয়ে যায় বিক্রি করতে। একটি কাল্লুং তৈরিতে দুদিন সময় লাগে। সব বাঁশ দিয়ে কাল্লুং হয় না। পাহাড়ি মিদিংগা ও কালিজুরি বাঁশ দিয়ে তৈরি হয় কাল্লুং। উদাল গাছের ছাল দিয়ে কাল্লুং বহনের দড়ি তৈরি হয়। এ ছাল নরম হলেও মজবুত। বৃষ্টিতে ভিজলে বা রোদে শুকিয়ে গেলেও সহজে ছেঁড়ে না। দড়িটি মাথায় আটকে কাল্লুং বহন করা হয়।

    ছবি : লেখক



মন্তব্য