kalerkantho


পুতুলগুলো সিরিয়া যাবে

২১ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



পুতুলগুলো সিরিয়া যাবে

পুতুল বানাচ্ছে সুলতানপুরের শিক্ষার্থীরা

নওশাবা আহমেদ অভিনেত্রী। তাঁর সঙ্গে আছে বন্ধু অমিত আর ১২ শিক্ষার্থী। দিনাজপুরের বড় সুলতানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে শিক্ষার্থীরা। সবাই মিলে বানাচ্ছে পুতুল, নাম বন্ধু পুতুল। যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার শিশুদের কাছে তারা পুতুলগুলো পৌঁছে দিতে চায়। আগেও দলটি পুতুল দিয়েছে দেশের বিপদে পড়া শিশুদের। মাহবুবর রহমান সুমন জেনে এসেছেন আরো অনেক কথা

 

 

একজন নওশাবা

কাজী নওশাবা আহমেদের শৈশব কেটেছে শ্যামলীর আদাবরে। তাঁর বাবা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা। হলিক্রস স্কুল ও কলেজে পড়েছেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে এমএফএ করেছেন। নওশাবা পেশায় একজন অভিনেত্রী। তিনি নাটক, বিজ্ঞাপন ও চলচ্চিত্রে অভিনয় করে থাকেন। ব্যক্তিজীবনে নওশাবা এক কন্যাসন্তানের জননী। কন্যার নাম প্রকৃতি নাজারিনা আহমেদ। নওশাবার এই বন্ধু পুতুল প্রকল্পের প্রথম পুতুলটি আছে তাঁর কন্যার কাছে।

 

একজন অমিত সিনহা

অমিত সিনহা সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস শেষ করেছেন। তিনি কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজের কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের লেকচারার পদে কর্মরত। তিনিও অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত।

২০০৩ সালের শেষ দিক। নওশাবা সিসিমপুরে কাজ করতেন। তাঁর চরিত্রের নাম ইকড়ি মিকড়ি। দানবাকৃতির হলে কী হবে, ইকড়ি মিকড়ি খুব ভাবুক। নওশাবা পুতুলটি পরিচালনা করতেন, কণ্ঠও দিতেন। আধাযুগ ধরে ইকড়ি মিকড়ি করেছেন নওশাবা। সারা দেশ থেকে ফোন আসত তখন। ইকড়ি মিকড়ির সঙ্গে কথা বলতে চাইত। নওশাবাই কথা বলতেন। এভাবেই শিশুদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গভীর হয়। অনেকে তাঁর বাসায়ও আসতে থাকে। একসময় ওই শিশুদের নিয়ে নওশাবা গড়ে তোলেন ‘জোনাকির দল’। সবাই মিলে স্বেচ্ছাসেবী নানা কাজ করে বেড়াতেন।

পুতুল ভাবনা

২০১৫ সাল। তুরস্কের উপকূলে তিন বছরের শিশু আয়লান কুর্দির মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখে বিশ্ব। ছবিটি দেখে নওশাবারও মন কেঁদে ওঠে। বন্ধু অমিত সিনহার সঙ্গে তখন আলাপে বসেছিলেন নওশাবা। ভাবছিলেন, সিরিয়ার শিশুদের জন্য কী করা যায়। মনে পড়ে ইকড়ির কথা। ছোটবেলায় নিজে পুতুল নিয়ে ঘুমাতে যেতেন। আরেকটু বড়বেলায় ইকড়ি তাঁর সঙ্গী হয়। এর মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আরেকটি ছবি আলোড়ন তোলে। ছবিটি সিরিয়ারই এক শিশুর। সব কিছু হারিয়ে একটি পুতুল আঁকড়ে ধরে আছে। ওই ছবিটি দেখার পর সিদ্ধান্ত নিতে আর দেরি হয়নি—সিরিয়ার শিশুদের জন্য পুতুল পাঠাবেন।

 

