kalerkantho


ফেসবুক থেকে পাওয়া

৭ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



ফেসবুক থেকে পাওয়া

মায়ের হার

ওপরে উঠতে গিয়ে দেখি সিঁড়িতে বসে আকুল হয়ে কাঁদছে খালি গায়ের ছেলেটি। যার পদচারণে আমাদের পুরো হল মুখরিত। তার এ রকম অসহায় কান্না দেখে খারাপ লাগছিল। জিজ্ঞেস করলাম, কিরে, কান্দোস ক্যা? পাশের কয়েকটি পিচ্চিকে দেখিয়ে বলে, ওরা আমার গলার হার নিয়া গেছে। দলের বড়টা তার হাত দেখিয়ে নালিশ করে, দেখেন ভাই, আমারে খামছি দিয়া কী করছে ও...

 

তার দিকে প্রশ্নবোধক তাকাতে সে আরো জোরে কেঁদে বলে ওঠে, তোরা আমার হার ছিঁড়লি ক্যা!

ওদের বলি, এই, তোরা তো বড়, ও ছোট মানুষ, ওর হারটা দিয়ে দে।

ছোট হলে কী হবে, ওই সবচেয়ে বেশি মারামারি করে—তারা অভিযোগের স্বরে বলে।

শেষ পর্যন্ত ঠিক হলো তারা অন্য আরেকটি চেইন দেবে। কিন্তু কনিষ্ঠের এককথা, সেটাই তার চাই।

কেন? ‘ওটা আমার মায় দিছে, কইছে সব সময় কাছে রাখতে।’

ও ছাড়া বাকিরা হলের মেসের বাবুর্চির ছেলে বা তার বন্ধুবান্ধব। আর ও নিজেই ক্যান্টিন বয়। ক্যান্টিনের টুকটাক ফরমায়েশ খাটে আর পুরো এলাকা চষে বেড়ায়। অবশ্য মজুরিভিত্তিক শ্রম না করে খায়, থাকে—এ রকম। কেননা মালিক তার কাছের আত্মীয়। কতটুকুই বা বয়স, শৈশবের গণ্ডি এখনো পেরোনো হয়নি। ভালো জামা-কাপড়-স্কুলব্যাগ দিয়ে সাজিয়ে দিলে হাই সোসাইটির দুধে-ধোয়া ধনীর দুলালির সঙ্গে মানিয়ে যাবে নিশ্চয়ই; আলাদা করতে পারবে না কেউ...

এ ঘটনার কিছুদিন পর দেখা হতেই তার  হার নিয়ে জানতে চাই। ওটা তো ওই দিনই ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছে ওরা, সামনের জনকে দেখিয়ে বলে। আনমনেই আবার বলে যায়, মায়ের দেওয়া আরেকটি জামা ছিল, তাও খুঁজে পাই না...। পাল্টা প্রশ্ন করি আমি, ‘তুই তো এখানে তোর বাপের সঙ্গেই থাকস, না...! আর মা বাড়িতে...?’

আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই বলে, কী বলেন, বাপ তো আমারে পোলা বলে পরিচয়ই দেয় না। মা বাড়িত, তবে আরেক বেডার লগে বিয়া দিছে নানারা...

সঙ্গে থাকা অন্য পিচ্চি বলে, তুই কী বলস, কথার আগামাথা কিচ্ছু বুঝি না।

‘মানুষে যখন মুরগি জবাই করে মজা করে খায়, তখন তারা তো আর মুরগির কষ্ট বোঝে না, তারা শুধু মজা করে খায়...! তুই আমার বুঝবি কী?’ এত দিনের দেখা তিড়িংবিড়িং নাচা ছোট্ট ছেলেটিকে আজ অনেক বড় আর পরিপক্ব মনে হয় আমার।

এম আর করিম

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, সাভার।

 

বকশিশ

সেদিন সকালের নাশতাটা ভালোভাবে করতে পারিনি। ১০টা না বাজতেই প্রবল ক্ষুধা লেগে যায়। চটজলদি একটি অণুগল্প লেখা শেষ করে পৌনে ১২টার দিকে ঘুমিয়ে পড়ি। উঠতে উঠতে দুপুর ২টা। একটু তাড়াহুড়ো করে সেভ করতে শুরু করি। জেল সেভ। দুই টান দিতে না দিতেই ঠোঁট বরাবর চির করে কেটে যায়। আর গলগলিয়ে রক্ত ঝরা শুরু করে। যতই জ্বালাপোড়া করুক, সেভ তো শেষ করতে হবে। অতঃপর সেভ, গোসল শেষ করে ক্ষতস্থানে স্যাভলন লাগিয়ে দিই। তত্ক্ষণে ক্ষুধা যেন বিষিয়ে উঠেছে। ছুটে যাই হোটেলে।

হোটেলে বসতেই একটা আট-নয় বছর বয়সের ছেলে এসে আমাকে দুই গ্লাস পানি দিয়ে গেল। ছেলেটির দিকে লক্ষ্য করলাম। বুঝতে পারলাম, ছেলেটি সকাল থেকে অনবরত কাজ করছে। এখনো কিছু খায়নি। ছেলেটির প্রতি ভীষণ মায়া হলো আমার। ভাবলাম, আজ ওকে বকশিশ দেব।

অন্য একজন ওয়েটার এলো।

: স্যার, কী খাইবেন?

