kalerkantho


তোমাকেই পড়ে মনে

প্রিয় প্রিয়ক

৩১ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



প্রিয় প্রিয়ক

ফারুক হোসেন প্রিয়ক

ছবি তোলার নেশা ছিল প্রিয়কের। একাধিক পুরস্কারও পেয়েছিলেন। কিন্তু সেসব এখন শুধুই স্মৃতি। গেল ১২ মার্চ ইউএস-বাংলার বিমান দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান তিনি ও তাঁর মেয়ে প্রিয়ন্ময়ী। বন্ধুকে স্মরণ করেছেন মিলন বাকী বিল্লাহ। ছবিগুলো প্রিয়কের তোলা।

 

ঠিক ভোর পাঁচটায় দরজায় ঠক্ ঠক্। ফোনের অ্যালার্মটাও বেজে যাচ্ছিল। কিন্তু শীতের ভোরে কে-ই বা উঠতে চায় লেপের তলা থেকে! দরজা ধাক্কার শব্দে উঠতেই হলো। সামনে প্রিয়ক। বললেন, ‘জলদি তৈরি হন, বের হতে হবে কিন্তু সাড়ে ৫টার মধ্যেই।’ এদিকে শাওনও উঠে পড়েছে। দুজনে দ্রুত তৈরি হয়ে নিচে নামতেই দেখি গ্যারাজ থেকে লাল মাজদাটা বের করছেন প্রিয়ক। আমরা উঠতেই দ্রুত গাড়ি ছোটালেন। জৈনাবাজারের পাশ দিয়ে ভেতরে ঢুকে ইট বিছানো রাস্তা ধরে চলছি আমরা—গন্তব্য এমন কোথাও, যেখানে হয়তো ভোরের এই মায়াকাড়া আলোয়, অদ্ভুত কোনো কম্পোজিশনে পেয়ে যেতে পারি অনন্য কোনো ছবি। 

গত রাত কেটেছে প্রিয়ক ভাইদের বাড়িতে। অফিস শেষ করেই ঢাকা থেকে বাসে চেপে শাওন আর আমি সোজা জৈনাবাজার। পরদিন শনিবার। অফিস নেই। ইচ্ছামতো আড্ডা দেওয়া আর ছবি তোলা যাবে প্রিয়কের সঙ্গে। আন্টির অসাধারণ রান্নায় ভূরিভোজ হলো রাতে। এসবের মধ্যেই ছবি নিয়ে আলোচনা চলল। প্রিয়ক ল্যাপটপে নিজের তোলা ছবি দেখালেন। আমরাও দেখালাম। সব কিছু নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলল। কোনটা কোন ফ্রেমে বা কোন আলোতে কিভাবে তুললে আরো ভালো হতে পারত সেই নিয়ে যেন তর্কবিতর্কের শেষ নেই। এক ফাঁকে এসে ঘুরে গেল ছোট্ট প্রিয়ন্ময়ী, প্রিয়কের একমাত্র কন্যা।

গত কয়েক মাসে এটাই মোটামুটি রুটিন হয়ে গেছে। প্রতি শনিবার খুব ভোরে কিংবা হাতে সময় থাকলে আগের রাতেই রওনা দিয়ে আমরা চলে আসি প্রিয়কের বাড়িতে। রাতে এলে ভোরেই বেরিয়ে পড়া যায়। আশপাশের ২০-৩০ কিলোমিটারের মধ্যে সব কিছুই প্রিয়কের নখদর্পণে। কোথায় কুমোরপাড়া-কামারপাড়া, কোথায় ধান ভানার আড়ত, কোথায়, কবে ঘোড়দৌড় বা ষাঁড়ের লড়াই, নৌকাবাইচ কিংবা মাছ ধরার উৎসব অথবা চড়কপূজা। কোন গ্রামে কবে সাপ্তাহিক হাটবার, কোন গ্রামে সব মাটির ঘরবাড়ি, কোথায় নদীর পাড়ে একটুখানি জিরোলেই জুড়োবে প্রাণ কিংবা কোনো দূরের গ্রামের বাজারের ঝুপড়ি হোটেলে মিলবে তাজা মাছ এমন আরো কত কি!