সুলতানপুর স্কুলে

প্রথম ভেবেছিলেন পুতুলগুলো বানাবে ‘জোনাকির দল’। কিন্তু ‘জোনাকির দল’ তো আর ছোট্টটি নেই। তাই ভাবলেন, কোনো স্কুলের শিক্ষার্থীদের দিয়ে পুতুল বানানো যায় কি না। বলছিলেন, ‘তানিয়া ইসলাম আমাদের জোনাকির দলেরই সদস্য। তাঁর স্কুলে আমরা আগে বৃক্ষ রোপণ করেছিলাম। তাকে জানালাম পুতুলের কথা। সে বলল, এসো, বাচ্চাদের সঙ্গে কথা বলে যাও। কয়েক দিনের মধ্যেই চলে গেলাম দিনাজপুরের সেতাবগঞ্জে। যেতে যেতে অমিত বাচ্চাদের দেখানোর জন্য একটি ফটো প্রেজেন্টেশন তৈরি করে ফেলল। তাতে দেখা গেল, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে ত্রাণসহ নানা সাহায্য এসেছে। আমরা সেটা মনেও রেখেছি। সিরিয়ায়ও অনেক দেশ থেকে সাহায্য পাঠানো হচ্ছে। আমরা না হয় পুতুল পাঠালাম। সিরিয়ার শিশুরা বড় হয়ে মনে করতে পারবে বাংলাদেশ নামের একটি দেশ থেকে বিপদের সময় তাদের জন্য পুতুল পাঠানো হয়েছিল। বলেছিল, ভেঙে পোড়ো না, আমরা আছি তোমাদের পাশে।’

নওশাবা আর অমিত সুলতানপুরের বাচ্চাদের বোঝাতে পেরেছিলেন যে বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে হয়। সামর্থ্য যা আছে তা দিয়েই। ‘অদ্ভুত সাড়া পেয়েছিলাম। ৫ থেকে ১১ বছর বয়সী কয়েকজন শিশু তখনই পুতুল বানাতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করে।’ বলছিলেন নওশাবা।

 

ওরা ১২ জন

স্কুলের শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো ছুটির পর আমরা পুতুল বানাব। তখন স্কুলে প্রায় ২০০ জন শিক্ষার্থী ছিল। ৩০ জনকে আমরা প্রাথমিকভাবে বেছে নিলাম। কাউকেই পারিশ্রমিক দেওয়া হবে না; কিন্তু তাতে কারোরই আপত্তি নেই। পরে ওই ৩০ জন থেকে ১২ জন টিকেছিল। তবে অনিয়মিতভাবে আসত আরো চার বা পাঁচজন। আমরা সেতাবগঞ্জ থেকে পুতুল বানানোর জিনিসপত্র কিনলাম। আমাদের টাকার কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছিল তখন। কারণ খরচ কম হচ্ছিল না। যাতায়াত ভাড়া, বাচ্চাদের নাশতা, পুতুল বানানোর সামগ্রী কেনা ইত্যাদিতে ভালোই খরচ হচ্ছিল। তখন এহসান রহমান জিয়া, জুবায়েদ আহমেদ কাজী, কাজী সেলিম প্রমুখ আমাদের সাহায্য করেছেন। কিছু পুতুল নষ্ট হয়েছিল কিন্তু বাচ্চাদের উৎসাহ ছিল তুঙ্গে। তাদের আমরা নিরাশ করিনি। একপর্যায়ে দেখা গেল এক হাজার পুতুল বানানো হয়ে গেছে। অবশ্য তত দিনে পেরিয়ে গেছে চার মাস। এমনও হয়েছে, তারা ক্লাস বাদ দিয়ে পুতুল বানিয়েছে। শিক্ষকরা ফোনে এ কথা জানালে আমি গিয়ে তাদের থামিয়েছি। আর বানানোর সামগ্রী ফুরিয়ে গেলেও ফোন পেতাম—‘আপা, মাল নাই, মাল পাঠান, আরো পুতুল বানাব।’

 

পুতুলগুলো যেমন

‘বাচ্চাদের জন্য বানাচ্ছি, তাই পুতুলগুলো যেন মায়াবী হয়—সেটাই বলতাম সবাইকে। আরো বলতাম, পুতুলগুলো যেন আমাদের দেশের কথা বলে। সে কারণেই বেশি বেশি গামছা ব্যবহার করা হয়েছে। আমরা তৈরি করেছি বাঘ,  পেঁচা, বিড়াল, বাংলাদেশি বাচ্চা, স্টার ফিশ ইত্যাদি। পুতুল বানানো দলের কারিগরদের কয়েকজন হলো—শান্ত, মৌসুমী আক্তার, বাঁধন, বৃষ্টি, হাসি, খুশি ও বেণু।’

