kalerkantho


সরেজমিন

বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্র

সকাল ১০টায় বয়স্ক পুনর্বাসনকেন্দ্রের সদর দরজা পেরিয়েছিলেন শরীফ আহেমদ শামীম। গাজীপুর সদরের বিশিয়া কুড়িবাড়িতে কেন্দ্রটি। ফিরেছেন বিকেল করে। মাঝখানের সময়গুলোর গল্প বলছেন এখানে

৭ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্র

আম, জাম, লিচু, কাঁঠাল, বরই অনেক রকম ফলদ গাছ ভেতরে। ফটক পেরোনোর পরই পেলাম একটি ইট বিছানো পথ। মায়াময় এ পথের দুই ধারে মেহগনির সারি। সিকি কিলো হাঁটার পর একটি পাঁচতলা ভবন পেলাম। সেটিতে বয়স্ক পুনর্বাসনকেন্দ্র মেডিক্যাল সার্ভিস লেখা সাইনবোর্ড। নিচতলায় আছে ডিসপেনসারি আর চিকিৎসকদের বসারঘর। সেবাপ্রার্থীদের অপেক্ষাঘরও আছে। তারপর আছে প্যাথলজি, ফিজিওথেরাপি, আলট্রাসনোগ্রাম, ইসিজি ও এক্স-রে কক্ষ। চিকিৎসক নূর আহমেদ বললেন, কেন্দ্রের বাসিন্দাদের প্রায় সবাই হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, বাতব্যথায় আক্রান্ত। সবারই তো বয়স হয়েছে। কয়েকজন তো হার্টের রোগীও আছেন। প্রাথমিক চিকিৎসা আমরা এখানেই দিই। বিশেষ প্রয়োজনে সদরে নিয়ে যাই। আমাদের নিজস্ব অ্যাম্বুল্যান্স আছে।’ সেবা নিতে এসেছিলেন মুনসুর আলী। তাঁর বয়স ৬৫ বছর। বাড়ি ফরিদপুরের সদরপুরে। বললেন, বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। স্ত্রী, এক ছেলে আর দুই মেয়ে নিয়ে ছিল সংসার। স্ত্রী মারা গেছেন কয়েক বছর আগে। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলে ড্রাইভারি করে। নিজের সংসারই তাঁর চলে না। আমাকে দেখাশোনা করা তাঁর জন্য বেশ কঠিন। উচ্চ রক্তচাপের রোগী আমি। এখানে দেড় বছর হয় এসেছি। খাবার, চিকিৎসা, ওষুধ, জামা-কাপড় পাই। ভালোই আছি। বই পড়ি, ধর্মকর্ম করি, হাঁটাহাঁটি করি, ব্যায়ামও করি। তবে নাতি-নাতনিদের কথা মনে পড়লে কষ্ট পাই।’ মেডিক্যাল সার্ভিস ভবনের পরই আরো দুটি পাঁচতলা ভবন। একটি বৃদ্ধদের, জন্য অন্যটি বৃদ্ধাদের।

বৃদ্ধনিকেতন

ঘরগুলো পরিপাটিই বলা যায়। সবার জন্য আলাদা খাট। এক ঘরে আটজনের থাকার ব্যবস্থা। সব ঘরের সঙ্গে লাগোয়া টয়লেট ও গোসলখানা আছে। প্রতিতলার বারান্দায় বসার বেঞ্চি রয়েছে। আবাসিক ভবনের পাশে ডাইনিং হল। টিনশেডের বেশ বড় ডাইনিং হল। ডাইনিংয়ের সামনে বেকারি। বাসিন্দাদের বিকেলের টিফিনের রুটি, টোস্ট ও বিস্কুট এখানে তৈরি হয়। ভবনের সামনে ফুলের বাগান। বাগানের পশ্চিমে কেন্দ্রের অফিস ও লাইব্রেরি। দক্ষিণে বিশাল মাঠ, ফলবাগান আর সবজি খামার। ফলবাগানের গাছগুলোর নিচে বসার জন্য বেঞ্চি আছে।

 

লাইব্রেরিতে দেখলাম

৭০ বছর বয়সী খালেদ রহমান আর পূর্ণ চন্দ্রের বয়স ৬৬। বই পড়ছিলেন লাইব্রেরির বারান্দায়। ভেতরে ঢুকে দেখি কয়েকটি আলমিরায় বই ঠাসা। তবে বেশির ভাগই ধর্মীয় বই। কিছু আছে গল্প, উপন্যাস আর জীবনী। দৈনিক পত্রিকাও রাখা হয় লাইব্রেরিতে। লাইব্রেরি যিনি তত্ত্বাবধান করেন তাঁর নাম মোহাম্মদ কিবরিয়া। তিনি কেন্দ্রেরই বাসিন্দা। জানলাম, মো. কিবরিয়া ডিগ্রি পাস। বাড়ি ছিল নরসিংদীতে। দরিদ্র ছিল তাঁর পরিবার। ডিগ্রি পাস করেছেন অনেক কষ্টে। ইচ্ছা ছিল ভালো চাকরি করবেন। পরিবারের অভাব দূর করবেন। কিন্তু সরকারি চাকরি পাওয়া হয়নি তাঁর। বেসরকারি একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানে কাজ নিয়েছিলেন। কিন্তু মালিক ঠিকমতো বেতন দিতেন না। পরে আরো কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। কিন্তু বেতন তেমন ভালো পাননি কখনোই। তাই বিয়ে করাও হয়ে ওঠেনি। ৯ বছর আগে কেন্দ্রের বাসিন্দা হন। একসময় লাইব্রেরির দায়িত্ব নেন। কেন্দ্রে অনেক শিক্ষিত লোক আছেন। তাঁরা বই নিয়ে যান পড়তে। পড়া শেষে ফেরতও দেন। তিনি নিজে বিমল মিত্র, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও সমরেশ মজুমদারের উপন্যাসের ভক্ত। বিশেষ করে সুনীলের পূর্ব-পশ্চিম তাঁর খুব ভালো লাগে।