: কী কী আছে?

: স্যার, মুরগি, খাসি, গরু, রুই, বোয়াল, ছোট মাছ...।

: আচ্ছা, বোয়াল মাছ দাও।

আমি খাচ্ছি আর ওই ছোট্ট ছেলেটির পানি পরিবেশন করা দেখছি। ও টেবিলে টেবিলে পানি পরিবেশন করছে। পাশের টেবিলে দুজন প্যান্ট-শার্ট পরা লোক খাচ্ছেন। একজন বললেন, ‘এই পিচ্ছি, ডাল দে তো।’ ছেলেটি এক বাটি ডাল এনে টেবিলে রাখতেই হাতে লেগে কাত হয়ে পড়ে গেল। মেখে গেল একজনের প্যান্ট-শার্ট। আর অমনি কষে একটা থাপ্পড় লাগাল ছেলেটির গালে। ক্ষুধার্ত শিশুটি থাপ্পড়ের চোট সহ্য করতে না পেরে ছিটকে পড়ল টাইলসের ওপর। আমার খাওয়া এরই মধ্যে শেষ হয়ে গেছে। ছুটে গিয়ে ছেলেটিকে টেনে তুলতেই মালিক এসে সান্ত্বনা দিলেন। ওদিকে ওই লোকগুলো গাপুসগুপুস খেয়েই চলেছে। আমি দেখলাম, তার নাক বেয়ে গলগলিয়ে রক্ত পড়ছে। আমার মুখের ক্ষতটি যেন ঝিলিক দিয়ে উঠল। ব্যথা অনুভূত হলো। আমি মালিককে বললাম, ‘মামা, ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে চলুন।’ তিনি মাথা নাড়িয়ে বললেন, ‘ওর বেতন এখনো দেওয়ার সময় হয়নি।’ বিষয়টি অনুধাবন করতে পেরে বললাম, ‘মামা, টাকার চিন্তা করবেন না।’ লোকটি আশ্বাস পেল। ডাক্তার তত্ক্ষণাৎ দেখে বললেন, ‘ওর প্রচুর রক্ত ঝরছে তো! কেটে গেছে অনেক। আমি বিষয়টি দেখছি।’

সেদিন সকালেই আমাকে টিউশনি থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকা দিয়েছে। মা কিছু টাকার জন্য ফোন করেছিলেন। বলেছিলাম, ‘বিকেলে এক হাজার টাকা বিকাশে পাঠিয়ে দেব।’ কাছে টাকা ছিল বলেই ছেলেটিকে সাহায্য করার মনোবল পেয়েছিলাম।

একটু পরে ডাক্তার ছেলেটিকে সামনে আনলেন। ব্যান্ডেজ করা হয়েছে। নাকের দুটি ফুটো শুধু বেরিয়ে আছে। ডাক্তার কিছু ওষুধ দিলেন। সব মিলিয়ে খরচ পড়ল এক হাজার ৯৩৫ টাকা। আমি টাকাটা পরিশোধ করে দিলাম। মালিক তাকিয়ে রইলেন। মালিককে বললাম, ‘ঠিক আছে মামা। ওকে নিয়ে ওর মা-বাবার কাছে দিয়ে আসুন। সুস্থ হলে কাজে নিয়ে আসবেন। ওর বিশ্রাম দরকার।’ লোকটি আমার কথা শুনে অশ্রুসিক্ত হয়ে বললেন, ‘ওর মা-বাবা তো নেই। আমার ছোট্ট হোটেল। আমি নিজেই...।’ আমি সব বুঝতে পেরে গায়ে হাত বুলিয়ে তাকে থামিয়ে দিলাম। ছোট্ট ছেলেটি আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।

আমি বাসায় ফিরে এলাম। মুখের ক্ষতটা চিনচিন করতেই ছেলেটির চেহারা চোখের সামনে ভেসে উঠল। মনে পড়ল প্যান্ট-শার্ট পরা ওই পিশাচ দুটির কথা। আসলে দামি প্যান্ট-শার্টের মধ্যে মানবিকতা থাকে না, তা ওরা আবার প্রমাণ করল।

মোহাম্মদ অংকন

ঢাকা।

 



মন্তব্য