 

পাঠানো সহজ নয়

‘পুতুল তৈরি করার সময় থেকেই আমরা কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলাম। তারা কেউ সিরিয়ায় ফটোগ্রাফার কেউ বা ইউনিসেফের কর্মী। আমাদের উদ্যোগের প্রশংসা করছিল তারা। তবে সবাই এক কথাই বলছিল, সিরিয়ায় কিছু পাঠানো অনেক কঠিন, আর ব্যয়বহুল। এখনো পরিষ্কার উপায় খুঁজে পাইনি। এ ব্যাপারে সরকার বা অন্য কেউ এগিয়ে এলে খুশি হব।’

 

৪০০ পুতুল

নওশাবারা এক হাজার পুতুলের মধ্যে ৬০০ পুতুল পাঠাচ্ছেন সিরিয়ায়। বাকি ৪০০ পুতুল এরই মধ্যে বিতরণ করা হয়ে গেছে। গাইবান্ধার সাঁওতালপল্লীতে দেওয়া হয়েছে কিছু। রাঙামাটির ভূমিধসের সময় কিছু দেওয়া হয়েছে আর দেওয়া হয়েছে আশিক ক্যান্সার সেন্টারের ক্যান্সার রোগীদের। ‘ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় গিয়ে যখনই আমরা ব্যাগ থেকে পুতুল বের করেছি, তখনই দেখেছি বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস। শিশুরা নিজেরাই বলেছে, আমাকে ওই বাঘটা দাও, আমাকে দাও পেঁচাটা। আহা! আমরা যে কতটা সুখী হয়েছিলাম, তা বোঝানো যাবে না।’

 

আরো যা ভাবছেন

‘আমরা এখন চাই রোহিঙ্গা শিশুদের পুতুল দিতে। কিন্তু তারা সংখ্যায় এত বেশি যে আরো অনেক পুতুল তৈরি করতে হবে। টাকাও লাগবে অনেক। সিরিয়ায় পুতুল পাঠানোর ব্যাপারটিও বোঝা হয়ে আছে। কী যে করি, অনেক টাকা দরকার।’

 

গেল ঈদের তিন দিন আগে

গেল ঈদের তিন দিন আগে পতুল কারিগরদের কয়েকজনকে দিনাজপুর থেকে ঢাকায় নিয়ে এসেছিলেন নওশাবা। তাদের পুরো ঢাকা ঘুরিয়ে দেখিয়েছেন। পথশিশুদের মাঝে কিছু পুতুল বিতরণও করেছেন। ‘তাদের বানানো পুতুল তারা নিজেরাই পথশিশুদের দিচ্ছে, তাদের চোখে-মুখে যে কী আনন্দ, আমি এমনটা জীবনেও দেখিনি। তারা বড় হলে আরো বড় স্বপ্ন দেখবে।’

 

৭ মার্চ ঢাকার জাতিসংঘ কার্যালয়ের সামনে

দুপুর ২টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত ঢাকার জাতিসংঘ কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করেছেন নওশাবা ও তাঁর কয়েকজন বন্ধু। সিরিয়া ও ইয়েমেনের যুদ্ধাক্রান্ত শিশুদের ছবি মুখে এঁটে মানববন্ধনে অংশ নেন তাঁরা। ‘সিরিয়া যুদ্ধে বেশি হতাহত হচ্ছে নিষ্পাপ শিশু ও নিরীহ মানুষ, যুদ্ধের সঙ্গে যাদের কোনো যোগ নেই। সম্প্রতি জাতিসংঘ সিরিয়াকে বলেছে, হেল অন আর্থ (পৃথিবীর নরক)। সে পরিপ্রেক্ষিতেই আমরা জাতিসংঘ অফিসের সামনে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম।’ 

    ছবি : আশিক আদনান ও সংগ্রহ



মন্তব্য