 

বৃদ্ধা ভবন

মেহগনির পাতা বিছানো পথ ধরে বৃদ্ধা নিবাসের কাছে পৌঁছতেই দুইটা বাজল। ডাইনিংয়ে তখন খাওয়ার বেলা। পরিবেশন করছিলেন হোস্টেল সুপার হাবিবা খন্দকার বেলী। সবার কাছে তিনি বেলী আপা। বললেন, ‘এখানে অনেকে আছে অনেক ধনী পরিবারের, মধ্যবিত্তরা তো আছেই। আর হতদরিদ্ররাও আছে।’ জয়নব বিবির কাছে নিয়ে গেলেন বেলী আপা। ৮০ বছরের বৃদ্ধা। বাগেরহাটে বাড়ি। চোখ মুছতে মুছতে বললেন, সব ছিল একদিন। সংসার সুখের ছিল। দুই ছেলের মধ্যে বড়টি মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। ছোট ছেলের ভালো ব্যবসা। মেয়েটিরও বিয়ে হয়েছে ভালো জায়গায়। স্বামী সরকারি চাকুরে ছিলেন। অবসর নিয়ে বাড়িতেই ছিলেন। তিনি হঠাৎই মারা যান। আমার কষ্টের দিন শুরু হয়। স্বজনরা আমায় বোঝা ভাবল। হার্ট অ্যাটাকও হয়েছিল একবার। বড় ছেলে পাড়ি জমাল আমেরিকায়, ছোট ছেলে আলাদা ফ্ল্যাট নিল। পরে দূর সম্পর্কের এক আত্মীয় এখানে রেখে গেছে। বই পড়ে, হাঁটাহাঁটি করে এখন দিন কাটাই। ভালোই আছি।’ বৃদ্ধাদের আবাসিক ভবনের পাশে বিশাল মাঠ।

 

তখন দুপুর গড়িয়েছে

মাঠের মাঝখানে সবজির খামার। লাউ, শিম, মুলা, বেগুন, পেঁপে, গাজর, টমেটো, পাতা ও বাঁধাকপিসহ খামারে নানা সবজি। মাঠের এক ধারে কয়েকজন জটলা করছে দেখে এগিয়ে গেলাম। গিয়ে দেখি লুডু খেলছেন বয়স্করা। ক্যারম খেলার দলও পেলাম। যাই হোক ফলবাগান ও পুকুর ঘোরা শেষ করে কেন্দ্রের অফিসে গেলাম। তত্ত্বাবধায়ক আবু শরীফের কাছ থেকে জানলাম, ১৯৯৪ সাল থেকে চলছে এ কেন্দ্র। মাদার তেরেসা এটি উদ্বোধন করেছিলেন। এখানে বিনোদনের টিভিরুম যেমন আছে, কমনরুমও আছে। এখানকার সব খরচ বহন করেন গ্রিভেন্সি গ্রুপের চেয়ারম্যান খতিব আব্দুল জাহিদ মুকুল। সব কিছু রুটিনমাফিক চলে এখানে। সকাল ৮টা থেকে সাড়ে ৮টার মধ্যেই নাশতা দেওয়া হয়। রুটি বা ভাতের সঙ্গে সবজি আর ডাল থাকে। সকাল ১০টা থেকে ১টা ৩০ মিনিটের মধ্যে গোসল, কাপড় ধোয়া, পড়াশোনা, খেলা ইত্যাদি। দুইটা থেকে আড়াইটার মধ্যে দুপুরের খাবার। ভাত, মাছ, ডাল, সবজি থাকে। মাংসও থাকে। তারপর ঘুম ও বৈকালিক খেলাধুলা। ৫টায় দেওয়া হয় চা-নাশতা। ৮টার পরে রাতের খাবার। সবজি বেশির ভাগই এখানকার খামার থেকে নেওয়া হয়। মাছও নিজস্ব পুকুরের। এখন এখানে ৯৯ জন বৃদ্ধ আর ৯৭ জন বৃদ্ধা আছেন। দেখাশোনার জন্য কর্মচারী আছেন ৫০ জন।               

ছবি : লেখক


মন্তব্য