 

একবার এক গ্রামে পেয়ে গেলাম টোনাটুনির মতো দুই বুড়োবুড়িকে। সূর্যটা তখন একটু পশ্চিমে হেলে পড়ছে। মাটির ঘর। দাওয়ায় চেয়ারে বসে রোদ পোহাচ্ছিলেন বৃদ্ধ। উঠানে বসে বৃদ্ধা টুকটাক কাজ করছিলেন। পলকেই সব কিছু মনে ধরে গেল আমাদের। প্রিয়ক আর শাওন পালা করে তাঁদের নানাভাবে বসিয়ে নানা ফ্রেম নিলেন। কিছুক্ষণ পরে প্রিয়কের তোলা দেখে শাওনের আবার তার ফ্রেম কপি করার সাধ জাগল। ততক্ষণে প্রিয়কের মাথায় ঢুকেছে নতুন আরেক ফ্রেম। শাওনের শেষ হতে না হতেই, তিনি বুড়োবুড়িকে বাড়ির বাইরের দেয়ালের সামনে সেই কাঙ্ক্ষিত স্থানে বসিয়ে আবার শাটার চাপা শুরু করেছেন। সেই জায়গা দেখে শাওনের আক্কেল গুড়ুম। তার মনে হলো, আরে এই জায়গাটাই তো খুঁজছিলাম এতক্ষণ! ব্যস, শুরু হয়ে গেল বুড়োবুড়িকে সামনে রেখে ছবি তোলার জন্য দুজনের গুঁতোগুঁতি। এদিকে পোজ দেওয়া বাদ দিয়ে বুড়োবুড়ি হাঁ। ছবি তুলতে গেলে শাওন আর প্রিয়কের এমন খুনসুটি হয়ে দাঁড়াল নিয়মিত ঘটনা। কতবার কত জায়গায় যে এমন হতো, হিসাব নেই! শেষমেশ দেখা যেত সবচেয়ে ভালো ছবিটা তুলেছে প্রিয়ক-ই।

 

একজন প্রিয়ক

শরাফত আলী ও ফিরোজা বেগমের একমাত্র সন্তান ফারুক হোসেন প্রিয়ক। জন্ম গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার জৈনা গ্রামে। নর্দার্ন ইউনিভার্সিটি থেকে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক। নেশা ও পেশা ছিল ফটোগ্রাফি। সময় পেলেই বেরিয়ে পড়তেন ক্যামেরা হাতে। ২০১৩ সালে অ্যামেচার ফটোগ্রাফি বাংলাদেশের আয়োজনে ফটো প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হন। ২০১৬ সালের বেঙ্গল ইমেজ ফার্স্ট ন্যাশনাল ফটো কনটেস্টে চতুর্থ হয়েছিলেন তিনি। এ ছাড়া বাংলাদেশ সোসাইটি অব ফটোগ্রাফিক আর্ট ২০১৪, কালারস অব লাইফ কম্পিটিশনেও রৌপ্য পদক জেতেন। ‘ওমেরা ইন্টারন্যাশনাল মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ ডে ফটো কনটেস্ট ২০১৬’ এ প্রথম পুরষ্কার লাভ করেন। পুরস্কৃত হন সুইস অ্যাম্বাসির আয়োজনে ‘ফোকাস অন কালচার’ প্রতিযোগিতায়ও। দেশের বাইরে ‘দ্য হামদান বিন মোহাম্মদ বিন রশিদ আল মাখতুম ইন্টারন্যাশনাল ফটোগ্রাফি অ্যাওয়াডর্স ২০১৫’ এবং ‘সিয়েনা ইন্টারন্যাশনাল ফটো অ্যাওয়ার্ড ২০১৮’-এর ফাইনালিস্টও ছিলেন তিনি।

অনারেবল মেনশন অ্যাওয়ার্ড, ‘বাংলাদেশ সোসাইটি অব ফটোগ্রাফিক আর্ট ২০১৬’

এই ছবিটির জন্যই ‘সিয়েনা ইন্টারন্যাশনাল ফটো অ্যাওয়ার্ড ২০১৮’-এর ফাইনালিস্ট হয়েছিলেন প্রিয়ক

ছবিটি ‘ওমেরা ইন্টারন্যাশনাল মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ ডে ফটো কনটেস্ট ২০১৬’-এ প্রথম পুরষ্কার জিতেছিল



মন্তব্য